Alexa মাদকের জমজমাট হাট বিমানবন্দর রেলস্টেশন

ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

মাদকের জমজমাট হাট বিমানবন্দর রেলস্টেশন

 প্রকাশিত: ১৩:০৭ ২৩ মার্চ ২০১৮   আপডেট: ১৯:২৮ ২৩ মার্চ ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দেশে বেড়েছে মাদকের অবৈধ বাণিজ্য। ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে শহর কিংবা গ্রামের আনাচে-কানাচে। গণমাধ্যমে এমন সংবাদও এসেছে-যে এলাকায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পাওয়া যায় না, সেখানেও পাওয়া যায় নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

গেলো বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) টেকনাফে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড মাত্র তিন ঘণ্টার যৌথ অভিযানে ২১ লাখ ২ হাজার ৮৯৭ ইয়াবা উদ্ধার করে।

দায়িত্ব নেয়ার দিন থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। এর আগের আইজিপি ও আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত বাহিনীর প্রধানরাও বিভিন্ন সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জনসাধারণও আশায় বুক বাধেন বার বার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি অতীতে।

বিশেষজ্ঞদের মত, সর্ষের ভেতর ভুত থাকায় অনেক চেষ্টার পরও মরন নেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না সমাজ।

রাজধানীর অন্যতম প্রবেশ পথ বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন। এখানেই চলছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের রমরমা ব্যবসা। দিনের বেলায় যেমন তেমন, সন্ধ্যার পর থেকেই স্টেশনের আঙ্গিনায় দেদারছে বিক্রি হয় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও মদ। নগরীর মাদক বেচাকেনার অন্যতম এই স্পটে অভিযোগের তীর বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সিআই মজিবুর রহমানের দিকে। তার প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় এখানে চলছে মাদকের উন্মুক্ত ব্যবসা।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিআই মজিবুর রহমান।

সম্প্রতি ১০ কেজি গাঁজা ও বেশ কিছু ফেনসিডিলের মামলায় প্রকৃত অপরাধীকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়ে অপর এক অসহায় যুবককে ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে সিআই মজিবুরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে।

মাদক ব্যবসায় ছাড়াও চোরাকারবারী, পকেটমার ও ফুটপাতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি ‘ক্যাশিয়ার’ কনস্টেবল মোস্তফার মাধ্যমে এ কাজ করান। তার দাবিকৃত চাঁদা দেয়া না হলে হকারদের উপর হামলা ও দোকান ভাঙচুরও চলে কখনও কখনও।

গেলো বছরের ২০ ডিসেম্বর রাতে আন্তঃনগর পারাবত ট্রেনে বিমানবন্দর স্টেশনের ২ নম্বর প্লাটফর্মে নামেন মাদক ব্যবসায়ী নুরল হক। মুহূর্তেই কুখ্যাত এ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে আরএনবির চার সদস্য। এরা হলেন কনস্টেবল রফিকুল, রুহুল আমিন, জিয়াউর রহমান ও মারুফ হোসেন। এ সময় তার কাছ থেকে ১০ কেজি গাঁজা ও কয়েক বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারের পর আইনগত ব্যবস্থা নিতে নুরলকে আরএনবি কর্মকর্তা সিআই মজিবুর রহমানের জিম্মায় সোপর্দ করা হয়। রাত গভীরে রফা-দফার মাধ্যমে ৫ লাখ টাকায় নুরুলকে ছাড়ার অপচেষ্টার অভিযোগ উঠে সিআই মজিবুরের বিরুদ্ধে। এতে বাধা দেন হাবিলদার আশরাফ ও রতন হোসেন। সেদিনই রাত ১টার দিকে সিএনজি অটোরিকশায় গ্রেফতার মাদক ব্যবসায়ী নুরুলকে ঢাকা রেলওয়ে থানা (জিআরপি) কমলাপুরে নেয়া হয়। কিন্তু রাতের বেলায় আসামি গ্রহণে নারাজ রেলওয়ে থানা পুলিশ। পরদিন সকালে এজাহার সংশোধনের অজুহাতে নুরুলকে হাজত থেকে বের করেন সিআই মজিবুর রহমান। এরপরই হাওয়া হয়ে যায় কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী নুরুল হক।

অপরদিকে, পরদিন ২১ ডিসেম্বর কমলাপুর রেল স্টেশনের ৮ নম্বর প্লাটফরম থেকে মকবুল নামে এক যুবককে ধরে এনে ওই মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে নুরুলকে ছেড়ে দেন সিআই মজিবুর রহমান। এছাড়া মামলার সাক্ষী মারুফ হোসেন ও রফিকুল বলছেন মকবুলের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। সিআই মজিবুর রহমানের কেস ডায়রিতেও ওই মামলার বিষয়ে কোন তথ্য নেই। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে, কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার কথা থাকলেও, তিন মাসে আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত প্রতিবেদন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তরক্ষীদের চোখ এড়িয়ে নানা কৌশলে প্রতিবেশী দেশ থেকে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে আনা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে আন্তঃনগর ট্রেনগুলেই বেছে নিচ্ছে মাদক ও চোরাকারবারীরা। মাঝে মধ্যে লোকাল ট্রেনও ব্যবহার করছে তারা। পিলে চমকে ওঠার মতো, এসব মাদক ব্যবসায়ীরা আন্তঃনগর জয়ন্তিকা, উপবন, পারাবতসহ কয়েকটি ট্রেনের নাম দিয়েছে ইয়াবা বা ফেনসিডিল ট্রেন।

ঢাকা-চট্টগ্রামে চলাচলকারী আন্তঃনগর তুর্ণা নিশিথা, সুবর্ন এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম মেইল, ঢাকা-সিলেটের উপবন, জয়ন্তিকা, সিলেট মেইল, নোয়াখালী-ঢাকায় উপকুল এক্সপ্রেস, নোয়াখালী এক্সপ্রেস নামের ট্রেনগুলো মাদক আনা নেয়ার অন্যতম বাহন। মূলত মাদক আসে আখাউড়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম থেকে।

বিমানবন্দর রেল স্টেশনকে রাজধানীসহ অন্যান্য এলাকায় মাদক পাচারের অন্যতম ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে এসব মাদক ব্যবসায়ী।

সোমবার সন্ধ্যায় ডেইলি বাংলাদেশ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিআই মজিবুর রহমান প্রথম রেগে যান। তিনি বলেন, আপনাদেরকে এসব বিভ্রান্তমূলক তথ্য নিশ্চয়ই আমার আগের সিআই দিয়েছে। এরপর মজিবুর অভিযোগ অস্বীকার করেন। তদন্ত কমিটির কথা উল্লেখ করলে এই সিআই বলেন, ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। কেউ একজন মিথ্যা অভিযোগ করেছে বলেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে দাবি তার।

সত্যি কি জানতে চাইলে রেলওয়ের এই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, সেদিন রাতেই (২০ ডিসেম্বর’২০১৭) তিনি কমলাপুর জিআরপি থানায় আসামি হস্তান্তর করেন। আসামি ও উদ্ধার করা মাদকসহ এজাহার লিখে হাবিলদার রতনকে বাদি করে জিআরপি থানায় মামলা করা হয়। আসামি মাদক ব্যবসায়ী নুরুল তারপর থেকে সারারাত জিআরপি থানা হাজতে ছিল। পর দিন ২১ ডিসেম্বর’ ২০১৭ তারিখ জিআরপি থানার ওসি ইয়াসিন ফারুখ আমার এজাহার বাদ দিয়ে এসআই আলী আকবরকে বাদি করে মামলা করেন। কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী নুরুলকে ওসি ইয়াসিন ফারুখ’ই ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ সিআই মুজিবুরের।

তিনি জানান, মামলায় আসামি করা হয় মকবুলকে। সিআই মুজিবর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, আমি প্রমান করতে পারব আমি নির্দোষ, আমার কাছে কাগজপত্র আছে।

জিআরপি থানার ওসি ইয়াসিন ফারুখকে সিআই মজিবুর রহমানের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে এ বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিআই মজিবুর ওই রকম বলতে পারেন, তবে এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসবি/এলকে