Alexa মাপ-পরিমাপ নিয়ে আমরা কতটুকু জানি?

ঢাকা, বুধবার   ২৩ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৭ ১৪২৬,   ২৩ সফর ১৪৪১

Akash

মাপ-পরিমাপ নিয়ে আমরা কতটুকু জানি?

সালমান আহসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:০৬ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:১১ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

দৈনন্দিন জীবনে পারিমাপের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিনিয়তই বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের নানা ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় মাপ-মরিমাপের মাধ্যমেই। যেমন- তোমার উচ্চতা কত? তোমার ওজন কত? এখন কয়টা বাজে? আজকের তাপমাত্রা কত? ইত্যাদি। 

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য দরকার উচ্চতা, ওজন, সময় বা তাপমাত্রার মাপ-জোখের। দৈনন্দিন জীবনে এই মাপ-জোখের ওপর আমরা নানাভাবে নির্ভরশীল। এই মাপ-জোখের মাধমে আমরা মূলত কোনো কিছুর পরিমাণ নির্ণয় করি। আর কোনো কিছুর পরিমাণ নির্ণয় করাই হলো পরিমাপ। দৈনন্দিন জীবনে নানান ঘটনায় পরিমাপের সঙ্গ ত্যাগ করার আমাদের দুষ্কর। যেমন- চাল কিনতে, রান্না করতে তেলের ব্যবহার, জামাকাপড় তৈরির সময়ও কিন্তু মাপের দরকার হয়।

ভৌতভাবে উপলব্ধিযোগ্য বা পরিমাপযোগ্য বিষয়বস্তুকেই রাশি বলে। ভৌত রাশিকে সচরাচর মৌলিক (fundamental) রাশি এবং লব্ধ (derived) রাশিতে ভাগ করা হয়। রাশির এই বিভাজন স্বেচ্ছাধীন, কারণ যেকোনো ধরনের ক্রিয়াকলাপে একটি রাশিকে মৌলিক বিবেচনা করলে অন্য কোনো ক্রিয়াকলাপে তা লব্ধ রাশি বিবেচিত হতে পারে। লব্ধ রাশি হল সেগুলো যাদের সংজ্ঞার ভিত্তি হল অন্যান্য ভৌত রাশি। বেগ, ত্বরণ, আয়তন প্রভৃতি হলো লব্ধ রাশি। 

দৈর্ঘ্য, সময়, ভর, তাপমাত্রা, তড়িৎপ্রবাহমাত্রা, দীপনপ্রাবল্য, পদার্থের পরিমাণ এই সাতটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাশি হচ্ছে মৌলিক রাশি। কোনো কিছুর পরিমাণ নির্ণয়ে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত আছে। যেমন- তোমার উচ্চতা কত? এর উত্তর বিভিন্ন রকম হতে পারে। সাধারণত আমরা বলি ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। আবার জাতীয় নিবন্ধন ফরম বা পাসপোর্টের ফরম পূরণের সময় লিখতে হয় ১ মিটার ৬১ সেন্টিমিটার। এরকম কেন?

অথবা ধরা যাক, কেউ একজন তার হাতে থাকা লম্বা একটি রশির দৈর্ঘ্য যদি বলে ১৬ হাত এবং অন্য একজন শিক্ষার্থী সেই রশি মেপে দেখলো সেটা ১৭ হাত। তখন এই বিভ্রান্তি দূরীকরণে কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত? এ বিভ্রান্তি দূর করার জন্য পরিমাপের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ পরিমাণকে বিবেচনা করা হয়। কোনো কিছু পরিমাপ করার জন্য একটি সুবিধাজনক পরিমাণকে আদর্শ অংশের পরিমাণই পরিমাপের একক।

রাশি যেমন মৌলিক ও লব্ধ হতে পারে তেমনি এককও মৌলিক ও লব্ধ হতে পারে। মৌলিক রাশির পরিমাপের জন্য যে, একক ব্যবহার করা হয় তাকে মৌলিক একক বলে। এরূপ একক সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেমন- দূরত্বের একক সেন্টিমিটার, ভরের একক কিলোগ্রাম ইত্যাদি। লব্ধ রাশির পরিমাপের জন্য যে একক ব্যবহার করা হয় তাকে লব্ধ একক বলা হয়। এই এককসমূহ একাধিক মৌলিক একক থেকে প্রতিপাদন করা হয়। যেমন- কাজের একক জুল, বলের একক নিউটন ইত্যাদি।

একই পরিমাপের জন্য আমরা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকি। মূলত দুই ধরণের পরিমাপ- ব্রিটিশ এবং মেট্রিক পদ্ধতিতে অতীতে পরিমাপ নির্ণয় করা হত। তাছাড়া এমকেএস (মিটার, কিলোগ্রাম, সেকেন্ড), এফপিএস (ফুট, পাউন্ড, সেকেন্ড) ও সিজিএস (সেন্টিমিটার, গ্রাম, সেকেন্ড) পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অর্থাৎ একই রাশি পরিমাপের জন্য বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন একক ব্যবহার করা হতো। এতে করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতো।

পরিমাপের পদ্ধতি ব্যবহারের বিভিন্নতার এই সমস্যা অনুধাবন করে ১৯৬০ সাল থেকে পৃথিবীর সমগ্র দেশে একটি সাধারণ পরিমাপের পদ্ধতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অর্থাৎ পরিমাপের জন্য সর্বজনীন একটি আদর্শ তৈরি করা হয়। এটিকে এসআই বা ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম অব ইউনিট বলা হয়। এদেশেও ১৯৮২ সালের পয়লা জুলাই থেকে আন্তর্জাতিক এককই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এসআই পদ্ধতিতে মূল এককগুলোর নাম এবং এদের চিহ্ন নীচের ছকে দেখানো হল- 

এসআই পদ্ধতিতে পরিমাপে এককএছাড়া কোণের একক রেডিয়ান (c) এবং ঘনকোণের একক স্টেরেডিয়ান (sd)– কেও মূল একক ধরা হয়। cgs এবং SI এই দুটি পদ্ধতিকে একত্রে মেট্রিক বা দশমিক পদ্ধতি বলা হয়। এই দু’টি পদ্ধতিতে যেকোনো একক থেকে ছোটো বা বড়ো এককে যেতে হলে দশমিক বিন্দুকে প্রয়োজনমত ডান দিকে বা বাম দিকে সরালেই চলে।

সব ভৌতরাশির একক হয় না। কারণ কোনো কোনো ভৌতরাশির পরিমাপ প্রকাশে এককের প্রয়োজন হয় না। যে সব ভৌতরাশি দুটি সমজাতীয় ভৌতরাশির অনুপাত হিসাবে প্রকাশিত হয় তাদের একক থাকে না। যেমন- পারমাণবিক বা আণবিক গুরুত্ব। এরা দু’টি ভরের অনুপাত হওয়ায় এককগুলো কেটে যায়।

অনুরূপ, আপেক্ষিক গুরুত্ব (দু’টি ঘনত্বের অনুপাত), আপেক্ষিক আর্দ্রতা (দু’টি ভরের অনুপাত), স্থিতিস্থাপক বিকৃতি (দু’টি দৈর্ঘ্য বা আয়তনের অনুপাত), যন্ত্রের যান্ত্রিক সুবিধা (দু’টি বলের অনুপাত)- মাত্রাদের কোনো একক নেই। নিম্নে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মৌলিক এককগুলের জন্য সর্বশেষ গৃহীত আদর্শ উপস্থাপন করা হল-

দৈর্ঘ্যের একক (মিটার): ভ্যাকিউয়ামে বা বায়ুশূন্য স্থানে আলো ‘১/২৯৯৭৯২৪৫৮’ সেকেন্ডে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে ১ মিটার বলে। মিটারের ভগ্নাংশ বা গুণিতাংশ ব্যবহার করে ছোটো বা বড়ো দৈর্ঘ্যের একক পাওয়া যায়।

সময়ের একক: আসআই (SI) পদ্ধতিতে সময়ের একক সেকেন্ড। 

আধুনিক সংজ্ঞা অনুসারে, প্রমাণ চৌম্বকক্ষেত্রে অবস্থিত তেজষ্ক্রিয় সিজিয়াম (Cs133) পরমাণুর ৯, ১৯২, ৬৩১,৭৭০ সংখ্যক পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্পন্দনের (রৈখিক পথে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে যে গতির পুনরাবৃত্তি ঘটে) জন্য প্রয়োজনীয় সময়কে ১ সেকেন্ড ধরা হয়। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ বা গুণিতাংশ ব্যবহার করে ছোটো বা বড়ো সময়ের একক পাওয়া যায়। সময়ের ছোটো একক হিসাবে আমরা মিলিসেকেন্ড (ms) এবং মাইক্রোসেকেন্ড (µs) ব্যবহার করে থাকি।

(1 ms = 10-3 s, 1µs = 10-6 s) আবার সময়ের বড়ো একক হিসেবে আমরা ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর ইত্যাদি ব্যবহার করি।

ভরের একক (কিলোগ্রাম): ফ্রান্সের স্যাভ্রেতে ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অব ওয়েটস্ এন্ড মেজারস-এ সংরক্ষিত প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতুর তৈরি ৩ দশমিক ৯ সে.মি. ব্যাস এবং ৩ দশমিক ৯ সে.মি উচ্চতা বিশিষ্ট একটি সিলিন্ডারের ভরকে ১ কিলোগ্রাম বলে।

তাপমাত্রার একক (কেলভিন): পানির ত্রৈধ বিন্দুর তাপমাত্রার ‘১/২৭৩.১৬’ ভাগকে ১ কেলভিন বলে।

তড়িৎ প্রবাহের একক (অ্যাম্পিয়ার): ভ্যাকিউয়ামে বা বায়ু শূন্য স্থানে এক মিটার দূরত্বে অবস্থিত অসীম দৈর্ঘ্যের এবং উপেক্ষণীয় প্রস্থচ্ছেদের দু’টি সমান্তরাল সরল পরিবাহীর প্রত্যেকটিতে যে পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহ চললে পরস্পরের মধ্যে প্রতি মিটার দৈর্ঘ্যে ২×১০^-৭নিউটন বল উৎপন্ন হয়, তাকে ১ অ্যাম্পিয়ার বলে।

দীপন ক্ষমতার একক (ক্যান্ডেলা): ১০[পারসেক] চাপে প্লাটিনামের হিমাঙ্কে (২০৪২ কেলভিন) কোনো কৃষ্ণবস্তুর পৃষ্ঠের ‘১/৬০০০০০’ বর্গমিটার পরিমিত ক্ষেত্রফলের পৃষ্ঠের অভিলম্ব বরাবর দীপন ক্ষমতাকে ১ ক্যান্ডেলা বলে।

পদার্থের পরিমাণের একক (মোল): যে পরিমাণ পদার্থ ০.০১২ কিলোগ্রাম কার্বন- ১২ এ অবস্থিত পরমাণুর সমান সংখ্যক প্রাথমিক ইউনিট থাকে, তাকে ১ মোল বলে।

এবার তবে জেনে নিন আয়তন ও ঘনত্বের পরিমাপ সম্পর্কে-

আয়তন: কোনো বস্তু যে জায়গা জুড়ে থাকে তাকে এর আয়তন বলে।

ঘনত্ব: কোনো বস্তুর একক আয়তনের ভরকে তার উপাদানের  ঘনত্ব বলে। ঘনত্ব পদার্থের একটি সাধারণ ধর্ম। ঘনত্ব বস্তুর উপাদানের ও

তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল। ঘনত্বকে  ρ দ্বারা প্রকাশ কর হয়  m ভরের কোনো বস্তুর আয়তন v হলে, ঘনত্ব ρ হবে, ρ=frac{m}{V}= ho=frac{m}{V}

ঘনত্বের মাত্রা: [ρ]=[ML−3]

ঘনত্বের একক: [Kg m−3]

সমান আয়তনের এক টুকরা কর্ক এবং এক টুকরা লোহা পানিতে ছেড়ে দিলে দেখা যাবে কর্কের টুকরা ভেসে আছে আর লোহার টুকরা ডুবে গেছে। সাধারণ ভাবে বলা যায়, কর্কের চেয়ে লোহার ঘনত্ব বেশি তাই ডুবে গেছে। আসলে আয়তন সমান হলেও যার ঘনত্ব বেশি সেটি ভারী আর যার ঘনত্ব কম সেটি হালকা। জর্ডানে অবস্থিত মৃত সাগরে পানিতে লবণ এবং অপদ্রব্য বেশি থাকার কারণে পানির ঘনত্ব এত বেশি যে মানুষ পানিতে ভেসে থাকতে পারে। 

কয়েকটি পদার্থ এবং তাদের ঘনত্ব

পদার্থ ও তাদের ঘনত্বের পরিমাপ

দৈনন্দিন জীবনে ঘনত্বের ব্যবহার: 

* হাইড্রোজেনের ঘনত্ব বায়ুর ঘনত্ব থেকে কম হওয়ায় বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরে সহজে উপরের দিকে ওড়ানো হয়।

* সঞ্চয়ী কোষে ব্যবহৃত সালফিউরিক এসিডের ঘনত্ব- ( 1.5 imes 10^3 kgm^{-3}  থেকে  1.3 imes 10^3 kgm^{-3} )       

* হাইড্রোমিটার দিয়ে মাঝে মাঝে ঘনত্ব মেপে দেখতে হয়। ঘনত্ব বেশি হলে কোষ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যেমন- পচা ডিম পানিতে ভাসে এভাবে নষ্ট ডিম সনাক্ত করা যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস