Alexa মিথ্যা থেকে বাঁচার কৌশল (পর্ব-২)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ১ ১৪২৬,   ১২ জ্বিলকদ ১৪৪০

মিথ্যা থেকে বাঁচার কৌশল (পর্ব-২)

ওমর শাহ

 প্রকাশিত: ১৯:১১ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৯:১১ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

প্রচলিত মিথ্যার ধরন ও আল্লাহওয়ালাদের মিথ্যা থেকে বাঁচার কৌশল।

হাদিস শরিফে রয়েছে, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বল তো বড় গুনাহ কোনগুলো? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বলে ছিলেন, বড় গুনাহ হলো আলাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালল্লাম তখন হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর বললেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। এ কথা তিনি তিনবার বললেন। তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার প্রতি ঘৃণা জানাতে প্রথমে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্যকে শিরকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দ্বিতীয়ত তিনি মিথ্যা সাক্ষ্যের জঘণ্যতা প্রমাণ করার জন্য ‘মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বড় গুনাহ’ এই কথা তিনবার বলেছেন। নবিজি সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসার ধরণ পরিবর্তন করে হেলান থেকে সোজা হয়ে বসে মিথ্যার ভয়াবহতার প্রতি ইংগিত করলেন। 

পবিত্র কোরআন মাজিদেও মিথ্যা সাক্ষ্যকে শিরকের সঙ্গে উল্লেখ করে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন,

فاجتنبوا الرجس من الاوثان واجتنبوا قول الزور

“তোমরা মূর্তিপূজা থেকে বেঁচে থাক। মিথ্যা কথা থেকেও বেঁচে থাক।” (সূরা: হজ, আয়াত: ৩০) এতে প্রতীয়মান হয়, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কত মারত্মক গুনাহ।

মিথ্যা সার্টিফিকেট দেওয়া:

মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া মিথ্যা কথা বলার চেয়েও মারাত্মক ও ভয়াবহ গুনাহ। কারণ তাতে কয়েকটি গুনাহ একত্র হয়। যেমন, প্রথমত মিথ্যা বলার গুনাহ। দ্বিতীয়ত অন্যকে ধোঁকা দেয়ার গুনাহ। কেননা মিথ্যা সার্টিফিকেটের কারণে মানুষ তাকে অত্যন্ত ভালো ও যোগ্য মনে করে। তাকে যোগ্য ও ভালো মনে করে তার সঙ্গে কাজ-কারবার করে থাকেন। আর এই কাজ-কারবারে কোনো ধরনের ক্ষতি হলেও মেনে নেন। এমতাবস্থায় আদালতে তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়া হলে যদি তা মিথ্যা হয়ে থাকে, মিথ্যা সাক্ষের ওপর যে রায় প্রদান করা হয়, রায় প্রদানের ফলে যদি কোনো ক্ষতি হয়, সব ক্ষতির পরিণাম ওই মিথ্যা সাক্ষ্য দানকারীর ওপর বর্তাবে। এ জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার গুনাহ অত্যন্ত মারাত্মক।

আদালতে মিথ্যার ছড়াছড়ি:

আজকাল তো মিথ্যার বাজার এতটাই সরগরম যে, কেউ কোথাও মিথ্যা বলুক বা না বলুক, আদালতে দাঁড়িয়ে অবশ্যই মিথ্যা বলেন। বহুলোককে এ কথা বলতে শোনা যায়, সত্য কথা বলে আদালতে কে দাঁড়াবে। উদ্দেশ্য হলো, মিথ্যা বলার স্থানই আদালত। সেখানে মিথ্যা বলতেই হয়। অথচ এই ব্যক্তি পরস্পর কথা-বার্তা বলার সময় সত্য কথাই বলে থাকেন। আদালতে গিয়ে মিথ্যা বলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিরকের বরাবর সাব্যস্ত করেছেন। কেননা এটা হলো বহু গুনাহের সমষ্টি।

যেখানে মিথ্যা বলার অনুমতি:

পরিস্থিতি কখনো এমন হয়, যেখানে আলাহ তায়ালা মিথ্যা বলারও অনুমতি প্রদান করেছেন। যেমন, কোথাও নিজের প্রাণ রক্ষার জন্য অনিচ্ছা সত্তেও মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয়। মিথ্যা বলা ছাড়া প্রাণরক্ষার অন্য কোনো পন্থা না পাওয়া যায়। অসহনীয় জুলুম অত্যাচারের সম্মুখীন হয়। এমন জুলুম, যা সহ্য করার কথা কল্পনাও করা যায় না। এমতাবস্থায় শরিয়ত মিথ্যার বলার অবকাশ দিয়েছে। তবে উল্লেখিত অবস্থায়ও প্রাণপণ চেষ্টা করবে। সরাসরি মিথ্যা বলা পরিহার করে হেকমত করে কথা এদিক-ওদিক করে নেবে। যাতে উপস্থিত বিপদের আশঙ্কা কেটে যায়। একে শরিয়তের পরিভাষায় তাউরিয়া বলা হয়। যেমন, এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ করা, যার প্রকাশ্যে এক অর্থ বুঝে আসে। ভিতরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে। এমন প্যাঁচালো কথা বলা যাতে স্পষ্ট মিথ্যা না হয়। 

হজরত আবু বকর (রা.) এর মিথ্যা থেকে বাঁচার কৌশল:

হিজরতের সময় হজরত আবু বকর (রা.) যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হিজরত করছিলেন, তার পূর্বে মক্কার কাফের-গোষ্ঠী গোটা এলাকায় চারদিক থেকে চরম নজরদারি শুরু করে, যাতে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালিয়ে কোথাও যেতে না পারে। এদিকে গোটা মক্কায় ঘোষণা করা হয়- যেব্যক্তি মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে আটক করে আনতে পারবে তাকে একশ’ আরব্য উট পুরস্কার দেওয়া হবে। এ কথা শুনে মক্কার কাফের-গোষ্ঠী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুঁজতে লেগে গেল। একপর্যায়ে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো যে হজরত আবু বকর (রা.)-কে চিনে, তবে মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চেনে না। লোকটি জিজ্ঞেস করল, আবু বকর, তোমার সঙ্গে এ ব্যক্তি কে? হজরত আবু বকর (রা.) কামনা করছিলেন কিছুতেই যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খোঁজ কেউ জানতে না পারে। দুশমন যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের অবস্থান সম্পর্কে অবগত না হতে পরে। তিনি ভাবলেন এখন এ ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে সত্য বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানের নিরাপত্তার ব্যাপারে শংকা রয়েছে। আর যদি জাবাবে সাথী সম্পর্কে কিছু না বলি তা হলে মিথ্যাবাদী হতে হয়। বাস্তবে এহেন মুহূর্তে আল্লাহর বান্দাদেরকে তিনিই পথপ্রদর্শন করেন। তাই হজরত আবু বকর (রা.) জবাবে বললেন,
 
هذا الرجل يهدينى السبيل

এ ব্যক্তি আমার রাহবার। তিনি আমাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
 
হজরত আবু বকর (রা.) এমন এক শব্দ উচ্চারণ করে দিলেন, যা শুনে ওই ব্যক্তি ধরে নিল সাধারণত পথ চলতে মানুষ পথ প্রদর্শক (রাহবার=গাইড) হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে চলে। তাই সে ব্যক্তি আর কথা বাড়াল না। তার গন্তব্যে চলে গেল। এদিকে হজরত আবু বকর (রা.) আমার রাহবার দ্বারা উদ্দেশ্য নিলেন আমার এ সাথী আমার দীনের রাহবার। ধর্মের পথপ্রদর্শক, জান্নাতের পথপ্রদর্শক। আল্লাহর রাস্তা দেখানেওয়ালা। এখন দেখুন কী করে হজরত আবু বকর (রা.) সুস্পষ্ট মিথ্যা বলা থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন এবং মিথ্যা বলা পরিহার করেছেন।
 
তিনি এমন একটি শব্দ বললেন যে শব্দটির মাধ্যমে মিথ্যাও হলো না, সত্যও লুকালো না। যারা একথা ভাবেন যে, আমি মুখ দিয়ে কখনো মিথ্যা কথা বা মিথ্যা ঘটনা বলবো না নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাকেও মদদ করে থাকেন।
 
হজরত গাঙ্গুহি (রহ.) এর মিথ্যা থেকে বাঁচার কৌশল:

হজরত মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) ১৮৫৭ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সোচ্চার আজাদী আন্দোলনে বড় অবদান রেখে ছিলেন। তিনি ছাড়াও হজরত মাওলানা কাসেম নানুতবি (রহ.) হাজী ইমদাদুলাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) প্রমুখ এ যুদ্ধে বড় অবদান রেখে ছিলেন। তখন যারা এ সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন তাদেরকে ইংরেজ সরকার গ্রেফতার করে নিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাতে শুরু করল। এমনকি প্রতিটি মহলায় ভ্রাম্যমান ম্যাজিস্টেট আদালত স্থাপন করল। কোথাও কাউকে সন্দেহ হলে আটক করে ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্টেটের আদালতে পেশ করা হত। আর বিচারক ফাঁসির আদেশ দিয়ে দিত। তাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে শহিদ করে দেয়া হত। সে সময়ে মিরাঠে এমন একটি আদালতে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলো। তাকে গ্রেফতার করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত করা হলো। ম্যাজিস্ট্রেট তাকে প্রশ্ন করলেন- তোমার নিকট হাতিয়ার আছে? আমরা জানতে পেরেছি তোমার নিকট বন্দুক রয়েছে। (বাস্তবেও রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির নিকট বন্দুক ছিল।) তবে ম্যাজিস্ট্রেট যখন তাকে প্রশ্ন করছিলেন সে সময় তার হাতে একটি তাসবীহ ছিল। এটা দেখিয়ে তিনি বললেন এ হলো আমার হাতিয়ার। তিনি এ কথা বলেননি আমার নিকট হাতিয়ার নেই। কেননা একথা একেবারে মিথ্যা হবে। (দৃশ্যত তিনি সুফিই ছিলেন। তাকে দেখে দরবেশ মানে হত।) 
বাস্তবে আল্লাহ মদদ করে থাকেন তার বিশেষ বান্দাদের প্রতি। প্রশ্নপর্ব চলছিল, ততক্ষণে একজন অপরিচিত মহিলা এসে যখন দেখল হজরত গাঙ্গুহি (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হচ্ছে; তখন ওই মহিলা বলতে লাগলো, আরে তাকে কোথা হতে গ্রেফতার করে এনেছো? সে তো আমাদের মহল্লার মসজিদের মুয়াজ্জিন। এভাবেই আল্লাহ তায়ালা গাঙ্গুহি (রহ.)-কে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। 

হজরত নানুতবি (রহ.) এর মিথ্যা থেকে বাঁচার কৌশল:

যখন হজরত কসেম নানুতবি (রহ.) এর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলো, তখন তিনি ছাত্তা মসজিদে (ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে অবস্থিত) অবস্থান করছিলেন। পুলিশ সেখানে পৌঁছে গেল। মসজিদে তিনি একাকী ছিলেন। হজরত কাসেম নানুতবি (রহ.) এর নাম শুনে মানসপটে ভেসে উঠে এমন এক প্রতিচ্ছবি যে, তিনি বিখ্যাত আলেম, চাকচিক্যময় মনোমুগ্ধকর পোশাক পড়ে থাকবেন। এর বিপরীতে পুলিশ সেখানে সাধারণ লুঙ্গি ও জামা পরিহিত এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। তারা ভাবলেন এ লোক মসজিদের খাদেম। তারা জিজ্ঞেস করলেন- মাওলানা মোহাম্মাদ কাসেম কোথায়? প্রশ্ন শুনে তিনি এক পা পিছিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ পূর্বে তো তিনি সেখানেই ছিলেন। একথা দ্বারা তিনি বুঝালেন ওই স্থানে এ ব্যক্তি নেই। তবু তিনি মুখে স্পষ্ট মিথ্যা কথা বলেননি যে এখানে তিনি নেই। এতে করে পুলিশ চলে গেল।
 
জানের ওপর হুমকি; এ মুহূর্তেও আল্লাহর বান্দারা খেয়াল রাখেন যাতে মিথ্যা কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে না যায়। স্পষ্ট মিথ্যা মুখ দিয়ে বের না হোক প্রতিকূল পরিবেশে অনুপায় হয়ে কখনো মিথ্যা বলতে হলে কথাকে এদিক সেদিক করে ঘুরপ্যাচ খাঁটিয়ে বলবে যাতে কাজ আদায় হয়। সরাগরি মিথ্যা যেন না হয়। এটাই উত্তম। আর কখনো যদি জান যাওয়ার উপক্রম হয় কিংবা অসহ্য অত্যাচার জুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়নের সম্মুখীন হলে ঘুরপ্যাচ খাঁটিয়ে এদিক সেদিক করে বলা। কথা কাজে না আসলে সে সময় মিথ্যা বলা শরিয়ত অনুমোদন করেছে। তাই বলে বর্তমানে যথেচ্ছা ও যেভাবে মিথ্যা বলা হচ্ছে; এগুলো সবই হারাম। তাতে রয়েছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার গুনাহ। 

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এধরনের গুনাহ থেকে হিফাজত করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে