মাকড়সার চোখের রহস্য

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১৩ ১৪২৬,   ২২ শাওয়াল ১৪৪০

মাকড়সার চোখের রহস্য

মেহেদী হাসান শান্ত

 প্রকাশিত: ১১:১১ ৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১১:১১ ৯ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

অধিকাংশ মাকড়সারই আটটি চোখ রয়েছে। তবে প্রজাতিভেদে দুইটি, চারটি অথবা ছয়টি চোখও দেখতে পাওয়া যায়। আবার কিছু প্রজাতির মাকড়সা রয়েছে যাদের কোন চোখই নেই! এমনকি একই প্রজাতির মাকড়সাদের চোখের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে একটি বিষয় সব মাকড়সার জন্যই সত্য, তাদের যতগুলো চোখ থাকুক না কেন তা হবে অবশ্যই জোড় সংখ্যায়। বিজোড় সংখ্যাবিশিষ্ট চোখের মাকড়সার দেখা পাওয়া যায় না। মাকড়সাদের দু’ধরনের চোখ থাকে। কিছু হলো 'প্রাইমারি আই', যেগুলো সামনে থাকা বস্তুর একটি অবয়ব তৈরি করে। বাকিগুলো হলো 'সেকেন্ডারি আই', যেগুলো লক্ষ্যবস্তুর নড়াচড়া ও আকার পরিমাপ করতে কাজে লাগে। চোখের সংখ্যা ও সজ্জার ওপর নির্ভর করে একজন বিজ্ঞানী মাকড়সাটির গোত্র এবং প্রজাতি নির্ধারণ করে থাকেন।

মাকড়সাদের কেন এতগুলো চোখের প্রয়োজন হয়?

প্রকৃতিপ্রদত্তভাবে অধিকাংশ মাকড়সা এত বেশি চোখের অধিকারী হয় কারণ তারা চারদিকে ভালো করে দেখার জন্য তাদের সেফালোথোরাক্স (মস্তক) ঘুরাতে পারে না। তাদের চোখগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই আটকানো থাকে। তবে শিকার ধরার জন্য এবং শিকারিদের থেকে সাবধান থাকতে মাকড়সাদের চারদিকের পরিবেশ সম্পর্কে সব সময় সচেতন থাকতে হয়।

মাকড়সার চোখের প্রকারভেদ

মাকড়সার দেহের সাধারণত দুই ধরনের চোখ লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো সম্মুখ বরাবর অবস্থিত প্রাইমারি আই বা ওসেলি। এবং অন্যটি সেকেন্ডারি আই। আর্থোপোডা বর্গের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য প্রাণীগুলোতে ওসেলি শুধুমাত্র আলোর দিক নির্ণয়ে কাজে লাগে। তবে মাকড়সাদের ওসেলি লক্ষ্যবস্তু পরিপূর্ণ অবয়ব তৈরি করে। এগুলোকে প্রিন্সিপাল আই বা প্রধান চোখও বলা হয়। প্রধান চোখগুলোতে থাকে বিশেষ ধরনের মাংসপেশী, যা রেটিনাকে ফোকাস বরাবার ঘুরতে ও লক্ষ্য বস্তুর প্রতিচ্ছবি তৈরিতে সহায়তা করে। অধিকাংশ মাকড়সার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হলেও জাম্পিং স্পাইডারদের ওসেলির প্রতিবিম্ব গঠনের ক্ষমতা বেশ প্রখর। পতঙ্গ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে ভালো দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন হলো ড্রাগন ফ্লাই। জাম্পিং স্পাইডারদের দৃষ্টিশক্তি ড্রাগন ফ্লাইকেও ছাড়িয়ে যায় , এমনকি এক্ষেত্রে তারা মানুষকেও টক্কর দিতে সক্ষম! ওসেলিগুলো এদের অবস্থানের কারণে অ্যান্টারো মিডিয়া আই (এএমই) নামেও পরিচিত।

অন্যদিকে, সেকেন্ডারি আইগুলোকে কমপাউন্ড আই বা জটিল চোখও বলা হয়ে থাকে। সেকেন্ডারি আইতে কোনো মণি থাকে না। প্রাইমারি আই এর তুলনা সাধারণত সেকেন্ডারি আই ছোট আকারের হয়। এই চোখগুলোতে কোনা মাংসপেশি থাকেনা বিধায় এরা কোনোরকম নড়াচড়াও করতে পারে না। অধিকাংশ সেকেন্ডারি চোখ হয় গোলাকার, তবে মাঝেমধ্যে ডিম্বাকার কিংবা অর্ধচন্দ্রাকৃতির সেকেন্ডারি চোখ দেখতে পাওয়া যায়। এই চোখ গুলোকেও তাদের অবস্থান অনুযায়ী চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। মস্তকের পার্শ্ব দেশে একেবারে উপরে সারিতে থাকে এন্টারো-ল্যাটারাল আই (এএলই) নামে এক গুচ্ছ চোখ। পোস্টারো-ল্যাটারাল আই (পিএলই) থাকে দ্বিতীয় সারিতে। মস্তকের মাঝ বরাবর অবস্থান করে পোস্টারো-মিডিয়ান আই (পিএমই) নামের চোখ গুচ্ছ।

মাকড়সার সেকেন্ডারি চোখ বেশ কয়েকটি কাজ সম্পাদনা করে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো প্রাইমারি চোখের রেঞ্জ বা পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে, যা মাকড়সাকে কোনো বস্তুর ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ইমেজ বা প্রশস্ত প্রতিচ্ছবি পেতে সহায়তা করে। লক্ষ্যবস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণেও সেকেন্ডারি চোখ বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। সম্ভাব্য বিপদ অথবা চারপাশে থাকা শিকারের দূরত্ব এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে মাকড়সা ধারণা পেয়ে থাকে তার এসব সেকেন্ডারি চোখ ব্যবহারের মাধ্যমে। কিছু কিছু নিশাচর প্রজাতির মাকড়সা রয়েছে, তাদের চোখে থাকে ট্যাপেটাম লুসিডিয়াম, যা আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে মাকড়সাকে অল্প আলোতেও দেখতে সাহায্য করে।

একটি মাকড়সা কোনো গোত্র এবং প্রজাতির অন্তর্গত তা নিশ্চিত হতে সেটির চোখের সংখ্যা অবস্থান গবেষকদের অনেক সাহায্য করে থাকে। তাই মাকড়সাদের এ বৈচিত্র্যময় চোখ শুধু তাদের নিজেদের উপকারেই নয়, বড় তাদেরকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার জন্য মানুষের উপকারেও কাজে দেয়!

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস