মুজিববর্ষে অঙ্গীকার হোক ভাষার সমৃদ্ধি ঘটানো

ঢাকা, শুক্রবার   ১০ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৭ ১৪২৬,   ১৬ শা'বান ১৪৪১

Akash

মুজিববর্ষে অঙ্গীকার হোক ভাষার সমৃদ্ধি ঘটানো

 প্রকাশিত: ১৫:০৭ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার দাবিকে ঊচ্চৈঃ তুলে ধরার ঐতিহাসিক মাইলফলক দিবস মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষা শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। প্রতিবছর একুশ আসে আমাদের জীবনে আর আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’র কথা।

একুশ আমাদের ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দুর্বার আন্দোলনের কথা যেমন স্মৃতিপটে তুলে ধরে, তেমনিভাবে ‘বায়ান্ন’ সালের উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তাই বাঙালি জাতির গর্ব ও আনন্দের দিন। এ আনন্দ ও আত্মগৌরবের ইতিহাসের ভীত নির্মিত ‘৫২ সালে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে এ দেশের ছাত্রসমাজ অকাতরে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে সৃষ্টি করে। মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে প্রাণ হারান সালাম, বরকত, রফিকের মতো বীর ভাষা-সৈনিকরা। ঢাকার পিচঢালা পথ শহিদের রক্তে রঞ্জিত হলেও বাঙালি জাতি সব প্রতিবন্ধকতাকে দলে-মুচড়ে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সোচ্চার কণ্ঠে সমস্বরে ধ্বনি তোলে- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। যে কারণে বাঙালি জাতির চেতনা গঠনের পাঠশালা বলা হয় শহিদ মিনারকে। ‘৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসকের বুলেট বাংলার বুকে গড়ে দেয় এই সম্মিলনী কেন্দ্র। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দাবানলের শিখা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি নিয়ে প্রতি বছর হাজির হয় আমাদের সামনে। ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে শহিদ মিনার এখন সারা দেশে, সারা বিশ্বে মাথা উঁচু করে সগৌরবে জানান দিচ্ছে ভাষার দাবিতে বাঙালির বীরত্বগাথা, যা বিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের ১৯৩টি দেশে এই ‘ভাষা দিবস’ উদযাপিত হচ্ছে। 

কিছুতেই ভুলে যাওয়া যাবে না যে, একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি সোনালি অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরপরই স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রোপিত হয়েছিল। সেই রোপিত বীজের নাম ভাষা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রতিবাদ উঠেছিল ভাষার দাবিতে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে এ সম্ভাবনাময় দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামের এক ভূখণ্ডের লড়াইয়ে লিপ্ত বাঙালি ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহিদ হয়েছে বাংলাদেশের ভাষাপ্রাণ মানুষ। মূলত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনই বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের প্রকৃত ভিত্তি। তবে এ ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে দেশের সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। ভাষার মাস এলেই সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর দাবি ওঠে আবার মাস শেষ হলেই ভুলে যাই সব। অথচ যেভাবেই হোক দেশের সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের পাশাপাশি ভাষার সমৃদ্ধি ঘটানো অত্যন্ত যৌক্তিক। 

সংশয়হীনভাবেই বলা যায়, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং গড়ার পরে এগিয়ে যাওয়া- স্বাধীনতা, মৈত্রী ও সাম্যের লক্ষ্যে। একুশ কারো সঙ্গে আপস করেনি। কেননা, সে জানে কোনো আপসই নিজের শর্তে হয় না, হয় নিঃশর্তে। ভাষা আন্দোলনের পথই আমাদের প্রকৃত মুক্তির পথ। বাংলাভাষা কতটা প্রচলিত হচ্ছে তার নিরিখে বিচার করলেই বোঝা যাবে গণতন্ত্রের দিকে আমরা কতটা এগিয়েছি, কিংবা এগোইনি। দেশের শিক্ষা মোটেই সর্বজনীন হয়নি এবং শিক্ষিতরাও বাংলাভাষা চর্চায় অধিক আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তাও নয়। বীর এখন তিনিই, যিনি ইংরেজি ভালো জানেন। না, উর্দুর পক্ষে এখন কেউ বলবে না; কিন্তু বাংলার পক্ষে আন্তরিকভাবে কথা বলবেন, কাজ করবেন এমন মানুষও সমাজে খুবই কম। আর এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই বাংলাভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের আরও যত্নবান হওয়া কর্তব্য। বাংলা ভাষা যদি তার মাধুর্য, সুষমা ও আকর্ষণ হারায়, তাহলে এর চেয়ে ভাষিক নৈরাজ্য আর কী হতে পারে! 
স্মর্তব্য যে, ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি ‘মায়ের ভাষার’ মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নবপ্রেরণা পেয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেলে বসেও। বঙ্গবন্ধুর নেতৃতত্বেই ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে বাঙালি স্বাধিকার আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করে এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে মাতৃভাষাকে আত্মস্থ করা এবং বাংলা ভাষায় সুন্দরভাবে কথা বলা গৌরবের হওয়া উচিত। নিজেদের কাছেই যদি মাতৃভাষা কোণঠাসা হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে এটা অত্যন্ত লজ্জার।

বর্তমানে পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত আছে। এর সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। তবে আনুমানিক হাজার ভাষা আছে। তন্মধ্যে বাংলা যা আমাদের মাতৃভাষা। যে কোনো জাতির কাছে মাতৃভাষা অতি পবিত্র, মায়ের মতো। একটি জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি তার মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন বিবর্তনের মধ্যে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। কারণ ভাষার ধর্মই বদলে যাওয়া। একটি জাতির ভাষার বিকাশ ঘটে তার চর্চা ও ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। তবে বাংলাসাহিত্যের প্রকৃত বিকাশ ঘটে মধ্যে যুগে। যদিও প্রাচীনকালে এর কিছুটা নমুনা পাওয়া যায়। পাল ও সেন আমলে বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা ‘চর্যাপদ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন এটি বাংলাসাহিত্যের আদি নিদর্শন। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষার গুরুত্বের বিষয়টি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর স্পষ্ট করে দেখেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি মাতৃভাষা বাংলাকে শিক্ষার বাহন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলা দেশে শিক্ষার তত্ত্বাবধানের ভার যারা নিয়েছেন তাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাসাহিত্য সৃষ্টি করা।’ বিদ্যাসাগর এখানে বাংলাসাহিত্য কথাটি এক বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করে একমাত্র ভাষা যাতে বাঙালি সমাজের শিক্ষার শক্তিশালী বাহন হিসেবে কাজ করতে পারে তার স্বপক্ষেই জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। বস্তুত পক্ষে তিনি বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজস্ব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা করেছেন। 

রবীন্দ্রনাথ তার চিন্তাচেতনায় শিক্ষার প্রশ্নে মাতৃভাষাকে সবার ওপর স্থান দিয়েছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে না পারাকে তিনি বাংলা ভাষাকে আমাদের শিক্ষা প্রসারের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখেছেন। এক রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই বাংলা বিশ্বসাহিত্য দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় সাহিত্য রচনা করে যে যশ খ্যাতি অর্জন ও বিখ্যাত হওয়া যায় না তা আমরা মাইকেল মধুসূদনের জীবনী থেকেও প্রত্যক্ষ করি। ফলে একুশের চেতনা বিকাশে ও বাংলা ভাষার মর্যাদা ও সমৃদ্ধির প্রশ্নে কোনো বিকল্প থাকা উচিত নয় বলেই মনে করি। 

পরিশেষে, আমাদের দেশের স্বাধীনতা পেতে লাখ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়, আবার ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতেও প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। স্বাধীনতার চেতনার মধ্যেও ভাষা আন্দোলনের চেতনা মিলে মিশে একাকার। তাই প্রিয় এই দেশটিকে নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। আমরা এ বছর জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ পালন করছি। সুতরাং আনন্দ ও গর্বের এ ক্ষণে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ঘটুক এই প্রত্যাশা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর