Alexa মহেঞ্জোদারো শহর কেমন ছিলো?

ঢাকা, শনিবার   ২০ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৫ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪০

মহেঞ্জোদারো শহর কেমন ছিলো?

খালিদ মাহমুদ খান

 প্রকাশিত: ১১:৫৫ ১০ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১১:৫৫ ১০ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি শহর হলো মহেঞ্জোদারো। আজ থেকে প্রায় প্রায় চার হাজার ছয়'শ বছরের পুরনো এটি। মহেঞ্জোদারো ছিল বর্তমান বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোর মতোই একটি শহর। তাদেরও ছিল ইটের বাড়ি, সান বাঁধানো পুকুর এবং পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা কিন্তু বর্তমানে মহেঞ্জোদারো একটি ধ্বংসস্তূপ যেটি লিপিবদ্ধ হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। মহেঞ্জোদারো ছিলো হরপ্পা সভ্যতার প্রধান শহর। যেটা বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত। ৪ হাজার ৬০০ বছরের পুরানো এই শহরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে। মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থ মৃতের স্তুপ। এই শহর সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানে তবে যতটুকু জানে ততটুকু বেশ বিস্ময়কর! তবে চলুন জেনে আসা যাক মহেঞ্জোদারো সম্পর্কে কিছু বিস্ময়কর তথ্য-

আবিষ্কার

১৮৫৬ সালে একজন ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার এই অঞ্চলে রেললাইন স্থাপনের কাজ করছিলেন। সেসময় মাটির তলায় তিনি পুরানো ইট পান যেগুলো আজকের মতই দেখতে ছিল। তখন একজন স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানা যায় এখানকার সকল বাড়ি এই ইটের তৈরি যা মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায়। তখন সেই ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার বুঝে যান এগুলো সাধারণ কোনো ইট নয়। এই জায়গায় লুকিয়ে আছে কোনো প্রাচীন সভ্যতা। সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা এই শহর সম্পর্কে এই ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ারই প্রথম জানতে পেরেছিলেন। অতঃপর ১৯২২ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো পুনরাবিষ্কার করেন এবং ১৯৩০ সালে স্যার জন মার্শাল এর নেতৃত্বে ব্যাপক খননকার্য চালানো হয়।

উন্নত জীবন শৈলী

মহেঞ্জোদারোতে বসবাসরত তখনকার মানুষের উন্নত জীবনাচরণ সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর। মহেঞ্জোদারো তখনকার সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত এবং সমৃদ্ধ ছিল। এই শহর প্রায় ৬০০ একর জমির উপর বিস্তৃত ছিল যেটা তখনকার সময় বেশ বড় আয়তনের। এখনকার ধ্বংসস্তূপ থেকে জানা যায় শহরে প্রবেশ করার জন্য একটা বড় গেট ছিল। এছাড়াও এখানে এমন কয়েকটি বড় বাড়ি আছে যা তিনতলা পর্যন্ত উঁচু। এখানে বাড়ি বানানোর জন্য যে ইট ব্যবহার করা হয়েছিল তা কোনো সাধারণ ইট ছিল না বরং ওয়াটার প্রুফ ইট ছিল। ধারণা করা হয় পৃথিবীতে প্রথম পাত কুয়া তৈরি করা হয়েছিল হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের দ্বারা। এই শহরে ৭০০ এর বেশি পাতকুয়ার সন্ধান মিলেছে। সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত মহেঞ্জোদারো সবচেয়ে পুরনো পরিকল্পিত একটি শহর। এখানকার রাস্তাগুলো এলোপাথাড়ি তৈরি হয়নি বরং প্রত্যেকটি রাস্তারই একটি নির্দিষ্ট ধারা এবং মাপ ছিল। এ থেকে ধারণা করা হয় মহেঞ্জোদারোর মানুষদের গণিতশাস্ত্রে বেশ ভালো জ্ঞান ছিল।

পয়ঃপ্রণালী

মহেঞ্জোদারো কোনো সাধারণ শহর ছিল না বরং এই শহরে বড় বড় ঘর, পরিকল্পিত রাস্তা ও কুয়া থাকার প্রমাণ মিলেছে। আরো অবাক করার মতো তথ্য হলো এই শহরে নোংরা জল বের হওয়ার জন্য ড্রেইনেজ ব্যবস্থা ছিল অর্থাৎ বড় বড় নির্দিষ্ট সংখ্যক ড্রেন ছিল যা সেসময় হিসেবে বেশ অকল্পনীয় একটু ব্যপার। মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে এত সজাগ ছিল যেটা হয়তো আজকের যুগের মানুষেরও নেই। এমনকি মহেঞ্জোদারো শহরে বাথরুম ব্যস্থারও প্রমাণ মিলেছে। মহেঞ্জোদারোর এক বড় আকর্ষণ ছিল মহা স্নানাগার। নগরীর ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত গ্রেট বাথ নামক স্থাপনাটি। গবেষকদের ধারণা ধর্মীয় পরিশুদ্ধির জন্য এই জায়গায় গোসল করতে আসতো পুণ্যার্থীরা। পুলের জল যাতে বেরিয়ে না যায় তাই সেদিকেও খেয়াল ছিল মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দাদের।

শস্য ভান্ডার

সেখানকার মানুষ চাষবাস করতো, খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখার জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। শস্যের আদান-প্রদানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছিল স্থাপনাটির পাশে। এমনকি খাদ্য শস্য যেন অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে এবং শস্য ভান্ডারে বাতাস চলাচলের জন্যও উপযুক্ত ব্যবস্থা করে রেখেছিল মহেঞ্জোদোরোর বাসিন্দারা।

চিকিৎসা

খনন করার সময় সেখানে পাওয়া কঙ্কালগুলোর দাঁত যখন পর্যবেক্ষণ করা হয় তখন অবাক করার মত একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, তখনকার মানুষেরা আজকের দিনের মতো নকল দাঁত ব্যবহার করত। এটা থেকে বোঝা যায় হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও অনেক এগিয়ে ছিল।

শিল্প-সংস্কৃতি

হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা শিল্প-সংস্কৃতিতেও আধুনিক  ছিলেন বলে গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন। শিল্পকলায় তখনকার মানুষদের বেশ আগ্রহ ছিল বলে ধারণা করা যায়। পোড়ামাটির তৈরি নানা শিল্পকর্ম পাওয়া গেছে অধিবাসীদের মধ্যে। অলংকার ব্যবহারের প্রচলন ছিল সেই সময়। গলার হার, কানের দুল, হাতের ব্রেসলেট জাতীয় গহনা পরার চল ছিল নারীদের মধ্যে। পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা গান বাজনা ও খেলাধুলাও চর্চা করত। গবেষকরা কিছু মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট ও খেলনার সন্ধান পেয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন চিত্রকলা, মূর্তি, বিভিন্ন রকমের পাত্র এবং অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছে যেগুলো দেশ বিদেশের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে।

নগরীর পতন

নিখুঁত নগর নির্মাণের মতোই চমকে দেয়া মহেঞ্জোদারো পতন কখন কীভাবে কেন হলো তা আজো পুরাতত্ত্ববিদদের অজানা একটি বিষয়! সেখানে প্রাপ্ত কয়েকটা জিনিস এর কার্বন ট্রেডিং করার পর কয়েকটা বিষয় তুলে ধরেছেন তারা মনে করেন জলবায়ুর বিরাট পরিবর্তন এই শহর ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ ধীরে ধীরে সিন্ধু নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এখানে জলের অভাব দেখা দেয় সেই সঙ্গে আবহাওয়া কোনো বিপদ ডেকে এনেছিল যার ফলে হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় তবে ধ্বংসের পেছনে নিশ্চিত কোনো কারণ কী লুকিয়ে আছে সকলেরই অজানা। পুরাতত্ত্ববিদরা আজও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণটি জানার উদ্দেশ্যে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস