মাটির ছাওয়াল ।।  জ্যোৎস্নালিপি

ঢাকা, শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১১ ১৪২৭,   ০৮ সফর ১৪৪২

মাটির ছাওয়াল ।।  জ্যোৎস্নালিপি

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৮ ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯  

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

তুহার মেয়েকে আর কুথায় বিহা দিবি। হামি আছি হামাকই দিয়া দে- সরদার মেয়েকে বলে ওঠে। রাশমণির মনে কোনো ভাবান্তর হয় না। সে মনে করে, হয়তো এটা দাদুর রসিকতা নাতনির সঙ্গে। তালুকদার বাড়ির পুকুর থেকে তেরো বছরের ফুলমণি স্নান সেরে আসে। ছেঁড়া সালোয়ার-কামিজে বেড়িয়ে আছে পিঠের কিছুটা অংশ।

যে গামছা দিয়ে ভেজা শরীর ঢাকার চেষ্টা করেছে, সেটাও ছেঁড়া। তাকিয়ে রাশমণির কষ্ট হয়। কিন্তু কী করার আছে তার! দুইটা মেয়ে সমেত স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়েছে। নতুন মাগি নিয়ে সংসার পেতেছে। সেই থেকে বাবার ঘাড়ে বসে খাচ্ছে। সে জানে বুনোপাড়ার বেশির ভাগ মেয়েরই বিয়ে এগারো-বারো বছরের মধ্যেই হয়ে যায়। ওদের এই নিয়ম! বেশি বয়স হলে আর কেউ বিহা করতে চায় না। ওরও বিহা হয়েছিল ১১ বছরে প্রথম যখন শরীর খারাপ হলো, সে বছরেই ফুলমণি পেটে। তারপর পর পর দুইটা সল হওয়ার সময় মরে যাওয়ার পর আরেক মিয়া। তাইতো তার মরদ তাকে ছেড়ে দিলো। কী করার ছিল সল মরে যাওয়ায়। বাপে কতোবার কহেছে, ফুলমণির বাপ ওরে মাতৃসদনে নিয়ে যাও; কিন্তু সে তো শোনে নাই। বলে, টাকা খরচ করতে পাবো লয়, তুমার থাকলে তুমি করো। দু-দুবারই তাই ঘটলো। সে তো বাপকে বলেছিল বাপের তোর তো কুনো দুষ লাই রে। আমার মরদেরই সব দুষ। কানতে কানতে বাবার গলা জড়িয়ে ফিরেছিল বাপের বাড়ি। মরদের বাড়িও যে খুব দূরে ছিল তা নয়,  একই ইউনিয়নের এপাড়া-ওপাড়া। এ অঞ্চলে তারা; যারা আদিবাসী বুনো সম্প্রদায় আছে তাদের বেশির ভাগেরই জমি রেললাইনের ধার আর বাজারের আসেপাশে। এখন তার বেশির ভাগই দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। কখনো দুকেজি চাল বা আটা কখনো অসুখ হলে কিছু ফল- এই করে টিপসই দিয়ে তাদের প্রায় সবকিছুই জোতদার তালুকদারদের দখলে। ওদের মতোই একজনের ধানের চাতালে কাজ করে রাশমণি। সারাদিন কাজ করে দুকেজি চাল পায়। তার এক কেজি বিক্রি করে কোনোমতে বাজারসদাই হয় ওদের। ওদের মা-বেটির আধপেটা কখনো ভরপেটা খেয়ে দিন চলে যায়  কোনো রকমে। বুনো সম্প্রদায়ের আদি পেশা ছিল বনেবাদারে পশু আর কচ্ছপ শিকার করে জীবন অতিবাহিত করা। কিন্তু বনজঙ্গল কমে যাওয়ায় এবং সরকার বন্যপ্রাণী মারা নিষিদ্ধ করায় পুরোনো পেশায় আর তারা এখন নেই। এখন অল্প অল্প করে ওদের শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে। ওদের মধ্যে একটা ছেলে বেশ মেধাবী। ওর নাম বিচিন্ত। ওদের পদবি সরকার, কেউ কেউ সরদারও বলে। বিচিন্ত এখন দশম শ্রেণির ছাত্র। সে একটা সংগঠনও দাঁড় করিয়েছে। বুনো রক্ষা কমিটি। এলাকার অনেকেই হাসাহাসি করছে তার এ কাজ দেখে। অনেকে তো টিটকারি মেরে বলে, ‘প্যাটে নাই ভাত, চা খায়ে থাক।’ ওরা ওসব গায়ে মাখলে চলে না । 

শোমসপুর বাজারের বুকের ওপর দিয়ে যে রেললাইন চলে গেছে, সেই রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় রাশমণি। কী করবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। 

ছফিটের মতো লম্বা পেটা শরীর মোহনলাল সরদারের। খোকসায় মাঘ মাসে যে বিখ্যাত কালীপুজো হয়, সেখানে প্রতিবছর মহিষ আর শয়ে শয়ে পাঠাবলি হয়। প্রতিবারের পুজোতেই ডাক পড়ে তার। কদর বেড়ে যায়। এমনিতে তাদের বুনো সম্প্রদায়ের লোকদের তেমন কেউ দাম দেয় না। মানুষ বলেই গণ্য করে না! দূর দূর ছাই ছাই করে।  এ তল্লাটে মোহনলালের মতো গায়ের জোর কারো নেই। পুজোর বলির সময় এককোপে একটা তাগড়া মহিষের ধর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে সে। কোনোদিন এর ব্যত্যয় হয়নি। আজ কেন জানি হাত কাঁপে! বুকের মধ্যে একটা শঙ্কা এসে জাপটে ধরে। সে পারবে তো? এতো দিনের সুনাম। সেটা থাকবে তো। সেকি বয়সের ভার আর নিতে পারছে না! এটা মোহনলাল কিছুতেই মানতে পারে না। বিশ্বাস বাড়ির স্ত‚পীকৃত গাছের গুঁড়িকে সে কুড়াল দিয়ে ফেড়ে মণ কে মণ খড়ি বানিয়ে ফেলতে পারে। এখন কি পারে? বিশ্বাসবাড়ির বড় গিন্নি যে কথা সেদিন বুলছিল তাকে, সে তা গায়ে মাখে নাই। ‘কি কাকা আগের মতো আর গায় বল পান না? আগে তো কয়েক মণ খড়ি ফাড়তে পারতেন।’ সে জবার দেওয়ার সময় কেমন যেন মাথার মধ্যে করে উঠেছিলÑ তা না বড় গিন্নিমা, আজ শরীরটা একটু কাহিল, জ্বর জ্বর মনে হয়। তাই বোধহয়- ধরা দেয় না  মোহনলাল।  

সকাল থেকেই মোহনলালের বাড়িতে ভিড়। কয়েকজন লোকের হাতে জমির দলিল। তারা বলছে, ভিটে আর মোহনলালের নেই অনেক আগেই তা বিক্রি করে দিয়েছে। কাগজেও তাই বলে, টিপসই আছে তাতে। কিন্তু মোহনলাল তা শুনতে রাজি নয়। বলে, না আমার ভিটে আমি দিব না। এ জমি হামার আমি উহাকে কিছুতেই দিবো না। কিছুতেই না।’ মাটি অঁকাড়ে পড়ে থাকে সে। সকলেই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলে, তুমি টিপসই দিয়া জমি বিক্রি করেছো। দলিল দেখো। সে কিছুই বুঝতে চায় না। ছোট্ট উঠানোর ওপর শুয়ে মাটি আঁকড়ে কেঁদে ওঠে মোহনলালÑ তুই আমার মা, আমি তোর সুন্তান। এতোদিন পর কেন তুই এমন করলি! আমি কি বছর অন্তর তোরে বাস্তুপূজা করি নাই! তয় কেন মা তুই তোর সুন্তানকে ধোঁকা দিলি। আর তোর ভিটায় আমি পূজা করবো না মা। মেয়ে রাশমণি বোঝানোর চেষ্টা করে বলে- বাপ চল আমরা ইস্টিশনে থাকপো। এ জমি তোর লয় রে বাপ। বুক চাপড়ে মোহনলাল বলে, না এ মাটি আমার, আমি এই মাটির ছাওয়াল। এই মাটি আমার চৌদ্দপুশ্যের। আমি দিবো না, কিছুতেই দিবো না। নাতনি ফুলমণি এখন তার স্ত্রী হলেও দাদু বলেই ডাকে।

বলে- চল দাদু আমরা যাই। আমাদের লয় রে কিছু। দেকছিস না, ওই বড় বড় মানষিগুলোন বুলছে ওদের সব। ওরা যখন বুলছে, তয় জমি ওদেরই হবে বটে। আমাদের মতো ছোটো মানুষের কথায় কি কোনো দাম আছে রে। কেহ কি আমাদের কথা বিশ্বাস করবে। মোহনলাল বলে, করবে করবে বিচিন্ত করবে। সে তো কয়েক ক্লাস পাস দিয়ে ঢাকা শহরে থাকে। ওই ওকে একটা মোবাইল করে দেখ। ও আসলে ও আমার কথায় বিশ্বাস যাবে। ফুলমণি তাকে আশ্বাস দেয় ফোন করার। 

উঠান থেকে কোনোভাবেই উঠানো যায় না তাকে। অন্ধকার নামে বুনোপাড়ায়। অন্ধকার নামে মোহনলালদের জীবনে। ভোরের আলো বুনোপাড়ায় কোনো শুভবার্তা বয়ে আনে না। মাটি আঁকড়ে এখন যে পড়ে আছে সে এখন কোনো মানুষ নয়। এখন তার কোনো নাম নেই। সে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শরীর একটা। কান্নার রোলে বুনোপাড়ায় লোকেরা জড়ো হয়। একে একে বাড়িভর্তি লোক। তাদের চোখে-মুখে মোহনলালের জন্য করুণা। অথচ মোহনলাল কী নির্বিকার। তার দুহাত মাটি আকড়ে ধরেছে পরম মমতায়। জননী তাকে ত্যাগ করলেও সন্তান তাকে ছেড়ে যায়নি!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর