Alexa মাটির নিচে গায়েবি মসজিদ

ঢাকা, বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯,   কার্তিক ২৯ ১৪২৬,   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

মাটির নিচে গায়েবি মসজিদ

রাজু আহমেদ, ঝিনাইদহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৫ ২৫ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারে তিন বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত প্রাচীন শহর মোহম্মদাবাদ৷ এখানে রয়েছে সুলতানি আমলের ১৯টি মসজিদ। যা মাটির নিচে ছিল। এখনো মাটির নিচে রয়েছে সাতটি মসজিদ। যা সাতশ বছরেরও বেশি পুরনো।

পঞ্চদশ শতাব্দীর রাজধানী খ্যাত শাহ মোহাম্মদাবাদের বর্তমান নাম বারোবাজার। কালীগঞ্জ শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণে আর যশোর জেলা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার উত্তরে।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দুই ধারে শত পুকুর ও বুড়ি ভৈরব নদীর তীরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা এ বারোবাজার। বারো আউলিয়ার নামানুসারে এর নামকরণ হয়।

আউলিয়ারা হলেন- এনায়েত খাঁ, আবদাল খাঁ, দৌলত খাঁ, রহমত খাঁ, শমসের খাঁ, মুরাদ খাঁ, হৈবত খাঁ, নিয়ামত খাঁ, সৈয়দ খাঁ, বেলায়েত খাঁ ও শাহাদত খাঁ।

মসজিদগুলো দেখতে বারোবাজারে প্রতিদিন আসেন হাজারো পর্যটক। বিশেষ করে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম আর্কিটেকচার শিক্ষার্থীরা এখানে রিসার্চ করতে আসেন।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নদীয়া দখলের পর এর দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দিকে মনোযোগী না হয়ে উত্তর দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ফলে তার রাজ্য উত্তর দিকে প্রশান্ত হতে থাকে।

পরে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের ছেলে নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে যশোর ও খুলনার কিছু অংশ তার অধীনে আনেন। ওই অঞ্চলে বিজয়ের গৌরব অর্জন করেন খান জাহান আলী।

খান জাহান আলী এক সময় নিজের আত্মরক্ষার্থে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতগঞ্জে ঢুকেন। সেখান থেকে কোটচাঁদপুর উপজেলার হাকিমপুর হয়ে বারবাজারে রওনা দেন। পথে মানুষের পানীয় জলের কষ্ট দেখে এ অঞ্চলে অনেকগুলো দিঘি আর পুকুর খনন করেন তিনি। কথিত রয়েছে একই রাতে এসব জলাশয় খনন করা হয়েছিল। ফলে বারোবাজার অঞ্চলে ৮৪ একর পুকুর ও দিঘি এখনো রয়েছে।

বারোবাজারে যেসব মসজিদ রয়েছে:

সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ: বড় একটি পুকুরের দক্ষিণ পাশে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ৷ এটির শুধু দেয়াল আর নিচের অংশই রয়েছে। সর্বপ্রথম গ্রামের লোকজনই মাটিচাপা থাকা মসজিদটি উদ্ধার করেন৷ আকারে এ এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি৷ প্রায় ৭৭ ফুট লম্বা ও ৫৫ ফুট চওড়া। এর ভেতরে রয়েছে ৪৮টি পিলার ও ৩৫টি গম্বুজ। পশ্চিম দেয়ালে লতা-পাতার নকশা সমৃদ্ধ তিনটি মিহরাব রয়েছে৷ এটি ১৯৯২ সালের দিনে আংশিক সংস্কার করা হয়।

গলাকাটা মসজিদ: বারোবাজার মৌজায় ছয় গম্বুজের গলাকাটা মসজিদ। ২১ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট চওড়া মসজিদটি খনন করা হয় ১৯৯৪ সালে৷ এর পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে৷ দেয়ালগুলো প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া৷ মাঝখানে রয়েছে লম্বা দুটি কালো পাথর৷ জনশ্রুতি রয়েছে, বারোবাজারে এক অত্যাচারী রাজা ছিলেন৷ যিনি প্রজাদের গলা কেটে মসজিদের সামনের দিঘিতে ফেলে দিতেন৷ এ কারণেই এর নাম হয় গলাকাটা।

হাসিলবাগ মসজিদ: এ মসজিদের আরেক নাম শুকুর মল্লিক মসজিদ৷ পোড়া মাটির তৈরি মসজিদটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট। মাত্র একটি গম্বুজ। হাসিলবাগ এলাকায় দমদম জাহাজঘাটা ও সেনানিবাস ও নদী বন্দর ছিল। হাসিলবাগ এলাকায় শুকুর আলী মসজিদ আবিষ্কৃত হয়।

নুনগোলা মসজিদ: নুনগোলা মসজিদেও রয়েছে একটি গম্বুজ৷ এক গম্বুজের হলেও এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি৷ এর ভেতরে তিনটি অর্ধ বৃত্তাকার মিহরাব রয়েছে৷ স্থানীয়রা এটি লবণগোলা মসজিদও বলে থাকেন৷ তবে এ নামকরণের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। মিঠাপুকুর এলাকায় নুনগোলা মসজিদ আবিষ্কৃত হয়। হাসিলবাগ মসজিদ আর এটি পাশাপাশি।

নুনগোলা মসজিদ

পাঠাগার মসজিদ: ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে এক গম্বুজ বিশিষ্ট পাঠাগার মসজিদ৷ লাল ইটের তৈরি এ মসজিদ আকারে ছোট৷ দীর্ঘদিন মাটিচাপা থাকার পর ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটি সংস্কার করে৷ জনশ্রুতি রয়েছে, সুলতানি আমলে নির্মিত মসজিদ কেন্দ্রিক একটি পাঠাগার ছিল৷ মসজিদের পাশেই বড় আকারের একটি দিঘি রয়েছে। যার নাম পিঠেগড়া পুকুর৷ বেলাট দৌলতপুর এলাকায় পাঠাগার মসজিদ আবিষ্কৃত হয়।

পীর পুকুর মসজিদ: পাঠাগার মসজিদের পশ্চিমে পীর পুকুর৷ এ পুকুরের পশ্চিম পাশে রয়েছে বড় একটি মসজিদ৷ ১৯৯৪ সালে খনন করে মাটির নিচ থেকে বের করা হয়েছে স্থাপনাটি৷ এ মসজিদে ছাদ নেই শুধু দেয়াল রয়েছে৷ মসজিদটি লাল ইটের তৈরি৷ বেলাট দৌলতপুর এলাকায় ১৬ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি অবস্থিত।

গোড়ার মসজিদ: চার গম্বুজ বিশিষ্ট গোড়ার মসজিদ৷ মসজিদটি মিহরাব, দেয়ালে পোড়ামাটির ফুল, লতাপাতা ফলের নকশাসহ নানান কারুকার্য রয়েছে৷ বাইরের দেয়ালও লাল ইটে মোড়ানো। বেলাট দৌলথপুর এলাকায় মসজিদটি অবস্থিত। এখানে মানুষ নামাজ পড়েন।

গোড়ার মসজিদ

জোড় বাংলা মসজিদ: বারোবাজার এলাকায় জোড় বাংলা মসিজদ অবস্থিত। মসজিদটি পুনঃসংস্কার করা হয় ১৯৯৩ সালে৷ খননের সময় এখানে একটি ইট পাওয়া যায়। তাতে আরবি অক্ষরে লেখা ছিল, ‘শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইন, আটশ হিজরি’৷ জনশ্রুতি রয়েছে, মসজিদের পাশে জোড়া কুড়ে ঘর ছিল বলেই এর নাম জোড় বাংলা মসজিদ৷ এখানেও লোকজন নামাজ পড়েন।

শহর মোহাম্মদাবাদ: বারোবাজারের নাম ছিল ছাপাইনগর৷ বারোজন সহচর নিয়ে খানজাহান আলী সেখানে যান৷ সেখান থেকেই এর নাম বারোবাজার৷ সেখানে খানজাহান আলী বেশ কিছু মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন৷ যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে এক সময় ধ্বংস হয়ে যায় বারোবাজার৷ থেকে যায় প্রাচীন ইতিহাস ও মসজিদ৷

এছাড়া ঘোপপাড়া এলাকায় ঘোপ ও আড়পাড়া ঢিবি অবস্থিত। এটি রওজা শরিফ। সাদিকপুর এলাকায় রয়েছে চোরাগদানি মসজিদ। সাদিকপুর এলাকায় মনোহর ১৬ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। বেলাট দৌলতপুর এলাকায় নামাজগাজ রওজা শরিফ অবস্থিত। বেলাট দৌলতপুর এলাকায় সওদাগর মসজিদ আবিষ্কৃত। একই এলাকায় রয়েছে শাহী মহল। যা সেকেন্দার বাদশার বসতবাড়ি ছিল।

বিলুপ্তি নগরী বারোবাজার বইয়ের লেখক ও গবেষক রবিউলি ইসলাম জানান, পঞ্চদশ শতাব্দীর অনেক মসজিদ রয়েছে। বারোবাজারে আবিষ্কৃত হওয়া সুলতানি শাসনামলের নদী বন্দর কেন্দ্রীক শহর মোহাম্মদবাদের সাবেক রূপ বাস্তবায়ন এবং এর সঠিক ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মকে জানাতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর