Alexa মহাসাগরে বিমান বিস্ফোরণ, বেঁচে রইলেন দুই পাইলট

ঢাকা, শনিবার   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১৬ ১৪২৬,   ০৫ রজব ১৪৪১

Akash

২য় পর্ব

মহাসাগরে বিমান বিস্ফোরণ, বেঁচে রইলেন দুই পাইলট

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ২১ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:১০ ২১ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রশান্ত মহাসাগরে তলিয়ে গেল বিমান। তবে বেঁচে রইলেন দুই পাইলট। জেলিফিশের কামড়ে জ্ঞান হারিয়েও মারা যাননি তারা। ভাবছেন কীভাবে সম্ভব? এমনই এক রোমাঞ্চকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েই প্রাণে বেঁচেছেন দুই সাহসী পাইলট। কীভাবে সমুদ্রের তলে তাদের বিমান হারিয়ে গেল সে সম্পর্কে প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের বেঁচে ফেরার গল্প থাকছে আজকের দ্বিতীয় পর্বে-

বিকেল শেষ হয়ে সূর্য ক্রমেই ম্লান হচ্ছে। এদিকে ম্যাকমাহনের নিশ্চিন্ত ভাবটিও ক্রমশই দুর্বল হতে লাগল। এই রাতটা বোধ হয় তাদের পানিতেই কাটাতে হবে! তার চেহারায় ভয়ের ছায়া দেখতে পেলেন উয়েমোতো। তিনি অনুভব করলেন, সমুদ্রের পানি দিকবদল করেছে। ঢেউ এখন দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী। উয়েমোতো হাওয়াইর মেয়ে। 

সব হাওয়াইবাসীর মতো তিনিও জানেন, অ্যান্টার্কটিকার আগে হাওয়াইর দক্ষিণে আর কিছু নেই। আর অ্যান্টার্কটিকা এখান থেকে এক হাজার, ৯৯০ কিলোমিটার দূরের পথ! উয়েমোতো ও ম্যাকমাহন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন, এরপর কাইলুয়া কোনা আগ্নেয়গিরির আবছা ছায়া বরাবর সাঁতার কাটতে শুরু করেন। যদিও সেটি তাদের থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে।                   

ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর উয়েমোতো ক্লান্ত। একসময় উয়েমোতোর পা দু’টো অবশ হয়ে এলো। এবার শুধু হাতেই সাঁতরাতে থাকলেন তিনি। অল্প কিছুক্ষণ পর ম্যাকমাহনের অবস্থাও আরো খারাপ হয়ে এলো। দীর্ঘ আট ঘণ্টা ধরে সাঁতার কেটে সে এখন পুরোপুরি ক্লান্ত। প্রথম কয়েক ঘণ্টা ম্যাকমাহনই নানাভাবে সাহস জুগিয়ে এসেছিল উয়েমোতোকে। এবার সেই দায়িত্ব নিলেন উয়েমোতো। নিজের অচল পা-দু’টি দিয়ে জড়িয়ে নিলেন ম্যাকমাহনের দুই বাহু। 

সমুদ্রে সাঁতার কেটে বেঁচে ছিলেন তারাতার পিঠের ওপর ম্যাকমাহন মাথা রাখলেন। তবে এভাবে চললে তাদের দুজনকেই ডুবে মরতে হবে। তাই উয়েমোতো নিজেকে ম্যাকমাহনের বাঁধন থেকে মুক্ত করলেন এবং দু’জন মুখোমুখি হলেন। উয়েমোতো ম্যাকমাহনের লাইফ জ্যাকেটটি পরীক্ষা করলেন, সেটির তো অচলাবস্থা। ম্যাকমাহন এবার উয়েমোতোর হাঁটু জড়িয়ে ধরে বিশ্রাম নিতে এবং হারানো শক্তি সঞ্চয় করতে থাকলেন। আর উয়েমোতো সাঁতার কেটে চললেন উপকূলের দিকে। 

ম্যাকমাহন এতক্ষণ উয়েমোতোর দুই পা জড়িয়ে ধরে ছিলেন। হঠাৎ করেই উয়েমোতো পায়ে ব্যথা অনুভব করলেন। তিনি ম্যাকমাহনের হাত দুটো সরিয়ে দিলেন এবং চাঁদের আলোতে দেখলেন, তার দুই বাহু বেয়ে সাদা, রেশমি কী যেন উঠছে। আরেহ, এ তো জেলিফিশ! জেলিফিশের কামড় খেলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। সঙ্গে শরীর ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। আর এই দুর্বল শরীর নিয়ে উয়েমোতোর কি না সেটাই হতে যাচ্ছে! 

তিনি প্রবল বেগে তার শরীর থেকে জেলিফিশগুলোকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। জেলিফিশ কামড় বসিয়েছে তার শরীরে। এরইমধ্যে ভয়ানক বিষ তার শরীরে কাজ করতেও শুরু করেছে। তার সারা শরীর ব্যথা করছে। এরপরই উয়েমোতো শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করলেন এবং মুহূর্তেই জ্ঞান হারালেন। প্রবল আতঙ্ক নিয়ে ম্যাকমাহন দেখলেন তার চোখের সামনেই উয়েমোতো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। 

হাঙরের থাবারও শিকার হতে গিয়ে বেঁচে যান তারাউয়েমোতোর মাথাটা যাতে পানিতে ডুবে না যায় সেই চেষ্টা করলেন ম্যাকমাহন। এর কিছুক্ষণ পর খানিকটা জ্ঞান ফিরে এলো উয়েমোতোর। সে জেলিফিশের কামড়ের জ্বালা আর সহ্য করতে পারছিল না। এভাবেই রাত শেষে দেখা দেয় নতুন সূর্য। সাগরে বিপদগ্রস্ত ভাসমান দুই বৈমানিককে স্বাগত জানায় অপূর্ব সুন্দর হাওয়াই দ্বীপ।

যতো দূর চোখ যায় তাদের মোহিত করেছে এই সবুজ ও রাজকীয় দ্বীপটি। সারাটা সকাল তাদেরকে সঙ্গ দিয়েছে ছোট ব্ল্যাক ফিশের ঝাঁক। অন্য যে কোনো সময় হলে এটি হতো অসাধারণ একটি সমুদ্রভ্রমণ। ঈষদুষ্ণ সাগরজল এতটাই স্বচ্ছ ও নীল, যেন আমরা ইচ্ছে করলে এর তলদেশ পর্যন্ত দেখে নেয়া যায়। 

এরপরই তারা খেয়াল করল তাদের সঙ্গে ভেসে চলা ব্ল্যাক ফিশের ঝাঁকটি হঠাৎ যেন ভয় পেয়ে ছুটে পালিয়ে গেল। উয়েমোতো দেখলেন কিসের যেন একটি ছায়া তার সামনে। ভয়ে আতঙ্কে তার নিশ্বাস গলায় আটকে গেল। ম্যাকমাহনও দেখেছিলেন ছায়াটি একটি হাঙর। পানির উপরিভাগ থেকে তিন মিটারের মতো নিচে তাদের সঙ্গেই চলছে হাঙ্গরটি। ম্যাকমাহন উয়েমোতোকে সাহস দিচ্ছিলেন আর নড়াচড়া করতে নিষেধ করেন।

অতঃপর টহলরত হেলিকপ্টার তাদেরকে বাঁচায়হাঙ্গরটি তাদের চারপাশে কিছুক্ষণ চক্কর কেটে যেভাবে এসেছিল সেখাবেই চলে গেল। এর আধা ঘণ্টা পর হাঙর আবার ফিরে এলো। এবার ওটিকে দেখে ম্যাকমাহনের পেট মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে হলো, আমাদের উড়োজাহাজ ক্র্যাশ করলেও আমরা বেঁচে আছি। রাতভর সমুদ্রে সাঁতার কেটেছি, তাও মরিনি। তবে এবার বোধ হয় আর উপায় নেই, হাঙরের পেটেই বুঝি যেতে হবে।

এবারো হাঙরটি যেমন চুপচাপ এসেছিল, তেমনি নিঃশব্দে চলে গেল। তখনো তারা উপকূল থেকে ১৬ মাইল দূরে। যেভাবেই হোক সূর্য ডোবার আগেই তাদের তীরে পৌঁছাতে হবে। দুপুরের ঠিক আগে তারা আকাশে একটি হেলিকপ্টার দেখলেন। সেটি তাদের মাথার ওপর ডান দিকে উড়ছিল। তারা দু’জনেই হেলিকপ্টারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হাত নাড়লেন। এবারো কাজ হলো না। 

প্রায় ২০ ঘণ্টা কেটে গেছে। হাল ছেড়ে দিয়ে তারা পানিতে ভাসতে থাকলেন। সেই মুহূর্তে তারা আবারো একটি হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তারা দুজনই প্রাণপণে হাত নাড়াতে লাগলেন। হেলিকপ্টারটি তাদের মাথার ওপর এসে থামল। তাদের জীবন বুঝি বেঁচে গেল। দশ মিনিটের মাথায় দ্বিতীয় আরেকটি হেলিকপ্টার চলে আসল। একটি ধাতব উদ্ধার বাস্কেট নিয়ে বেশ নিচুতে নেমে এলেন একজন উদ্ধারকারী। তারপর প্রথমে উয়েমোতো এবং পরে ম্যাকমাহনকে তুলে নেয়া হলো। 

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস