.ঢাকা, সোমবার   ২২ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৯ ১৪২৬,   ১৬ শা'বান ১৪৪০

মানুষের কিছু মন্দ স্বভাব ও উত্তরণের উপায়

মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪৬ ১৯ মার্চ ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মানুষের ভেতর আল্লাহ তায়ালা কিছু গুণাগুণ সৃষ্টিগতভাবে দিয়ে রাখেন। এর মাঝে কিছু থাকে ভালো আর কিছু মন্দ। স্বভাবগুলো মানুষের আচার-আচরণে প্রকাশ পায়। এরকম কিছু মন্দ স্বভাব হচ্ছে- ঠাট্টা, মস্করা ও মাত্রাতিরিক্ত রসিকতা।

মানুষের মন্দ স্বভাবের একটি হচ্ছে ঠট্টা মস্করা। কোনো ব্যক্তি ঠাট্রা মস্করা করলে মানুষের ওপর তার ব্যক্তিত্বের যে প্রভাব রয়েছে তা আস্তে আস্তে দূর হয়ে যায়। যে কেউ তার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের সাহস দেখায়। জ্ঞানীরা বলেছেন, ‘আগুন যে ভাবে লাকড়িকে পুড়ে ফেলে তেমনি ভাবে ঠাট্টা-মস্করা ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে নিঃশ্বেস করে দেয়।’

কোনো কোনো হাকীম বলেন, ‘যার ঠাট্টা-মস্করা বেড়ে যাবে তার প্রভাব দূর হয়ে যাবে।’ মালেকি মাজহাবের প্রসিদ্ধ ফকীহ ইমাম আব্দুল বার (রাহ.) বলেন, ‘অধিকাংশ আলেমগণ ঠাট্টা-মস্করাকে অপছন্দ করেন। কারণ, এর পরিণাম হচ্ছে খারাপ। কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করলে আস্তে আস্তে তার ইজ্জত আব্রুর ওপর আঘাত দেয়া শুরু হয়ে যায়। ঠাট্টা-মস্করা হিংসা বিদ্বেষের কারণ হয় আর পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধকে নষ্ট করে ফেলে।’ কেউ কেউ বলেন, ‘প্রত্যেক বিষয়ের সূচনাপর্ব রয়েছে আর পরস্পর দুশমনির সূচনাপর্ব হচ্ছে কারো সঙ্গে মস্করা করা।’ কেউ কেউ এমনও বলেছেন, ‘ঠাট্টা মস্করা যদি উট হতো তাহলে এর বীর্য থেকে শুধু খারাপ কিছুই জন্ম নিতো।’

হজরত সায়িদ ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘ভদ্র মানুষকে নিয়ে হাশি-তামাশা করো না তাহলে শত্রুতা সৃষ্টি হবে। নিম্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গেও করো না তাহলে তোমার প্রতি দুঃসাহসিকতা দেখাবে। মাইমুন ইবনে মেহরান (রাহ.) বলেন, ‘কথার শুরু যদি হয় ঠাট্টা-মস্করা দিয়ে তাহলে ধরে নিবে এর শেষ হচ্ছে গাল মন্দ বলা দ্বারা।’ আবু হাফওয়ান নামক এক কবি বলেছেন, ‘তুমি বন্ধুর সঙ্গে রসিকতা করো যতক্ষণ সে ভালো পায়... অনেক সময় বন্ধুর সঙ্গে এমন রসিকতা করা হয়, যা দুশমনি সৃষ্টির জন্য চাবির কাজ দেয়।’ অন্য একজন বলেন, ‘তুমি এমন রসিকতা করো না, যাকে বেয়াদবি বলা যায়... মনে রেখো মাত্রাতিরিক্ত রসিকতা হচ্ছে, দুশমনির সূচনাপর্ব।’

মোটকথা হচ্ছে, ঠাট্টা-মস্করা ও মাত্রাতিরিক্ত রসিকতা না করা চাই। মাত্রাতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো ফল বয়ে আনে না। তবে সীমার ভেতর থেকে রসিকতা করতে পারা ভালো গুণ। কারণ, রসিকতা দ্বারা পরস্পর পরিচিতি ও সুসম্পর্ক তৈরি হয়। অবসাদ, একঘেয়েমি ও একাকীত্বের ভাব দূর হয়। এ জন্য গুণীজনেরা বলেন, কথার ফাঁকে ফাঁকে রসিকতা করা, তরকারিতে লবনের ন্যায়। অর্থাৎ লবন ছাড়া যেমন তরকারি স্বাদ হয় না তেমনিভাবে শুধু তথ্য উপস্থান দ্বারা শ্রোতাদের আকর্ষণ সৃষ্টি হয় না বরং এর জন্য প্রয়োজন কথার ফাঁকে ফাঁকে একটু রসগোল্লা খাইয়ে দেয়া। রাসূল (সা.)-ও কখনো কখনো রসিকতা করতেন।

বংশীয় গর্ব অহংকার:
সমাজের কেউ কেউ এমন আছে, উচ্চ বংশীয় হওয়ার কারণে বংশ নিয়ে যারা অন্যদের উপর গর্ব ও অহংকার করে। উচ্চ বংশীয় হওয়ার কারণে কারো সঙ্গে মিশে আবার কারো সঙ্গে মিশতে চায় না। কখনো কথায়ও তা ফুটে ওঠে। যেমন কেউ কিছু বললে, তাকে বলে তুমি কে? তোমার বাপের নাম কী? আমি ওমুক বংশের ছেলে আমাকে চিনো? ইত্যাদি ইত্যাদি। বংশীয় গর্ব, অহংকার জাহেলি যুগের বৈশিষ্ট্য। ইসলাম এসে জাহেলি যুগের সমস্ত নাপাক বৈশিষ্ট্যকে শেষ করে দিয়েছে। এ জন্য মুসলমানদেরকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, কেউ যেন উচ্চ বংশীয় হওয়ার কারণে, কারো উপর গর্ব-অহংকার না করে। বংশ নিয়ে গর্ব করা, ব্যক্তির আকলে ত্রুটি থাকার আলামত। কারণ, কেউ কী স্বেচ্ছায় কোনো বংশে জন্মগ্রহণ করতে পারে? বংশ কী এমন বিষয় যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালার নিকট বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে পারে? জাগতিক দিক থেকেও তো বংশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় যদি যোগ্যতা না থাকে। 

ইসলাম বলে, গর্ব করার মতো যদি কোনো বিষয় থাকে তাহলে তা হচ্ছে খোদাভীরুতা। কারণ, এর দ্বারা ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। খোদাভীরুতার কারণে আল্লাহ তায়ালা পারস্যের গোলাম সালমান ফারসীকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে ওঠিয়েছেন। আর তা না থাকার দরুণ আবু লাহাবের মতো সম্মানি ব্যক্তিকেও লাঞ্চিত করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিভিন্ন বংশে বিভক্ত করেছেন। এ বিভক্তির উদ্দেশ্য সম্মানের ক্ষেত্রে পার্থক্য বুঝানো নয়। কী উদ্দেশ্যে ভাগ করা হয়েছে তা আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

‘হে মানুষসকল! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে, তারপর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো; তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে বেশি মোত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন। (সূরা: হুজরাত, আয়াত: ১৩)।

উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা দুটি কথাই বলেছেন (ক) বংশীয় বিভক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে পরস্পর পরিচয় লাভ করা (খ) মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড বংশ, জাতি বা সাদা-কালো নয় বরং খোদাভীরুতারই হচ্ছে মর্যাদার মানদণ্ড। 

অহংকার সম্পর্কে আলোচনা করে ইবনে হাজাম (রাহ.) এর কিছু প্রকার উল্লেখ করেছেন। তারপর তিনি বলেন, ‘তুমি যদি বংশ নিয়ে গর্ব, অহংকার কর তাহলে এটা হচ্ছে অহংকারের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম প্রকার। কেননা, এর দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতে কোনো ফায়দা নেই। চিন্তা করে দেখো! তুমি যে বিষয় নিয়ে অহংকার করছো তা কী তোমার ক্ষুধা দূর করতে পারবে নাকি লজ্জাস্থান ঢাকতে পারবে? তারপর তিনি লেখেন, ‘ তোমরা যাদের নিয়ে অহংকার করছো হতে পারে তারা ছিলো অনেক খারাপ, নেশাখোর, সুদখোর, জালেম; যারা বহু জুলুমের রাস্তা খুলে গিয়েছে, যা চলতে থাকবে যুগের পর যুগ। এখন এমন মন্দ মানুষের প্রশংসা করা ভালো বিষয় নাকি খারাপ তা তুমি নিজেই ভাবো?... 

সকল মানুষ আদম (আ.) এর সন্তান, ফেরেস্তা দিয়ে আদম (আ.)-কে সেজদা করিয়েছেন, জান্নাতে থাকার ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু বাপের এই সম্মান সন্তানদের কী ফায়দা দিয়েছে?’ পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব করা আর প্রতিবেশিকে নিয়ে গর্ব করা একই বিষয়। কারণ, প্রতিবেশির মর্যাদা দ্বারা যেমন তার কোনো ফায়দা নেই তেমনি বাপ-দাদার মর্যাদা নিয়ে অহংকারের মধ্যেও কোনো ফায়দা নেই। কিন্তু আফসোস! আমরা আজ এই রোগেই বেশি আক্রন্ত। আল্লাহ তায়ালা হেফাজত করুন-আমীন।

ভাইবোনের প্রতি অবহেলা: 
একজন ব্যক্তির ওপর তার ভাইবোনের অনেক অধিকার আছে। আছে কর্তব্যও। এগুলো সুন্দরভাবে পালন করার দ্বারা ব্যক্তির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। অবহেলা করার দ্বারা ব্যক্তির কুৎসিত চেহারা সবার চোখে ধরা পড়ে। অধিকাংশ মানুষ এখন ভাই-বোনের হকের ব্যাপারে অবহেলা করে। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে কিছু আচরণ দ্বারা যেমন-

ভাইবোনের প্রতি কম খেয়াল করা 
মানুষ দিনদিন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশি তো দূরের কথা নিজের আপন ভাই-বোনের প্রতি অনেকে খেয়াল করে না। তাদের কোনো খোঁজ খবর নেয় না। চায় না ভাই-বোনদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হোক। কোনো বুদ্ধিমানের কাজ এটা হতে পারে না। ইবনে হিব্বান (রাহ.) বলেন, ‘ কারো অন্তরে অন্যের প্রতি মহব্বত- ভালোবাসা ঢেলে দেয়া হলে ওই ব্যক্তি যদি বুদ্ধিমান হয় তাহলে তার কর্তব্য হচ্ছে এই ভালোবাসাকে হেফাজত করা। আর হেফাজতের তরীকা হচ্ছে, সে কষ্ট দিলে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ওই ব্যক্তিকে মনের ভেতর জায়গা করে দেয়া। মুখ ফিরিয়ে নিলে, দূরে ঠেলে দিতে চাইলে কাছে যাওয়া। বিরত করলে তার জন্য ব্যয় করা।

বিপদের সময় মুখ ফিরিয়ে নেয়া: 
কারো কারো স্বভাব হচ্ছে সুখের দিনে সখ্যতা আর বিপদের দিনে বিমুখতা। এটা মানুষের ঘৃণ্যতম একটা মন্দ স্বভাব। স্বার্থপর মানুষ চেনার উপায় হচ্ছে এটা। আরবি ভাষার প্রসিদ্ধ প্রবাদ হচ্ছে, ‘মহব্বতের পরীক্ষা বিপদের সময় হয়, স্বচ্ছলতার সময় নয়।’

স্বচ্ছলতার সময় অতিত ভুলে যাওয়া: 
কারো বড় হওয়ার পেছনে অন্য কারো যদি অবদান থাকে তাহলে কর্তব্য হচ্ছে, তাকে সব সময় স্মরণে রাখা ও তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। কিন্তু মানুষ মন্দ স্বভাবের কারণে সুখের দিনে ওই ব্যক্তিটাকে ভুলে বসে। এ রকম অকৃতজ্ঞ বান্দাকে আল্লাহ তায়ালাও পছন্দ করেন না। রাসূল (সা.) বলেন, যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। তাই বড় হওয়ার পর আমার পেছনে যার অবদান তাকে সব সময় স্মরণে রাখা চাই।

ভ্রমণে সাথীদেরকে কষ্টে ফেলা:
কারো কারো স্বভাব হচ্ছে সাধারণ অবস্থায় তাদের আচার-ব্যবহার বুঝা যায় না। কিন্তু কোথাও ভ্রমণে বের হলে সমস্যা ধরা পড়ে। সাথীদেরকে কষ্ট দেয়। সকল বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করে। কিছু মানুষ থাকে তারা কথা বলে না, কোনো আবেদনও পেশ করে না। পরামর্শ চাইলে পরামর্শ দেয় না। সাথীরা সঠিকভাবে কাজ করতে পারলে চুপ করে থাকে আর কোনো সমস্যা হলে বিরুপ মন্তব্য করা শুরু করে। এ জন্য বলা হয়, ‘ভ্রমণ ব্যক্তির চরিত্রকে প্রকাশকারী।’

বৈঠকের আদবের প্রতি খেয়াল না করা: 
অনুমতি ছাড়া বৈঠকে আসা-যাওয়া করা। বৈঠকে প্রবেশের সময় সালাম না দেয়া। যোগ্য না হয়ে বৈঠকের সভাপতি হতে চাওয়া। গুরুত্বহীনভাবে বৈঠকে বসা। যেমন অন্যরা বসে আলোচনা করছেন আর একজন শুয়ে শুয়ে কথা বলছেন।
 
স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা: 
মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসা স্বাভাবিক। হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলছে, কারো সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণ করছে না। কিন্তু ঘরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা রুপ পাল্টে যায়। কথায় কথায় স্ত্রীকে তালাকের হুমকি দেয়। সাধারণ বিষয়ে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এগুলো মুসলমানের ঈমানের দুর্বলতার আলামত। কারণ, যে মহান সত্তা বাইরের সমস্ত কাজ দেখেন তিনি তো ঘরেরগুলোও নিশ্চয় দেখে থাকবেন। 

অনুবাদ : শহীদুল ইসলাম

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে