মিঃ জ্যাকসনের বাড়িতে এক বিকেল

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৫ ১৪২৭,   ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মিঃ জ্যাকসনের বাড়িতে এক বিকেল

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৫১ ২৪ জুন ২০২০   আপডেট: ১০:৫২ ২৪ জুন ২০২০

ছবি: আন্তর্জাল

ছবি: আন্তর্জাল

পর্দার ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো আমার হোটেল কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করছে। পর্দাটা একটু সরিয়ে দিতেই একটা অসাধারণ ছবির ফ্রেম আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কয়েক’শ গজ দূরে মেকং নদী। বিকেলের আলোতে হলুদ অথবা স্বর্ণাভ রঙ ধারণ করেছে মেকং এর জল। সোনালী আভা ছড়াচ্ছে চরাচরময়। নদীর অপর পাড়ে সারি সারি আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। দৈত্যের মতো শুয়ে আছে। আদ্যিকাল থেকে। আজ বিকেলে মিঃ জ্যাকসন আসবেন বলে আমি বের হইনি।

মিঃ জ্যাকসন এসে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। নিজে ড্রাইভ করে। মাত্র কয়েক মিনিটের যাত্রাপথ; উঁচুনিচু কঙ্কর বেষ্টিত। বাসাটি মেকং নদীর পাড়ে। দোতলা। চমৎকার বাংলো ধাঁচের। ফেঞ্চ কলোনিয়াল স্থাপত্য অনুযায়ী নির্মান করা হয়েছে। ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হলেও ভেতরের দেয়ালগুলো এবং ফ্লোর কাঠের তৈরি। বাড়িটির বিশেষ বৈশিষ্ট হল বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে বাঁশের তৈরি একটা পাটাতন। রেলিং দেয়া। মেকং নদীর পাড় অতিক্রম করে পাটাতনটি নদীর উপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। খুবই নান্দনিকভাবে সাজানো। উপরে একটা বেতের টেবিল স্থাপন করা আছে। টেবিল ঘিরে দুটো চেয়ার। বেতের তৈরি। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার ক্যাম্পের প্রবেশদ্বারের কাছে এমন একটা গোলঘর ছিল। নীচে তাকালেই কয়েক’শ ফুট গভীর উপত্যকা। টেবিলের ওপরে কয়েকটা বিয়ারের ক্যান খালি পড়ে আছে।  বোঝা গেল তিনি তার স্ত্রী অথবা একান্ত কোন অতিথিকে নিয়ে বিকেল বা সন্ধ্যায় এখানে বসেন, খোশগল্প করেন এবং মেকং এর রূপ পর্যবেক্ষণ করেন।

মেকং এখানে কম্বোডিয়ার মেকং এর চেয়ে অনেক বেশী খরস্রোতা ও সরু। অথচ কম্বোডিয়ার মেকং আমাদের দেশের যমুনার মত; যদিও যমুনার বিস্তৃতি তার নেই। লাওসে মেকং নদী প্রবাহিত হয়েছে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে। কর্নফুলি নদীর মত। নদীর পাড়ের কাছাকাছি এখানে সেখানে এবড়ো থেবড়ো পাথরের স্তুপ। জলের ভেতরে। মাঝে মধ্যে ঢেউ এসে পাথরের স্তুপের গায়ে মৃদু শব্দ করে আছড়ে পড়ছে। মেকং এর তীর ঘেঁষে কয়েকটা রঙিন নৌকা বাঁধা। ইঞ্জিন বোট। দেখতে আমাদের দেশের বাইচের নৌকার মত।

বাড়ির প্রবেশ গেট দিয়ে প্রাচীরের ভেতরে ঢুকতেই বিশাল বিশাল ফলের গাছ। বিভিন্ন ধরণের। সিমেন্টের নিকানো উঠোন। তার উপরে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে কতগুলো  ফল। পেকে হলুদ বা লাল হয়ে আছে। মিস্টার জ্যাকসনের কাছে শুনলাম ফলের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াই পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ। উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়ার কারণে সারা বছর ধরে এই অঞ্চলে সব ধরণের ফলই পাওয়া যায়। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস – সবখানেই। লাওসে ফলের প্রাচুর্য আরো বেশী। আবাদ হয় প্রচুর। বনেও জন্মে। আমাদের দেশের সব ফলই এখানে আছে। আম, কাঠাল,কলা, পেয়ারা ,লিচু, লঙ্গন, জামরুল সবই! এর বাইরেও আছে দুরিয়ান, ড্রাগন, এশিয়ান পিয়ার, পমেলোস (pomelos) ইত্যাদি। পথের পাশে কাঠের ভ্যানগাড়িতে করে এদের বিক্রি চলে। সারা বছর ধরে। খুবই সুস্বাদু। বৈচিত্র্যময় ফল দেশটিকে ফলের দেশেই পরিণত করেছে। 

ফলগুলো দেখে একটা মজার স্মৃতি মনে পড়ে গেল। কম্বোডিয়াতে আমার সাথে পর্যবেক্ষক হিসেবে এসেছে আমার বন্ধু ও কোর্সমেট বশির। নমপেন শহরের রাস্তাঘাটে ফলের বাহার দেখে সে হতভম্ব। সে সাধারণ সব খাবার বাদ দিয়ে তিনবেলা আম খাওয়া শুরু করে দিল। এবং কয়েকদিনের ভেতরেই তার নাম পরিবর্তিত হয়ে গেলো ‘আম বশির’ – এই নামে। আমি জানি না তার এই নাম কখনও ঘুচবে কিনা।  

উঠোন অতিক্রম করতে করতে তিনি বললেন, “এখানকার ছেলেমেয়েরা প্রায়ই উঠোনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফল কুড়ানোর জন্য। আমার স্ত্রী এই বয়সেই ওরা চুরি শিখছে বলে শঙ্কিত”।

আমি বললাম, “ ব্যক্তিগতভাবে আমি একে চুরির পর্যায়ে ফেলি না। কারণ শিশুদের মধ্যে অত ছোট বয়সে কোন জিনিস কি সে সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারনা জন্মায় না। একটা সুন্দর জিনিস পেলেই তারা নিজের মালিকানায় পাওয়ার চেষ্টা করে”।

মিস্টার জ্যাকসন অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। 
আমি বললাম, “আপনি কি সত্যজিত রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটা দেখেছেন?” 
তিনি জবাব দিলেন, “অনেক বার। ওটা আমার প্রিয় ছবিগুলোর একটি।”
আমি বললাম, “অপু আর দুর্গার কালবোশেখির ভেতরে আম কুড়ানোর দৃশ্যের কথা মনে আছে? অথবা ঐ দৃশ্যটা, যেখানে দুর্গা পড়শিদের বাড়ি থেকে একটা পুতির মালা চুরি করেছিল? পরবর্তীতে সেটা সে নিয়েছিল বলে মায়ের কাছেও স্বীকার করেনি?”
তিনি বললেন, “হ্যা, হ্যা, দুর্গার মৃত্যুর অনেক পর অপু সেটা খুঁজে পেয়ে পুকুরের পানিতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। বোনের চুরির লজ্জা ঢাকার জন্যে।”
আমি বললাম, “দুর্গাকে পুতির মালার জন্যে কি চোর বলবেন?”
মিস্টার জ্যাকসন চমৎকৃত। বললেন, “কখনই না। আমার স্ত্রী ফিরে এলে আপনার এই কথাগুলো তাকে বলতেই হবে। ”

ডিনারের পর মিঃ জ্যাকসন আমাকে নিয়ে এলেন গেটের বাইরের সেই পাটাতনের উপরে। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত আমরা পরস্পরের সাথে গল্পে মত্ত হয়ে থাকি। মিস্টার জ্যাকসন বিয়ার পান করেন। আমি কোক। আমি অবাক হই বাংলাদেশকে নিয়ে তার স্মৃতি আর জ্ঞানের বহর দেখে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ছয়দফা আন্দোলন, উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সনের যুদ্ধ, বাংলাদেশের সংস্কৃতি – সবকিছু নিয়ে তারই প্রগাঢ় জ্ঞান। যা শুধু তিনি বইয়ের মাধ্যমে আহরণ করেননি। আহরণ করেছেন মানুষের সাথে তার বাস্তব সম্পর্ক থেকে। বাংলাদেশের তৎকালীন  সাংস্কৃতিক মণ্ডলের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথেই তার নিবিড় পরিচয় তথা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তার মুখ থেকেই আমি জানলাম যে, অভিনেতা আবুল হায়াত, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, সারা জাকের, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাইসুল ইসলাম আসাদ এবং আরও অনেকের সাথেই তার পরিচিতির সম্পর্ক ছিল। আমি বিমুগ্ধ। 

কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “বাঙ্গালীদের অভিব্যাক্তি প্রবল ধরণের শক্তিশালী।”
“কিভাবে?”আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“বাঙালিদের প্রধানতম অভিব্যাক্তিটা আসে তাদের মুখমন্ডল থেকে।”
কস্মিনকালেও আমার কাছে তা মনে হয়নি। বরং এই এলাকায় আসার পর থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং এই এলাকার সংস্কৃতিকে আমার কাছে বর্ণিল এবং উচ্চকিত মনে হয়েছে।

আমি মৃদু প্রতিবাদ করতেই তিনি বললেন, “ইউ আর টু ইয়াং টু মার্ক ইট। আপনি ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান অথবা একাত্তরের সময়কার স্টিল ছবিগুলো দেখবেন। তাহলেই বুঝবেন বাঙালিদের মুখের রেখাগুলো কিভাবে তাদের অন্তর্গত স্বত্বাকে প্রতিফলিত করে থাকে। বিশেষ করে যখন তারা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে।”

অতঃপর হাসতে হাসতে বললেন, “আপনাদের দেশে থাকতে আমার একবার ইচ্ছে হয়েছিল আপনাদের দেশের মানুষদের নিয়ে একটা মুভি তৈরি করার। দেহের অঙ্গভঙ্গির চেয়ে মুখের অভিব্যক্তিই যেখানে প্রধান ফোকাস হবে।”

আমার ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবির শেষ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে গেলো। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে বাসন্তীর মুখের ভেতর দিয়ে চিরকালীন বাস্তুচ্যুত মানুষের সর্বশান্ত হবার অভিব্যক্তির কথা! 
চারদিকে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। মেকং এর ওপরে আবছায়া অন্ধকার। চারদিক নির্জন। শুধুমাত্র পাথরের গায়ে ধাক্কা খাওয়া মেকং এর ঢেউ এর শব্দ শোনা যাচ্ছে। এক টানা। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে রাতভর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দের মত। আমার ভীষণ রকম দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। 
মিস্টার জ্যাকসনের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। 
“চলুন আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আসি। আগামীকাল খুব ভোর ছয়টায় প্রস্তুত থাকবেন। একটা অসাধারণ জিনিস দেখাব আপনাকে।”

হোটেলে ফিরে ঘুম আসছিল না আমার। বারান্দায় দাঁড়ালাম। আকাশ নিকষ কালো। মাথার প্রায় ওপরে কালপুরুষ। উত্তরে দূরে দিগন্তের উপরে সপ্তর্ষি মন্ডল দেখা যাচ্ছে। এর চতুষ্কোণ তারা গুলোর শেষ দুটোকে যোগ করলে যে  মিটমিট করা তারার ওপর দিয়ে যায়, ওটাই ধ্রুব তারা। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না, কারণ পাহাড়র ওপারে ঢাকা পড়ে গেছে।

ছেলেবেলায় প্রাইমারী স্কুলের হারুন স্যার বলতেন, “আগের দিনে জাহাজের নাবিকেরা দিক হারিয়ে ফেললে, ধ্রুব তারার সাহায্য নিয়ে গহীন সাগর থেকে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসতো।”

১৯৮৫ সাল। রাত্রিকালীন ম্যাপ রিডিং অনুশীলন। আমি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। চট্টগ্রাম সেনানিবাস এবং হাট হাজারীর মধ্যবর্তী পাহাড়গুলো আমি অতিক্রম করছি। অধিনস্ত সৈনিকদের সাথে। কম্পাস ছাড়া শুধুমাত্র সামরিক ম্যাপ নিয়ে। ইউনিটের উপ অধিনায়ক মেজর মুহিব আমাদের কাছ থেকে সবগুলো কম্পাস নিয়ে নিয়েছেন। আমাদের আজ রাতের লেসন ‘কিভাবে ধ্রুবতারা থেকে ম্যাপের ওপর বিয়ারিং নিয়ে রাত্রিকালীন চলাচল করতে হয়। কম্পাসের  ৩৬০ ডিগ্রিকে সমকোণে ভাঙতে ভাঙতে, পেন্সিল টর্চের মৃদু অনুজ্জ্বল আলোতে সামরিক ম্যাপ থেকে দিশা নিয়ে ধ্রুবতারা অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে যেতাম। রাতের আঁধারে। এক স্থান হতে আরেক স্থানে। এভাবে পথ চলতে চলতে কতদূরেই না চলে গেছি। 

ক্রমশই নস্টালজিক হয়ে পড়ছি। স্মৃতি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্য কোথাও। এই মুহূর্তে ঢাকা সেনানিবাসে  থাকলে স্টেশন অফিসার্স বি এর ছাদে শুয়ে অবশিষ্ট রাত ‘ইউ এফ ও’ দেখার চেষ্টা করতাম। 

চলবে......

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ