Alexa মুমিনদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৩ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ৯ ১৪২৬,   ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

মুমিনদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী

পর্ব-১

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:১৮ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:০১ ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

যে ব্যক্তি মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা, তাঁর প্রেরিত সকল নবী, রাসূল, ফেরেশতা, আসমানী কিতাব, পরকাল ও তকদীরের ওপর পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং ঈমান গ্রহণের পর তা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি তিনিই প্রকৃত মুমিন।

মহাগ্রন্থ আল-কোরআনুল কারীম ও পবিত্র হাদিস শরিফে মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে মুমিন বান্দার কিছু গুণাবলী ও বৈশিষ্ট তুলে ধরা হলো-

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
 
أُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ

সরল বঙ্গানুবাদ: ‘মুমিন তো তারাই আল্লাহর কথা আলোচিত হলেই যাদের অন্তর কেঁপে উঠে আর তাদের কাছে যখন তাঁর আয়াত পঠিত হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি হয় আর তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে। তারা সালাত কায়িম করে আর আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। এসব লোকেরাই প্রকৃত মুমিন। এদের জন্য এদের প্রতিপালকের নিকট আছে নানান মর্যাদা, ক্ষমা আর সম্মানজনক জীবিকা।’ (সূরা: আল আনফাল, আয়াত: ২-৪)।

উপরিউক্ত আয়াতগুলোতে ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির অবস্থা লক্ষণীয় আমলের দ্বারাই ঈমানের কম-বেশির কারণ। আমলবিহীন ঈমান অকল্পনীয়,তাই সদা-সর্বদা আমলের কারণেই ঈমান বাড়ে-কমে। নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা এর বাস্তব নমুনা অনুধাবন করা যায়।

‘অন্তরের উদাহরণ হলো- একটি পালকের মতো, যা গাছের ডালে ঝুলানো আছে, বাতাসে সেটিকে এদিকে সেদিকে ঘুরাচ্ছে।’(মুসনাদে আহমাদ, হা: ১৯৬৬১, সহিহ জামে, হা:২৩৬৫)।

ঈমান ও আমল একে অপরের সহোদর তথা নিত্য সঙ্গী। একটির সঙ্গে অপরটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ও স্থলাভিসিক্ত। কোনো ঈমানের দাবীদার নিশ্চিন্তে-অলসভাবে কালাতিপাত করতে পারে না। সততা ঈমানের অতন্দ্র প্রহরী হচ্ছে আমল। প্রসঙ্গত এখানে একটি হাদিসের উদ্ধৃতি লক্ষণীয়:

আবূ উমামাহ্ বাহেলী (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তাহাজ্জুত সালাত অবশ্যই আদায় করো। সেটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের তরীকা। এ দ্বারা তোমাদের আপন রবের নৈকট্য লাভ হবে, গুনাহ মাফ হবে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হা: ১১৫৬)।

অপর হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘বানী আদমের অন্তর ডেকের ফুটন্ত পানির চেয়েও দ্রুত পরিবর্তনশীল। আল্লাহ তায়ালা নিজে তাঁর বান্দাদের অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী ও স্থানান্তরকারী। (কিতাবুস সুন্নাহ, হা: ২২৬)।

আব্দুল্লাহ ইবনু‘আমর ইবনুল‘আস থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে, ‘নিশ্চয়ই বনী আদমের অন্তরসমূহ মহান আল্লাহর আঙ্গুলসমূহের দু‘টি আঙ্গুলের মাঝে থাকে। যেন একটি অন্তর। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন। অত:পর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন,  হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আপনার আনুগত্যের প্রতি আমার অন্তরকে পরিবর্তন করে দিন।(সহিহ মুসলিম, -হা: ২৬৫৪)।

অনুরুপ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

‘জেনে রেখ! আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মধ্যে অন্তরায় হয়ে যান। বস্তুত: তারই দিকে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করা হবে। সমবেত করা হবে। (সূরা আন আনফাল ৮ঃ২৪)

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

‘কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে (সূরা: আশ শু‘আরা, আয়াত: ৮৯)।

ঈমান‘আমল দ্বারা শানিত ও সতেজ হয়ে উঠে, অন্যতায় অন্তর সহজেই রোগাক্রান্ত ও অকেজো বস্তুতে পরিণত হয়। তাছাড়া দুর্বল ঈমান এমন একটি ব্যাধি যার অনেকগুলো কারণ ও লক্ষণ রয়েছে। এর মধ্য অন্যতম কয়েকটি লক্ষণ হলো-
 
(১) হারাম ও পাপ কাজে জড়িয়ে পড়া: কিছু পাপী রয়েছে, যারা পাপ কাজ করে এবং তার ওপরই সর্বদা অটল থাকে। আবার কিছু মানুষ রয়েছে, যারা বিভিন্ন পাপ কাজ করে এবং বেশি বেশি পাপ কাজে পতিত হওয়াটা স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। তারপর এর কুপ্রভাব ক্রমান্বয়ে অন্তর থেকে বের হয়ে যেতে থাকে, এমনকী এক পর্যায়ে সে প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে। ফলে সে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এই হাদিসটির আওতায় পড়ে যায়। 

হাদিসে এসেছে, ‘আমার সকল উম্মতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারীদের ব্যতীত। আর নিশ্চয়ই এটা বড় অন্যায় যে, কোনো লোক রাতের বেলায় অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু সে সকাল হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে আল্লাহ তায়ালা তার অপকর্ম  লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার ওপর মহান আল্লাহর দেয়া আবরণ খুলে ফেলল।(সহিহ বুখারী, হাদিস: ৬০৬৯)।

(২) অন্তরে কঠোরতা অনুভূত হওয়া: এমনকী একজন ব্যক্তি ভাবা শুরু করে যে, তার হৃদয়টা শক্ত-পাথর হয়ে গেছে-যা থেকে কিছুই বের হওয়া সম্ভব নয় এবং এতে কোনো প্রভাবও চলে না। যেমন- আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّن بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً 

‘অত:পর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মতো অথবা তদপেক্ষাও কঠিন।(সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ৭৪)।

একজন কঠোর হৃদয়ের লোকের মধ্যে মৃত্যুর উপদেশ, মৃত ব্যক্তিকে দেখা বা কারো জানাযায় অংশ গ্রহণ কিছুই প্রভাব ফেলে না। কখনো বা সে নিজেই জানাযা বহণ করে নিয়ে যায় এবং নিজ হাতেই কবরে মৃতকে দাফন করে, তার পরেও তার মধ্যে এটা প্রভাব ফেলে না। যেন কবরের মাঝে তার গমনাগমন পাথরের মধ্যে গমনের ন্যায় মূল্যহীন।

(৩) ইবাদত ভালভাবে না করা: সালাত আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও জিকিরের সময় অন্তর এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করে। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া ও জিকির-আযকারের সময় কোনো চিন্তা-ভাবনা না করা। যখন সে মুখস্থ দোয়া পাঠ করে, তখন তা বিরক্তি ও অন্যমনষ্কতার সঙ্গে পাঠ করে। যদিও সে সুন্নতি তরীকায় নির্দিষ্ট দোয়াতে অভ্যস্ত। কিন্তু সে কখনোই এই দোয়াগুলোর অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় না।

অথচ আল্লাহ তায়ালা উদাসীন লোকের দোয়া কবুল করেন না। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা অন্যমনষ্ক ও উদাসী-অন্তরের দোয়া কবুল করেন না। (মুস্তাদরাক হাকিম, হা: ১৮১৭, মুসনাদে বাযযার, হা: ১০০৬১, সিলসিলা-সহিহ, হা: ৫৯৪)।

(৪) আনুগত্য ও ইবাদতের ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অলসতা প্রদর্শন করা: তার সালাত যেন শূন্যগর্ভে নাড়া-চাড়ার মতো, যাতে কোনো প্রাণ নেই। এ ধরণের সালাতকে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকের সালাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إوَإِذَا قَامُواْ إِلَى الصَّلاَةِ قَامُواْ كُسَالَى قَلِيلاً

‘আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন একান্ত অলসতার সঙ্গে দাঁড়ায়। (সূরা: আন নিসা, আয়াত: ১৪২)।

তাছাড়া ভালো কাজ করা ‘ইবাদতের সময় চলে যাওয়ার পরও সে ব্যাপারে অনীহা ও অনাগ্রহ দেখানো, যা কেবল ব্যক্তির প্রতিদান প্রাপ্তির ব্যাপারে অনাগ্রহতাকে নির্দেশ করে। যেমন-সামর্থ্য থাকা সত্তেও হজ বিলম্বে আদায় করা, জামাতের সঙ্গে সালাত আদায়ে বিলম্ব করে মসজিদে আসা, এমনকী জুমার সালাতেও বিলম্বে আসা। 
এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সর্বদা একদল লোক সালাতে প্রথম কাতার থেকে বিলম্ব করতে থাকবে এমনকী আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শেষ পর্যন্ত জাহান্নামের অধিবাসী করবেন। (আস্ সুনামুল কুবরা- হা: ৫১৯৮, সহিহ আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব-হা: ৫১৩)।

এভাবে যখন সে ফরজ সালাত থেকে ঘুমিয়ে থাকে, তখন মন থেকে কোনো তিরস্কার অনুভব করে না। গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত বা নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত এর মতো অভ্যাস কখনো ছুটে গেলেও সে ব্যক্তি তার ক্ষতিপূরণ আদায়ে কোনো আগ্রহ দেখায় না। এভাবেই সে প্রত্যেক সুন্নাত ও ফরজে কিফায়া ‘আমলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়। এমনকী এক সময় বৎসরের ঈদের সালাতেও উপস্থিত হয় না। কারো জানাযায় উপস্থিত হয় না। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে