Alexa মহাসমাবেশে নির্বাচনী বার্তা,মন্ত্রিসভা ছাড়ছে না জাপা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

মহাসমাবেশে নির্বাচনী বার্তা,মন্ত্রিসভা ছাড়ছে না জাপা

 প্রকাশিত: ২১:৪৯ ২৩ মার্চ ২০১৮   আপডেট: ০২:০৪ ২৪ মার্চ ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ভোটের বছর বেশ তোড়জোড় জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক তৎপরতায়। দলীয় এমপিদের আসনসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মীসভা, উঠান বৈঠক ও সমাবেশ আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছে এরশাদের দল। শুধু তাই নয়, রংপুর সিটি নির্বাচন ও সবশেষ গাইবান্ধা ১ আসনে জয় লাভ করায় হালে যেন নতুন পানি পেয়েছে সংসদে বিরোধী দল জাপা।

তার উপর সংসদে দলের কো চেয়ারম্যান আর বাইরে চেয়ারম্যান মন্ত্রীসভা থেকে দলীয় সদস্যদের শিগগিরই পদত্যাগ করবেন এমন বক্তব্য একই সুরে দেয়ায় খানিকটা নরেচড়ে বসেন সমালোচকরাও। আর তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে দলীয় নেতাকর্মীরাও উঠে পড়ে লাগেন নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণে।

জাতীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে মাঠে নেমেই ৫ লাখ লোকের সমাবেশের ঘোষনা দেন এরশাদ। শনিবার (২৪ মার্চ)সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হবে জাতীয় পার্টির কাঙ্খিত সেই মহাসমাবেশ। আয়োজনের সব প্রস্তুতিও প্রায় সম্পূর্ণ।দলীয় হাকডাক দেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতুহল সমাবেশ থেকে কি বক্তব্য দেবেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দিক বদল নাকি দিন বদল? কোন ঘোষনা দেবেন তিনি এমন প্রশ্নও জেগেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে। আর নিজে বিশেষ দূতের পদ থেকে কেনইবা মন্ত্রীসভা থেকে দলীয় সদস্যদের পদত্যাগের কথা বলছেন বার বার। কয়েকদিনের কথা বলে সেই পদত্যাগ হবে কবে? এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দলীয় শীর্ষনেতাদের,গতাগনুগতিক পথেই হাটবে জাপা। মন্ত্রিসভা সভা ছাড়ছে না।    

তবে গতানুগতিক হলেও শনিবারের মহাসমাবেশকে গুরুত্বপূর্ণ বলছেন জাপার নীতি নির্ধারকরা।  তাদের মতে, নির্বাচনের বছর এর মাধ্যমে দলের শক্তিমত্তার পরিচয় দেয়া হবে। শনিবার বেলা ১১টায় মহাসমাবেশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ শীর্ষ নেতারা বক্তৃতা করবেন সমাবেশে।

মহাসমাবেশ বর্ণাঢ্য করতে নেয়া হয়েছে সব ধরনের প্রস্তুতি। মঞ্চ নির্মাণের কাজে এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে মাঠ। শাহবাগ থেকে প্রেসক্লাব, মৎসভবন থেকে কাঁকরাইল  পর্যন্ত এরশাদের ছবি সংবলিত নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো এলাকা।৮০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রস্থ মূল মঞ্চের পাশাপাশি আরো ২টি মঞ্চ তৈরী করা হয়েছে। মূল মঞ্চের কয়েক ফুট দূরেই রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ। সমাবেশের শুরুতে যেখান থেকে গাওয়া হবে দলীয় সংগীতসহ ৮৮ সালের বন্যায় ব্যাপক জনপ্রিয় এরশাদের গান। এছাড়া বিভিন্ন সময় এরশাদ ও তার শাসনামলের উন্নয়ন নিয়ে লেখা গানও পরিবেশন করা হবে এ মঞ্চ থেকে। 

এদিকে সমাবেশ সফল করতে গেলো কয়েকদিন রাজধানীসহ সারাদেশে কেন্দ্রীয় শীর্ষনেতারা বিভিন্নস্থানে লিফলেট বিতরণ করেন।

মহাসমাবেশ সফল করতে দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, এবারের মহাসমাবেশটি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এদিন ঢাকা থাকবে জাতীয় পার্টির দখলে। জাতীয় পার্টির শক্তি ও সামর্থ্যের বিষয়টিও জানান দেয়া হবে সমাবেশের মধ্য দিয়ে।

জাপা মহাসচিব ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের সামনে এখন একটাই লক্ষ্য-তা হচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নেয়া। যেহেতু নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই, দেখতে দেখতে সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাই আমরা নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছি।

তিনি আরো বলেন,নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই শনিবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ হচ্ছে। এটি হবে স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশ। প্রায় পাঁচ লাখ লোক এতে সমবেত হবে। কেবল পার্টির শক্তি এবং সামর্থ্য জানান দিতেই নয়, আরো বেশ কিছু কারণে এই মহাসমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে জোর দাবি করেন হাওলাদার।

এদিকে ভোটের মাঠে সফল হতে একাধিক পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগোচ্ছে জাপা।  আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও বিএনপি’র ২০ দলীয় জোটের বাইরে নিজেদের জোটকে নিয়েই ভোটে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা সাজাচ্ছে তারা। তাই ভোটের প্রস্তুতি হিসেবে আগে দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ।

দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিইউ তাজ রহমান বলেন, নব্বইয়ের পর এবারই সবচেয়ে বেশি সুসময় অপেক্ষা করছে জাতীয় পার্টির সামনে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে দলটির মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করলেও, এবার আর সেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। কে অংশ নিল, আর কে নিল না- এ চিন্তা মাথায় না নিয়ে আগামী নির্বাচনে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াইয়ের কথা ভাবছে জাতীয় পার্টি।

তিনি বলেন, সে অনুযায়ী দল গোছানো, প্রার্থী ঠিক করা, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে পার্টিকে শক্তিশালী করাসহ নানা উদ্যোগ চলছে। তৃণমূলে পার্টি এবং প্রার্থীর অবস্থান জানার জন্য এবারই প্রথম মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালিয়েছে তারা।

জাতীয় পার্টির একাধিক নেতা জানান, সমাবেশ সফল করতে মূল দল জাতীয় পার্টি ছাড়াও এরশাদের ভ্যানগার্ড খ্যাত যুব সংহতি,জাতীয় মহিলা পার্টি, শ্রমিক পার্টি, কৃষক পার্টি,স্বেচ্ছাসেবক পার্টি, ওলামায়ে পার্টি, ছাত্রসমাজসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং উত্তর ছাড়াও দোহার, নবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও, নরসিংদী, সাভার, ধামরাই, কালীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী মহাসমাবেশে অংশ নেবেন বলে জানান কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা।

এ ছাড়া বরিশাল, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বাস, ট্রেন এবং লঞ্চে করে নেতাকর্মীরা মহাসমাবেশে যোগ দিতে এরইমধ্যে ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন।  মহাসমাবেশে বা নগরীতে যাতে কোনো ধরনের নাশকতা না হয় এ জন্য নেয়া হয়েছে বাড়তি পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জাতীয় পার্টির একাধিক নিজস্ব টিম নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করবে। তাছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসা নেতাকর্মীদের যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়,তা দেখভাল করার জন্যও একাধিক টিম গঠন করা হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেশ কয়েকদিন আগে অনুষ্ঠিত এক প্রেসিডিয়াম সভায় বলেছেন, নানা কারণেই এবারের মহাসমাবেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ মহাসমাবেশের মধ্যদিয়ে আগামী নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে। আগামী দিনে আমরা এককভাবে নির্বাচনে যাব। আর কারো সঙ্গে জোট নয়। তবে কেউ চাইলে আমাদের সঙ্গে আসতে পারে। এজন্য আগে পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই মানুষ আমাদের দিকে এগিয়ে আসবে।

অন্যদিকে এরশাদের জোটভূক্ত দলের নেতা সেকেন্দার আলী মনি বলেন, মহাসমাবেশ থেকে জয় যাত্রার সূচনা হবে। ২১ জেলা থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা সমাবেশে অংশ নেবেন। ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়ে এই জোট নেতা বলেন,এরশাদের পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরী করা হচ্ছে।

ইসলামি ফ্রন্টের মহাসচিব এমএ মতিন বলেন,সমাবেশ সফল করার মধ্যদিয়ে হিংসাত্বক রাজনীতির বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়া হবে।

ইসলামী মহাজোট চেয়ারম্যান মাওলানা আবু নাছের ওয়াহিদ ফারুক বলেন,আগামীতে শান্তিপূর্ণ দেশ জাতিকে উপহার দিতেই রাজনৈতিক দায় পালন করা হবে।আর সে কারণেই শনিবারের মহাসমাবেশের মাধ্যমে এরশাদের নের্তৃত্বে জনগণের কাঙ্খিত পরিবর্তনের সূচনা করা হবে।

এদিকে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শুক্রবার বিকেলে মঞ্চ এলাকা পরিদর্শন করেন। প্রস্তুতির বিষয়ে খোঁজখবর নেন।

জাতীয় পার্টির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির গুরুত্ব বাড়াতে সম্প্রতি ৫৮ দলীয় জোট গঠন করেন এরশাদ। হেফাজতে ইসলামের সমর্থন আদায়েও দলটি কাজ করছে। সমর্থন পেলে ভোটের মাঠে প্রধান দু’দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির জন্য বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে জাতীয় পার্টি। এ কারণেই ২৪ মার্চ মহাসমাবেশ কিছুটা হলেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বছরের প্রথম দিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন ছোট পরিসরে শেষ করলেও,ঘোষনা অনুযায়ী ১৫ ফেব্রুয়ারি সমাবেশ করা হয়নি বই মেলার অজুহাতে। বছরের শুরুতে প্রতিশ্রুতি আর কর্মসূচি দুটোতেই সমালোচকের তির্যক মন্তব্য থেকে ছাড় পাননি এরশাদ। না বুঝেই কর্মসূচি আবার দিশা পেয়ে সমাবেশের তারিখ পরিবর্তন,যেন অপরিপক্ক রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয়। সমালোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত মূলত নির্বাচনে দলীয় গুরুত্ব বাড়াতেই এরশাদের সব কৌশল।

ডেইলি বাংলাদেশ/ডিএম/এলকে