Alexa মানব জীবনের সুন্দর সমাধান কোরআন: নওমুসলিম আয়েশা 

ঢাকা, শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬,   ১৯ সফর ১৪৪১

Akash

বোরকার বিধানটি আমার কাছে খুবই ভালো লাগে: নওমুসলিম আয়েশা

নুসরাত জাহান: ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৬ ৯ অক্টোবর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সানা রেজবি: আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।

আয়েশা খান: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।

সানা রেজবি: আয়েশা বোন! প্রথমেই আপনার নাম এবং পরিচয় জানতে চাইবো। 

আয়েশা খান: হ্যাঁ বোন সানা, আমার বর্তমান নাম আয়েশা খান। আমার পুরনো নাম স্বপ্না যাদব। আমি যাদব ফ্যামিলির মেয়ে। আমাদের পরিবারে বাবা, মা, এক ভাই, ও ভাবি আছেন। বাবা চাকরি করেন। মা গৃহিনী। ভাইয়া এবং ভাবি এখনো পড়াশুনা করছেন। আমার বয়স মাত্র আঠারো। আমি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি।

সানা রেজবি: আপনাদের মূল নিবাস কোথায় জানতে পারি?

আয়েশা খান: অবশ্যই। আমি লক্ষণৌ, উত্তর প্রদেশের মানুষ। লক্ষণৌল থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে রায়বেরিলি জেলা। আমাদের পরিবার মূলত সেখানকার বাসিন্দা। দাদা-দাদি সেখানেই থাকতেন। আমাদের ছেলেবেলাও কেটেছে সেখানে। এখন সেখানে কেবল আমার দাদি থাকেন।

সানা রেজবি: আপনার পরিবারে আর কে কে আছেন?

আয়েশা খান: আমাদের পরিবার অনেক বড় নয়। মাত্র সাত সদস্যের ফ্যামিলি। মা-বাবা, ভাই, ভাবি, বড় চাচা এবং দাদি। পরিবারের অন্য আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে আমাদের খুব একটা সম্পর্ক নেই।

সানা রেজবি: কতোদিন হলো মুসলমান হয়েছেন?

আয়েশা খান: মাত্র একমাস হলো মুসলমান হয়েছি। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে যেন আমি আজন্ম মুসলমান। ইসলামের সবকিছুই আমার কাছে পুরনো পরিচিত মনে হয়। 

সানা রেজবি: পুরনো পরিচিত সেটা কীভাবে, একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন?

আয়েশা খান: দেখুন! ইসলাম একটি আশ্চর্য ধর্ম। এখানে সব ধরণের স্বাধীনতা সমুজ্জ্বল। যা কিছু কোরআনে আছে তার সবটাই মানুষের মৌলিক প্রয়োজন এবং মানুষের সর্বোত্তম পাথেয়। একজন মানুষের জীবনে সবচাইতে সুন্দর যে সমাধানটি তা এই কোরআনে লিখিত আছে। কোরআনের এই দিকটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে। আমি যখন কোরআন পড়ি, তখন আমার কাছে মনে হয়েছে এখানে যা কিছু আছে তার সবটাই মানুষের শুদ্ধ স্বভাব মোতাবেক। এখানে মানবজীবনের মৌলিক সকল প্রয়োজনের কথা আছে। তাছাড়া ইসলামের বোরকার বিধানটি আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। এই বিষয়টি আমাকে ইসলামের প্রতি বেশ আগ্রহী করে তুলে। আরেকটি বিষয় ইসলামের প্রতি আমাকে বেশ টেনেছে তাহলো উর্দু ভাষা। উর্দু ভাষা বরাবরই আমার ভালো লাগতো। এই ভাষার মাধুর্য ও কমনীয়তা, তা বলবার স্টাইল, শব্দ ও বাক্যের গঠন আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে। বলেছি না আমি লক্ষণৌর মেয়ে। লক্ষণৌ পুরনো কাল থেকেই নবাবদের শহর। এ শহরের ভাষা উর্দু। ফলে এখানকার ভাষা আমাকে খুব নাড়া দেয়। এই শহরের প্রতিটি গলিতে আমার কাছে মনে হয় যেন সর্বদা তাহজিব তমদ্দুন সুবাস ছড়াতে থাকে। চারদিকে যখন আজান হতে থাকে তখন মনে হয় যেন কর্ণকুহরে কে মধু ঢেলে দিচ্ছে। তাছাড়া যে কারো সঙ্গে কথা বলবার সময় ‘জী জনাব’ সম্বোধনটি বেশ নাড়া দেয়। এর বাইরে আরো অনেক কারণ আছে ওইসব কারণ আমাকে বরাবর ইসলামের দিকে টানে এবং এভাবেই ধীরে ধীরে আমি ইসলামের একেবারে কাছে চলে আসি।

সানা রেজবি: মুসলমান হওয়ার পর আপনার জীবনে কী কী পরিবর্তন এসেছে এবং আপনার অনুভূতি কী?

আয়েশা খান: দেখুন মুসলমান হওয়ার আগে আমার জীবন ছিল একেবারে অন্যরকম। যখন শিশু ছিলাম তখন থেকেই আমাদেরকে বরাবর শেখানো হতো, জীবনের সকল যুদ্ধে আমাকে সবার আগে থাকতে হবে। খুব পড়াশোনা করো এবং খুব পয়সা কামাও। যতোটা পারো পৃথিবীব্যাপী নিজের নামের আলো ছড়িয়ে দাও। মুসলমান হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এটাই বিশ্বাস করতাম পয়সা উপার্জন জীবনের একমাত্র সফলতা। মুসলমান হওয়ার পর ইসলাম আমার জীবনের মুখ সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে। ইসলাম আমাকে জীবনের মূল মর্ম শিখিয়েছে। ইসলাম আমাকে শিখিয়েছে দুনিয়া এবং পরকালের সফলতাই হলো জীবনের মৌলিক সফলতা। ইসলাম আমার জীবনের লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছে। বলতে পারি মুসলমান হওয়ার আগে আমার জীবনে কোনো টার্গেট ছিল না। ইসলাম কবুল করার পর আমার জীবনের নকশা সম্পূর্ণ বদলে যায়। অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অবশ্য আল্লাহ তায়ালার সাহায্য বরাবর সঙ্গে ছিল। ফলে কোনো প্রতিকূলতাই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আল্লাহ তায়ালাই সকল প্রতিকূলতা বরফের দেয়ালের মতো গলিয়ে পানি করে দিয়েছেন। বলতে গেলে সেইসব প্রতিকূলতার কাহিনী অনেক দীর্ঘ। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করবো দয়া করে আল্লাহ তায়ালা যথাসময়ে সাহস দিয়েছিলেন, সামান্য ধৈর্য্যও। সেইসঙ্গে সাক্ষাৎ দান করেছিলেন কিছু অসামান্য ভালো মানুষের। তারা আমাকে আপন করে নিয়েছেন। আমি যখন আমার জননী মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি তখনো তারা আমাকে মায়ের শূন্যতা অনুভব করতে দেননি। আমি  একজন পিতা পেয়েছি যিনি আমাকে নিজের কন্যা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমি একটি ফ্যামিলি পেয়েছি যা আমাকে আমার ফেলে আসা ফ্যামিলির কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমার এই নতুন ফ্যামিলির সকলকে ভালো রাখুন। সকলকে সকল কল্যাণে ভূষিত করুন।

আমার জীবন এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। আমি প্রতিদিন প্রাণখুলে আল্লাহকে সেজদা করি। সেজদায় পড়ে কাঁদি। আমার নতুন মা আমাকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু শেখান। ইসলাম সম্পর্কে তার কাছে আমি প্রতিদিনই নতুন নতুন পাঠ গ্রহণ করি। তিনি আমাকে নবীগণের কথা বলেন। ইসলাম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নানা কথা বলেন। তিনি আমাকে আপন কন্যার মতো জীবনের ভালো মন্দ সবকিছু বলেন। এই পৃথিবীতে আমাকে কীভাবে জীবন যাপন করতে হবে, একজন মুসলিম নারী কীভাবে জীবন কাটাবে মা আপন কন্যার মতো সবকিছু খুলে খুলে বলেন। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সব সন্তানকে এমন পুন্যহৃদয় মা নসিব করুন। আর আমার মতো যারা তাদেরকে নসিব করুন ঈমান ও ইসলামের ধন।

সানা রেজবি: আচ্ছা! দাওয়াত সম্পর্কে আপনার চিন্তা ভাবনা কী, বলবেন?

আয়েশা খান: দাওয়াত একটি অসামান্য সৎকর্ম। প্রতিটি মানুষকেই যথাসম্ভব এই কাজে অংশ গ্রহণ করা উচিত। অবশ্য আমরা লক্ষ করি, অনেকেই সেটা করে উঠতে পারেন না। আমি মনে করি, প্রতিটি মুসলমানের জীবনে প্রধান লক্ষ্য হবে দাওয়াত। আমি খুব স্পষ্ট ভাষায় দাবি করবো ইসলাম ধর্ম হচ্ছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এই পৃথিবীর অনেকেই এই সম্পদ থেকে বঞ্চিত। তাই আল্লাহ তায়ালা দয়া করে যাদেরকে ইসলামে ঠাঁই দিয়েছেন তাদের কর্তব্য হবে ইসলামের মূল্য অনুধাবন করা। আমরা যদি পরিপূর্ণ রূপে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি তাহলেই কেবল আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা হতে পারবো। আর যাদের কাছে এখনো ইসলামের বাণী পৌঁছায়নি তাদের কাছে ইসলামের এ আমানত পৌঁছে দিতে পারবো।

অনেকেই দাওয়াত দিতে ভয় পান। আমি বলবো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের সকলেরই বড় কর্তব্য হলো ইসলামকে যথাযথভাবে জানা। এই জন্যে আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা সাহায্য চাইবো। তাকে যথাযথভাবে ভয় করবো। দুনিয়া ও আখেরাতের পূর্ণ সফলতা এখানেই। আমরা যদি সকলে দাওয়াতের ভার কাঁধে তুলে নিই তাহলে এই পৃথিবীর অনেক মানুষ জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারবে। আর আমরা হতে পারবো অসামান্য কল্যাণের অধিকারী। আমি মনে করি, যদি আমাদের মতো মেয়েরাও এই দাওয়াতের কাজে অংশগ্রহণ করে তাহলে চারদিকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঈমান ও ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়বে।

সানা রেজবি: আপনি পুরো উম্মতকে কি কোনো মেসেজ দিতে চান?

আয়েশা খান: আমি অবশ্যই পুরো মুসলিম উম্মাহকে এই বাণী পৌঁছে দিতে চাই মুসলিম উম্মাহর এখন অনিবার্য কর্তব্য হলো, চারদিকে ইসলামের বাণীকে ছড়িয়ে দেয়া। ইসলামের বাণী শুনে যারা এগিয়ে আসছে, ইসলাম কবুল করছে কিংবা ইসলাম কবুল করতে ভয় পাচ্ছে তাদের পাশে দাঁড়ানো সকলের কর্তব্য। দেখুন আমার মতো এমন অনেক মেয়ে আছে যারা ইসলাম কবুল করতে চায়। কিন্তু তাদের সামনে কোনো আশ্রয় নেই। যদি আমাদের মুসলিম সমাজ তাদের পাশে দাঁড়াবার জন্যে সাহস করেন তাহলে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ ইসলামের দিকে ছুটে আসবে। আমি দোয়া করবো এখনো যারা ইসলামে দীক্ষিত আমার মতো অসহায়দের পাশে দাঁড়াচ্ছেন আল্লাহ তাদেরকে সব দিক থেকে ভালো রাখুন। তাদেরকে সকল কল্যাণে ভূষিত করুন।

সানা রেজবি: বোন আয়েশা। জাযাকাল্লাহ! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লেগেছে। আল্লাহ তায়ালা আপনাকেও দাওয়াতের কাজে অংশ গ্রহণের তাওফিক দিন। সাহায্য করুন। 

আয়েশা খান: সানা বোন! আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে কথা বলে আমারও খুব ভালো লেগেছে। আমরা সকলে মিলে আল্লাহ তায়ালার কাছে মোনাজাত করবো যারা দাওয়াতের ময়দানে কাজ করছেন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালো রাখুন। সাহায্য করুন। আর যারা ইসলামে প্রবেশ করতে চায় তাদেরকে দান করুন অসীম সাহস। 

সূত্র: আরমোগান, সেপ্টেম্বর ২০১৯
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সানা রেজবি
ভাষান্তর: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে