Alexa মাকড়সার জাল রহস্য!

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

মাকড়সার জাল রহস্য!

সালমান আহসান নাঈম

 প্রকাশিত: ১৪:০৪ ২০ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৪:০৪ ২০ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

হযরত মুহাম্মদ (সা.) একবার মক্কা থেকে মদিনা যাচ্ছিলেন।তখন আততায়ীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পাহাড়ের এক গুহার মধ্যে আশ্রয় নেন। কিছুক্সণের মধ্যেই গুহার মুখে মাকড়সার জাল বুনে সে গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। আততায়ীরা যখন সেখানে উপস্থিত হয় তখন তারা দেখতে পায় গুহার প্রবেশপথে মাকড়সার জাল বিস্তৃত হয়ে আছে। তারা এ দেখে নিশ্চিত হয় যে, দু'একদিনের মধ্যে হয়তো এ গুহার মধ্যে কেউ প্রবেশ করেনি। এই ভেবে তারা চলে যায় এবং তিনিও প্রাণে বেঁচে যান। সাধারণ একটা মাকড়সার জাল-ই কিন্তু সেদিন এক মহামানবের প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। এ জালের যে অন্য রকম এক মহাশক্তি আছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্কটল্যান্ডের অধিপতি রবাট ব্রুসের রাজ্য পুনরুদ্ধারের কাহিনী থেকে। শত্রুর হাতে তিনি যখন বারবার পরাজিত হয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন,তখন এক ক্ষুদ্র মাকড়সার বারবার ছিঁড়ে যাওয়া জাল নতুন করে বোনার সফলতা থেকে তিনি পেয়েছিলেন অধ্যবসায়ের শিক্ষা। অবশেষে তিনি শত্রুর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। কি রহস্য লুকিয়ে ছিল সে জালে? একটি ক্ষুদ্র প্রাণী মাকড়সা কি শিখিয়েছিল রাজাকে?

মাকড়সা কী পোকা?

মাকড়সা আদৌ কোনো পোকা নয়! পোকাদের থাকে ছয় পা, দেহ মাথা, ধড় আর পেট এই তিন অংশে বিভক্ত। কিন্তু মাকড়সার থাকে আট পা। দেহ প্রধানত মাথা আর পেট এই দুই অংশে বিভক্ত। এ দু’টি অংশ খুব সূক্ষ্ম অংশ দ্বারা যুক্ত থাকে। তাছাড়া মাকড়সাদের পোকার মত কোনো পাখা নেই, তাই ওরা উড়তে পারেনা। অবশ্য অনেক পোকারই পাখা থাকে অথবা থাকেও না। বিশেষ করে পোকার বাচ্চাদের। তবে মাকড়সার মতো পোকারা জাল বুনতে পারে না। তাই বলে ভাবা যাবে না যে সব মাকড়সাই জাল বুনতে জানে।

মাকড়সা চেনা কি খুব সহজ?

বেশিরভাগ লোকই মনে করেন মাকড়সা চেনা খুব সহজ। আশেপাশে যেসব মাকড়সা দেখি, সেগুলোর সবই কি দেখতে একই রকম? একই রঙের? নিশ্চয়ই না। পৃথিবীর বুকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার প্রজাতির মাকড়সা সনাক্ত করা হয়েছে। এসব মাকড়সা মোট ১০০টি পরিবারের অন্তর্গত। কিন্তু চারপাশে বড়জোর আমরা ৩০ প্রজাতির মাকড়সার দেখা পাই।এদেশে ধানক্ষেতে মোট ৫২ প্রজাতির মাকড়সাকে সনাক্ত করা হয়েছে। প্রায় সব মাকড়সাই মানুষের উপকার করে।

জাল বোনার রহস্য কী?

মাকড়সার জাল বোনাও একটা বিশাল মুন্সিয়ানার কাজ। সব মাকড়সারই স্পিনিং বা তাঁত গ্রন্থি আছে। মাকড়সা তা দিয়ে সুতা তৈরি ও সে সুতা দিয়ে জাল বোনে। স্পিনিং গ্রন্থি থেকে এক ধরনের নিঃসৃত পদার্থ থেকে রেশম তৈরি হয়। যদিও বিভিন্ন মাকড়সার স্পিনিং গ্রন্থি থেকে বিভিন্ন রকম সুতা উৎপন্ন হয়, তবু সব রেশমই প্রোটিন সমৃদ্ধ ও সুতার মতো। স্পিনিং গ্রন্থির মধ্যে রেশম রস থাকে পানিতে দ্রবণীয় তরল আকারে। কিন্তু যখনই তা বাইরে আসে বা সুতা তৈরি হয়ে যায় তখন তা পানিতে অদ্রবণীয় শক্ত পদার্থে পরিণত হয়। এই রেশম সুতাকে অনেকটা সূক্ষ্ম নাইলন সুতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। মাকড়সার এ রেশমি সুতা প্রধানত কিছু এমাইনো এসিড সমৃদ্ধ প্রোটিন উপাদান দ্বারা গঠিত। বিশেষত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উপাদানই থাকে এলালিন, গ্লাইসিন, সেরিন ইত্যাদি এমাইনো এসিড। জাল বা সুতা তৈরি এজন্য মাকড়সার পেটের শেষ প্রান্তে তিন জোড়া স্পিনারেট থাকে। অগ্রবর্তী, মধ্যবর্তী ও পশ্চাদবর্তী স্পিনারেট। এগুলো অত্যন্ত সঞ্চালন ক্ষমতাসম্পন্ন। স্পিনিং গ্রন্থি থেকে এসব স্পিনারেটের মাধ্যমে রস নিঃসৃত হয়ে সুতা তৈরি হয়।

জালের কাঠামো কেমন?

সব জালের মধ্যে অর্ব জাল বা চাকতি জালকে মাকড়সার আদর্শ জাল বলে ধরা হয়। এ জালের তিনটি কাঠামোগত উপাদান থাকে-

. রেডিয়াল সুতা: জালের কেন্দ্র থেকে যেসব সুতা সোজা সূর্যের রশ্মির মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

. ফ্রেম সুতা: পুরো জালের চারপাশে যেসব সুতা ঘিরে রাখে এবং যার সঙ্গে রেডিয়াল সুতাসমূহ কেন্দ্র থেকে গিয়ে যুক্ত হয়।

.ক্যাচিং জাল: রেডিয়াল সুতাসমূহের ওপর যেসব সুতা চক্রাকারে জালক তৈরি করে এবং যার আঠাল পৃষ্ঠে শিকার ধরা পড়ে।

মূলত তিনটি ধাপে একটি জাল তৈরি হয়। প্রথমত, মাকড়সা ফ্রেম ও রেডিয়াল সুতা তৈরির মাধ্যমে একটি কাঠামো তৈরি করে। দ্বিতীয়ত সেই ফ্রেম বা কাঠামো আরো অনেক সূক্ষ্ম স্পাইরাল বা ক্যাচিং জাল দিয়ে ছাউনি বা জালক তৈরি করে। তৃতীয়ত সেই জালকে আঠাল সুতাসমূহ যুক্ত করে। মাকড়সার জাল একটি অত্যন্ত জ্যামিতিক পরিমিতিতে তৈরি হয়। সাধারণত মাকড়সা একটি জাল তৈরি করতে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় নেয়!

মাকড়সা কেন জাল বোনে?

সব জাল তৈরিরই মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে শিকার ধরা। দ্বিতীয়ত, বিশ্রাম ও বসবাস। জালের মাঝখানে মেয়ে মাকড়সা বেশি থাকে আর কিনারা বা পরিধির দিকে ‌ অথবা অন্যত্র থাকে পুরুষ মাকড়সা। তবে মজার বিষয় হলো, একটি নতুন জাল তৈরির পূর্বে মাকড়সা তাদের পুরানো জালটি খেয়ে ফেলে। এমনকি খিদে পেলে নিজেদের বাচ্চাও খায়! এমন কী রাগ হলে মেয়ে মাকড়সারা পুরুষ মাকড়সাদেরও খেয়ে ফেলে! তবে ওদের প্রিয় খাবার অন্য পোকারা। মাকড়সাকে বলা হয় কৃষকের আসল বন্ধু! কেন জানেন?একটা মাকড়সা একদিনে ফসলের যত শত্রু পোকা খেয়ে ফসল রক্ষা করে আর কোনো পোকা তা করতে পারে না।

চাকতি বা অর্ব মাকড়সাদের কথাই ধরা যাক। এরা সাধারণত ধানগাছের পাতার আগার দিকে জাল বোনে। জালের এক কিনারে ঘাপটি মেরে বসে থাকে শিকারের আশায়।বিভিন্ন পাতা ফড়িং, ঘাসফড়িং, পাতা মাছি, মাজরার মথ এমনকি ঘাসফড়িঙের বাচ্চা যখন উড়তে উড়তে জালে আটকে যায় তখন সেগুলোকে শিকার করে খায়। ভেজা ও শুকনো সব ধরনের ধানক্ষেতেই এদের পাওয়া যায়। তবে জাল পেতে রাখলে সব সময় যে তাতে শিকার ধরা পড়ে, তা নয়। অনেক সময় দু-তিন দিন কেটে যায়। তাতে অবশ্য মাকড়সাদের কিছু যায় আসে না। কেননা ওরা না খেয়েও দিব্যি কয়েকদিন কাটিয়ে দিতে পারে। তবে মুশকিল হল দু'তিন দিনের বেশী জালের আঠা ঠিক থাকে না। তাই তাতে শিকার পড়লেও জাল আর ওদের আটকে রাখতে পারে না। তখন মাকড়সা নিজেই জালটাকে কেটেকুটে অন্যত্র চলে যায় ও নতুন জাল বোনে।

অনেক সময় ওদের মধ্যেও জাল দখলের যুদ্ধ হয়।অপেক্ষাকৃত সবল কোনো মাকড়সা এসে দুর্বল মাকড়সার সঙ্গে মারামারি করে তাকে হারিয়ে দিয়ে জালের দখল নেয়। তবে মাকড়সারা জালের অন্য ব্যবহারও করতে জানে।কোনো সময় আবার মেয়ে মাকড়সারা জালে ঝাঁকি দিয়ে পুরুষ মাকড়সা বন্ধুদের সে জালে আসার আমন্ত্রণ জানায়।জালের একপাশেই হয়তো মেয়ে মাকড়সারা ছোট্ট একটা থলি বানিয়ে তার মধ্যে নিজেদের ডিম জমায়। আবার জাল না বুনে অনেক সময় মাকড়সারা সুতা তৈরি করে সে সুতার দোল খায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য। এদের পায়ের আগায় আঁকশির মত সূক্ষ্ম বাঁকানো নখ আছে। এ নখের সাহায্যেই হাতের আঙ্গুলের মতো সুতা ধরে ওঠানামা করতে পারে।ওদের তো আর অন্য পোকাদের মত পাখা নেই যে উড়ে উড়ে অনেক দূরে যাবে।তাই ওরা দূরে যাওয়া বা উপর থেকে নিচে নামার জন্য জালের সুতাই ব্যবহার করে। তবে শুন্যে না থেকে মাটিতে থাকলে ওরা আবার খুব দৌড়াতে পারে।

মাকড়সা নিজ জালে আটকে যায় না কেন?

মাকড়সার জাল তৈরি হয় আঁঠালো তন্তু দিয়ে। মাকড়সার শরীর থেকে আঁঠালো রস সরু সুচের মতো নল দিয়ে বেরিয়ে বাতাসে মিশলেই তা শুকিয়ে হালকা সুতোর মতো আকার নেয়। ছয়-সাতটি চাকার মতো বৃত্তাকার তন্তুকে পরস্পরের সাথে আটকে রাখে কেন্দ্র থেকে নানা দিকে ছড়িয়ে যাওয়া ব্যাসার্ধ বরাবর তন্তুগুলো। অনেকটা সাইকেলের স্পোকের মতো। ব্যাসার্ধ বরাবর এসব তন্তু আঠা থেকে প্রায় মুক্ত। কোনো পোকামাকড় জালের কোনো একটি চাকার অংশে আটকে গেলে মাকড়সা স্পোকের মতো দেখতে ব্যাসার্ধ বরাবর তন্তুগুলোর ওপর গিয়ে শিকার ধরে। এসব তন্তু তেমন আঁঠালো নয় বলে ওখানে মাকড়সার পা আটকে যায় না। তা ছাড়া মাকড়সার পা থেকে এক ধরনের তৈলাক্ত জিনিস বের হয়, যা মাকড়সাকে জালের আঠা থেকে পা ছাড়িয়ে নিতে সাহায্য করে। দেখা গেছে, ক্লোরোফর্ম জাতীয় জিনিসে মাকড়সার পা ডুবিয়ে রাখলে তৈলাক্ত জিনিসটা ধুয়ে বেরিয়ে যায়। তখন মাকড়সা নিজেই জড়িয়ে যায় নিজের জালে।তাছাড়া মাকড়সা তার নিজের আকারের চেয়ে ছোট প্রাণী শিকার করার জন্য জাল বোনে। তাই স্বভাবতই নিজের পায়ে জাল জড়ানো বা এর বুননে কখনোই আটকে যায় না।আর ওই পরিস্থিতির সঙ্গে মাকড়সা অভিযোজিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস