মা দিবসের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও দিনটির ঘোর বিরোধীতায় ছিলেন তিনি

ঢাকা, সোমবার   ২৫ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭,   ০২ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মা দিবসের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও দিনটির ঘোর বিরোধীতায় ছিলেন তিনি

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩০ ১২ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:৫৭ ১২ মে ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট শব্দ হচ্ছে মা। তবে ছোট হলেও সবচেয়ে মধুর শব্দ এটি। সবচেয়ে সুমধুর ডাক মা। মাকে ভালোবাসতে কোনো দিন বা ক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। 

তবুও পৃথিবীর সব মায়েদের প্রতি সম্মান জানাতে কয়েক যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব মা দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পালিত হয় মা দিবস। সাড়া বিশ্বে নানা আয়োজনে কয়েক দশক ধরে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। 

তবে জানেন কি? মা দিবসের প্রতিষ্ঠাতা কে? কবে থেকেই বা শুরু হলো এই দিবস। আর কেনই বা স্বয়ং এর প্রতিষ্ঠাতাই এটি পালনে বিরোধীতা করেছিলেন? চলুন জেনে নেয়া যাক সেসব কাহিনী- 

আনা মেরি জার্ভিস হলেন মা দিবসের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০৮ সালের ১০ মে প্রথম পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফ্টন শহরের একটি গির্জায় আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করা হয়। তবে এর বহু আগেই মা দিবসের শুরু। প্রাচীন গ্রিসের মাতৃরূপী দেবী সিবেলের আরাধনা, প্রাচীন রোমানে দেবী জুনোর আরাধনা ও ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে মাদারিং সানডের মতো বেশ কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠানে মায়েদের সম্মান জানানো হত। 

আনা মেরি জার্ভিস মায়েদের সম্মানে নির্দিষ্ট একটি রবিবারে পালিত হয় মাদারিং সানডে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের প্রচলন শুরু হয় মার্কিন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হোই নামে এক নারীর হাত ধরে। ১৮৭০ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পৈচাশিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে শান্তির প্রত্যাশায় জুলিয়া একটি ঘোষণাপত্র লেখেন। এটি মাদার’স ডে প্রোক্লেমেশন নামে পরিচিত ছিল। 

এ ঘোষণার মধ্যে জুলিয়া রাজনৈতিক স্তরে সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। এরপর যুদ্ধ শেষে পরিবারহীন অনাথদের সেবায় ও একত্রীকরণে নিয়োজিত হন। মার্কিন সমাজকর্মী আনা রিভিজ জার্ভিস ও তার মেয়ে আনা মেরি জার্ভিস এসময় জুলিয়া ওয়ার্ড ঘোষিত মা দিবস পালন করতে শুরু করেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আনা রিভিজ জার্ভিস ১৯০৫ সালের ৫ মে মাসে মারা যান। 

মায়ের মৃত্যুর পর আনা মেরি জার্ভিস মায়ের শান্তি কামনায় ও তার সম্মানে সরকারিভাবে মা দিবস পালনের জন্য প্রচারণা চালান। এর তিন বছর পর প্রথম মা দিবস গির্জায় পালিত হয়। চার্চটি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল মাদারস ডে শ্রাইন নামে পরিচিত। আনা সাদা কারনেশন ফুল ভীষণ ভালোবাসতেন। তাই চার্চে উপস্থিত সব মায়েদের সম্মানে সে সবাইকে দুইটি করে সাদা কারনেশন ফুল উপহার দেন। 

এই গির্জা থেকেই শুরু হয়েছিল মা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা১৯১২ সালে তিনি স্থাপন করেন মাদার’স ডে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন। এই সময় আনা জার্ভিস মা দিবসকে ছুটির দিন ধার্য করতে ও দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। বিভিন্ন রাজনীতিবিদ এবং সংবাদপত্রে চিঠি পাঠাতে শুরু করে। তার এই প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, মেক্সিকো, চীন, জাপান, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায়। 

সেবছরই আরো কিছু শহর ও রাজ্যে গির্জায় এই দিবস পালন করা হয়। এরপর ১৯১৪ সালে রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে মাদার্স ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই সরকারিভাবে মা দিবস পালিত হতে থাকে। এ দিনটিকে আনা সব মায়েদের তার সন্তানদের সঙ্গে একান্তে কাটানোর কথা ভেবেছিলেন। আনা নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। তবে তিনি মনে করেছিলেন সারা বছর মায়েরা বা সন্তানরা ব্যস্ত থাকে এই দিনটিতে অন্তত তারা একসঙ্গে থাকুক। 

তবে কয়েক বছরের মধ্যেই মা দিবসের মূল প্রাধান্যকে ছাড়িয়ে যায় দিনটির বাণ্যিজ্যিক প্রভাব। মা দিবসে ফুল বিক্রি ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। এছাড়াও চলকেট, কার্ড, বিভিন্ন উপহার দেয়ার হিরিক পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে দিনটি এতটাই বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে যাতে করে আনা জার্ভিস প্রতিবাদী হয়ে পড়েন। দিনটির এমন অবমাননার প্রতিবাদে তিনি নিজের সমস্ত সম্পত্তি ব্যয় করেন। 

মা দিবস নিয়ে জাকজমকতার বিপক্ষে ছিল আনাএমনকি ১৯২৫ সালে আমেরিকান ওয়ার মাদার্স নামে একটি সংস্থা যখন মাদার্স ডে উপলক্ষ্যে অর্থ সংগ্রহ করতে থাকে। যা তারা অনুষ্ঠানের আয়োজনে ব্যয় করে। আনা এর ঘোর বিরোধিতা শুরু করেন। এসব দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য মা দিবসকে উপলক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ফার্স্ট লেডি এলেনর রুজভেল্টকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি আন্না। এজন্য অবশ্য তিনি গ্রেফতারও হয়েছিলেন। 

১৯৪০ সালে আনা মা দিবসের ছুটি বাতিলের জন্য সক্রিয়ভাবে সরকারকে চিঠি পাঠাতে থাকেন। তবে তার এবারের চেষ্টা আর সফল হয়নি। তার প্রতিষ্ঠিত দিনটিতে আজো সারাবিশ্বে মা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মেরি আনা জার্ভিসের জন্ম পহেলা মে ১৮৬৪। অভিমান নিয়েই ১৯৪৮ সালে ফিলাডেলফিয়ার মার্শাল স্কয়ার সানিটারিয়ামে মারা যান আনা জার্ভিস। 

যিনি নিজে মাতৃত্বের স্বাদ পাননি কোনো দিন। তারপরও মায়েদের সম্মানে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন একটি দিন। মা দিবসে বাণিজ্য করে এমন ফুল ও কার্ড শিল্পের লোকেরাই তার হাসপাতালের বিল দিয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে এ দিনটিকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে নানাভাবে। ন্যাশনাল স্পেন্ডিং ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালিত একটি বার্ষিক ব্যয় জরিপ অনুসারে, আমেরিকানরা ২০১৩ সালে মা দিবসে গড়ে ১৮ দশমিক ৯৪ ডলার ব্যয় করেছে, যা ২০১২ সালের তুলনায় মোট ১১ শতাংশ বেশি। 

আনার সমাধিন্যাশনাল স্পেন্ডিং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মাদার্স ডে ব্যয় প্রতি বছর ২০ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রচলিত উপহারের পাশাপাশি ১৪ দশমিক এক শতাংশ উপহারদাতা তাদের মায়েদের স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটের মতো উচ্চ প্রযুক্তির গ্যাজেট কিনে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। প্রচলিত উপহারগুলোর মধ্যে কার্ড, ফুল এবং ক্যান্ডি থেকে শুরু করে পোশাক এবং গহনাও রয়েছে। 

এভাবেই পৃথিবীর সব মায়ের সম্মানে পালিত হচ্ছে মা দিবসটি। তবে শুধু লোক দেখানো ভালোবাসা নয়। মাকে প্রতিটি মুহূর্তেই ভালোবাসুন। মায়ের ভালোবাসা শুধু ফেসবুকের নিউজফিডেই যেন সীমাবদ্ধ না হয়। সচেতন ও যত্নবান হোন মায়ের প্রতি। সবসময় ভালো ব্যবহার ও সম্মান করুন। মনে রাখবেন আপনার থেকেই শিখবে আপনার পরবর্তি প্রজন্ম। 

সূত্র: হিস্ট্রিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস