মাইকেল জ্যাকসন ‘নেভারল্যান্ডে’ শিশুদের নিয়ে অপকর্ম করতেন!

ঢাকা, সোমবার   ২৫ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭,   ০২ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মাইকেল জ্যাকসন ‘নেভারল্যান্ডে’ শিশুদের নিয়ে অপকর্ম করতেন!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪১ ১৩ মে ২০২০   আপডেট: ১৪:০৩ ১৩ মে ২০২০

ছবি: নেদারল্যান্ডে শিশুদের সঙ্গে খেলা করছেন মাইকেল

ছবি: নেদারল্যান্ডে শিশুদের সঙ্গে খেলা করছেন মাইকেল

রূপকথার গল্প বা কার্টুনের বিভিন্ন সিরিজ দেখার সময় আপনার নিশ্চয় মনে হয়েছে, আমার এমন একটা প্রাসাদ থাকত, এমন একটা গাছপালায় ঘেরা বাড়ি থাকত, সেখানে পার্ক, বাগান সবকিছু থাকবে। যেখানে কিছুর অভাব থাকবে না। 

কল্পনায় এমন জগতে বারবারই হারিয়ে গেছেন অনেকেই! এমনই এক কল্পনার জগত নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। পশ্চিমা সঙ্গীতজগতের ধারাকে পাল্টে দিয়েছিলেন যিনি। পপ সংগীতের কিং মানা হয় তাকে। 

শুধু গানেই নয় উপস্থাপনায় সৃজনশীলতা, গানের সঙ্গে মানানসই মনমুগ্ধকর নৃত্য, ব্যক্তিগত আদর্শ, জীবনযাপনের ধারাসহ আলোচিত-সমালোচিত নানা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তার সময়কার সঙ্গীত জগতে তুমুল আলোড়ন তৈরি করেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।  

নেভারল্যান্ডতার তৈরি নেভারল্যান্ডও ছিল তেমনই সমালোচকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বাড়িটি ক্যালিফোর্নিয়ার লস প্যাড্রেস ন্যাশনাল ফরেস্টের প্রান্তে ৯৩৪৪১ এর ৫২২৫ ফিগেরোয়ানা মাউন্টেন রোডে অবস্থিত। প্রায় দুই হাজার ৮০০ একর জায়গা জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের স্যান্টা বারবারা কাউন্টিতে তৈরি এই নেভারল্যান্ড। কি নেই সেখানে!

অনেকটা ডিজনিল্যান্ডের আদলেই তৈরি করা হয়েছিল এটি। মাইকেলের শৈশব কেটেছে খুবই অভাব আর বাবার মারের ভয়ে। সবসময় বাবা জোসেফের মারের ভয়ে তটস্থ থাকতে হত তাকে। আর আর্থিক অভাবের কারণে কোনো শখই পূর্ণ হয়নি তার। এজন্যই তিনি আর দশটা শিশুর স্বপ্নের যে জগৎ থাকে তেমন করেই সাজিয়েছিলেন নেভারল্যান্ড ভ্যালি। 

পৃথিবী বিখ্যাত যতগুলো ফার্মহাউজ আছে তার মধ্যে নেভারল্যান্ড অন্যতম। এতে রয়েছে ছোট্ট রেলপথ, একটি বড়সড় চিড়িয়াখানা, বিনোদন পার্ক, ৫০ সিটের একটি সিনেমা হল, বাস্কেট গ্রাউন্ড, সুইমিং পুল, টেনিস কোর্টসহ আরাম আয়েশের যাবতীয় আয়োজন। যদিও এসব সুবিধা পৃথিবীর আরো অনেক ফার্মহাউজেই পাওয়া যাবে। তবে কিংবদন্তি মাইকেলের জন্যই এটি বেশি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল।  

নেভারল্যান্ডে মাইকেল১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ফার্মহাউজটির মালিক ছিলেন উইলিয়াম বোনে। সেসময় এর নাম ছিল সিকামো ভ্যালি। আবাসন ব্যবসার মধ্যমে বিশাল ধনসম্পত্তি লাভ করেছিলেন বোনে। এই ফার্মহাউজের ওপর বিশাল পরিমাণে বিনিয়োগ ছিল তার। সেখানকার ১২, হাজার বর্গ মিটারের মূল বাসভবনটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে।    

অন্য সবার মতোই ছোটবেলা থেকেই ডিজনিল্যান্ডের প্রতি মাইকেলের বিশাল রকমের মুগ্ধতা ছিল। তবে খ্যাতির বিড়ম্বনা বলে একটা কথা আছে। তাই ঘটত মাইকেলের বেলায়। যেখানেই যেতেন মানুষজন ঘিরে ধরত তাকে। তাই ছদ্মবেশ ছাড়া ডিজনিল্যান্ডে যাওয়া হয়ে উঠত না তার। গেলেও থাকতে হত নিরাপত্তারক্ষীদের কড়া নিরাপত্তায়। এতে তার ভ্রমণ ঠিক উপভোগ্য হয়ে উঠত না।    

ডিজনিল্যান্ড ৫১০ একর জমির ওপর অবস্থিত। তাই মাইকেল যখন ২৭০০ একরের সিকামোর ভ্যালি দেখলেন, মনের মধ্যে ডিজনিল্যান্ডের মতো করে ব্যক্তিগত একটি থিম পার্ক তৈরি করার ইচ্ছা জেগে উঠল তার। এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলেন না মাইকেল। সিকামোর ভ্যালি কিনে নেয়ার জন্য মনস্থির করলেন তিনি। 

এতিমখানার শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করছে মাইকেলসিকামোর ভ্যালি প্রথমবার দেখার পর পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে বোনে এবং মাইকেলের মধ্যে সম্পত্তিটির বিভিন্ন দিক নিয়ে দেন-দরবার চলতে থাকে। সেসময় খামারবাড়িটির জন্য বোনে দাম হাঁকান ৩৫ মিলিয়ন ডলার। তবে মাইকেল জ্যাকসন আদর্শ ক্রেতার মতোই দাম বলেন তার অর্ধেক। সেটাও ছিল ১৭ মিলিয়নের কাছাকাছি। দরদাম করতে করতে শেষ পর্যন্ত ২০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি দামে বোনে মাইকেল জ্যাকসনের কাছে সিকামো বিক্রি করতে সম্মত হন। 

১৯৮৮ সালের মে মাসে মাইকেল ও তার পরিবার নতুন কেনা ফার্মহাউজে ওঠেন। সেখানে ওঠার পরপরই বাড়িটিকে নিজের স্বপ্নের মতো করে সাজিয়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে যান মাইকেল জ্যাকসন। সিকামোর নাম বদলে নাম রাখেন নেভারল্যান্ড ভ্যালি। পিটারপ্যানের কাল্পনিক দ্বীপ নেভারল্যান্ড থেকেই এর নামকরণ করা হয়েছিল। যেটিকে বিবেচনা করা হয় শিশুসুলভ উচ্ছ্বলতা এবং অমরত্বের প্রতীক হিসেবে। 

আকারে বিশাল এই ফার্মহাউজের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পায়ে হেঁটে চলাচল করা দুষ্কর। তাই যাতায়াতে অসুবিধা দূরীকরণের জন্য নেভারল্যান্ড জুড়ে রেললাইন স্থাপন করা হয়, যা দিয়ে ছোটখাট দুটি ট্রেন চলাচল করত। ট্রেন চলাচলে সমন্বয়ের জন্য তৈরি করা হয় একটি রেলস্টেশন। স্টেশন বিল্ডিংয়ের সামনে তৈরি করা হয় একটি ফুলঘড়ি, যা পরবর্তীতে নেভারল্যান্ডের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল। 

শিশুদের অনেক পছন্দ করতেন মাইকেলনেভারল্যান্ডের বিশাল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় খামারবাড়িটির মূল বাসভবনে। এই বাসভবনটি উইলিয়াম বোনের সময় তৈরি করা হয়েছিল। বেশ কয়েকটি পৃথক পৃথক ভবনের সমন্বয়ে তৈরি ছিল এটি। এর সামনে ছিল বিশাল একটি ড্রাইভওয়ে। হলিউডের ফিল্মগুলোতে যেসব বাড়ি দেখানো হত সেসবের অনুপ্রেরণায় তৈরি করা হয়েছিল নেভারল্যান্ডের মূল বাসভবনটি। 

এছাড়াও সেখানে রয়েছে পার্ক, রেলপথ, সিনেমা থিয়েটার, ঘোড়ার আস্তাবল এবং একটি চিড়িয়াখানা। যেখানে হাতি বা জিরাফের দেখা মিলত অনায়াশেই। এখানে আরো ছিল থ্রিলার এবং সাবু নামের দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জিপসি নামক একটি এশিয়ান হাতি। যা মাইকেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এলিজাবেথ টেলর তাকে উপহার দিয়েছিলেন। সরিসৃপের মধ্যে ছিল ম্যাডোনা নামের একটি অজগর এবং মাসল নামের একটি বোয়া কন্সট্রিক্টর। 

মাইকেল নিঃসন্দেহে একজন পশুপ্রেমী ছিলেন, তা বলাই যায়। নেভারল্যান্ডে আরো ছিল চারটি জিরাফ, তিনটি শিম্পাঞ্জি, ম্যাকাও, অ্যালিগেটর, চিলিয়ান ফ্ল্যামেঙ্গোসহ অসংখ্য পশুপাখি। মাইকেলের এই স্বপ্নরাজ্য শিশুদের জন্য ছিল উন্মুক্ত। শুধু নেভারল্যান্ড দেখা নয়, সঙ্গে স্বয়ং মাইকেল জ্যাকসনের সান্নিধ্যও পেত তারা। শিশুদের নিয়ে মাইকেল সময় কাটাতে পছন্দ করত। 

শিশুদের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতেন তিনিমাইকেল শিশুদের খুবই ভালোবাসতেন। তাদের নিয়ে খেলতে, ঘুরে বেড়াতে, ছবি তুলতে খুবই পছন্দ করতেন তিনি। অনেক সময় শিশুরা মাইকেলের বেড্রুমে তার সঙ্গেই ঘুমাত। ১৯৯৩ সালে মাইকেলের বিরুদ্ধে একটি ১২ বছর বয়সী ছেলের বাবা মা গুরুতর অভিযোগ আনে। তারা মাইকেলের বিরুদ্ধে শিশুটির শ্লীলতাহানি করার অভিযোগ করে পুলিশের কাছে। পুলিশ গোটা নেভারল্যান্ড জুড়ে অভিযান চালিয়েও সন্দেহজনক কিছুই খুঁজে পায়নি। 

এরপর মাইকেল নেভারল্যান্ড থেকে এক প্রকার পালিয়েই যায়। যদিও এর পাঁচ বছর পরে আবার তিনি নেভারল্যান্ডে ফিরে আসেন। অতঃপর পুলিশ তার পুরো শরীরের নগ্ন ছবি তুলে ঘটনার সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা চালায়। কারণ শিশুটির অভিযোগ ছিল, তিনি নাকি মাইকেলকে নগ্ন অবস্থায় দেখেছে। আর এক কারণেই পুলিশ মাইকেলের শরীরের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলে প্রমাণস্বরূপ। তবে তারা শিশুর দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী মাইকেলের শরীরের কোনো অংশই মেলাতে পারেননি।

এ কারণে তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তবে অবাক করা বিষয়টি হলো, এরপরও তিনি ওই শিশুকে এক বিলিয়ন অর্থ দিয়েছিলেন। তিনি যদি অপরাধী না হয়েই থাকেন তবে এই অর্থ দেয়ার কারণ কী? এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমার মতো একজন গুণী মানুষের নামে যেহেতু যে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছে তাই সমাজ তাকে ভালোভাবে মেনে নেবে না। নিতান্তই শিশুটির ভবিষ্যতের চিন্তা করে আমি তাকে এই অর্থ দিয়েছি।

 এই শিশুটিই মাইকেলের নামে অভিযোগ আনেঅনেকের মতে, মাইকেল শিশু ও তার পরিবারের মুখ বন্ধ রাখতেই এই অর্থ তাদের দিয়েছিলেন। মাইকেল ও তার নেভারল্যান্ড ঘিরে নানা কথার ছড়াছড়ি রয়েছে। জানা যায়, সেখানে তিনি অনেক শিশুদেরকে রাখতেন। অবশ্য সেসব শিশুদের পরিবারের অনুমতিতেই মাইকেলের কাছে তারা থাকত। মাইকেন সবসময় বলেছেন, তিনি শিশুদেরকে অনেক ভালোবাসেন, আর তাইতো তাদেরকে নিজের বেডরুমে নিয়ে একই বিছানায় ঘুমাতেন।

এরপর ২০০৩ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তার বিরুদ্ধে আরো একটি ছেলে শিশুকে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনা হয় তার উপর। তখনো প্রায় ৭০ জন পুলিশের একটি দল দ্বিতীয়বারের মতো নেভারল্যান্ডে তল্লাশী চালায়। এই ঘটনার পর মাইকেল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিচারের পরে জ্যাকসন বলেছিলেন, তিনি আর কখনো নেভারল্যান্ডে থাকতে পারবেন না। 

লাস ভেগাস থেকে সোজা চলে যান বাহারাইনে। পরবর্তীতে তিনি আমেরিকায় ফিরে এলেও নেভারল্যান্ডে আর কখনো পা রাখেননি। ২০০৩ সালে এখানকার সব কর্মচারীদের বিদায় করে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে তখনো নেভারল্যান্ডের মালিকানা তারই ছিল। 

শিশুদের প্রতি তার দুর্বলতাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননিনেভারল্যান্ড রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে খরচ হত প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার। ২০০৭ সালের দিকে মাইকেলের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, এই বিশাল অর্থের যোগান দেয়া তার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। ফলে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ঋণের বোঝা। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, নেভারল্যান্ডের খরচ বাবদ প্রায় দুই কোটি ডলারের মতো অর্থ বকেয়া আছে।

মাইকেল এই অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে তার নেভারল্যান্ড নিলামে বিক্রি করে দেয়া হবে। অবশ্য পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করে মাইকেল। এতে করে তার নেভারল্যান্ড নিলামে ওঠার হাত থেকে রক্ষা পায়। ২৫ জুন ২০০৯ তারিখে মাইকেল জ্যাকসন তার লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি অ্যাপার্টমেন্টে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ২০১০ সালের অক্টোবরে মাইকেলের সন্তানরা নেভারল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা করেছিল বলে গুঞ্জন ওঠে। 

তবে কিছুদিনের মধ্যেই তা আবার থেমে যায়। ২০১৫ সালে নেভারল্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সাইকামোর ভ্যালি। যদিও মাইকেলের ভক্তকুলের কাছে এটি এখনো মাইকেলের নেভারল্যান্ড নামেই পরিচিত। প্রতিবছর সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার ভক্ত তাদের প্রিয় গায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে নেভারল্যান্ডে ভিড় জমায়।

সূত্র: কসমোপলিটনডটকম, স্মুথরেডিও, এস্কুয়েরডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস