মহামারি জয়ের স্মৃতি স্তম্ভ ‘প্লেগ কলাম’

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মহামারি জয়ের স্মৃতি স্তম্ভ ‘প্লেগ কলাম’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৯ ২০ মে ২০২০   আপডেট: ১৮:২৮ ২০ মে ২০২০

ছবি: প্লেগ কলাম

ছবি: প্লেগ কলাম

বিশ্বব্যাপী অসংখ্য স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। সাধারণত ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা স্মরণ রাখতেই স্তম্ভ নির্মিত হয়। যাতে পরবর্তী সময়েও সেই চেতনা জাগ্রত হয়। একটি বিশেষ দিন বা সময়ে সেই স্মৃতি স্মরণ করে বিভিন্নভাবে উদযাপন করা হয়। 

সাধারণত যুদ্ধ জয়ের স্মৃতিগুলো অনেক বেশি উদযাপিত হয়। তবে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া কোনো রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি বা এই ব্যাধি জয় করাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতে মহামারির প্রকোপে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হত। মানুষে সে সময় মহামারি থেকে মুক্তির উপায় খুঁজত হন্যে হয়ে। 

নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী মুক্তির জন্য প্রার্থনা করত। অনেক সময় স্রষ্টার উদ্দেশ্য নৈবেদ্য প্রদানের শপথ করেও মহামারি থেকে মুক্তি প্রার্থনা করত। যেমন ১৬২৯ থেকে ১৭৯১ খিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়া ইতালীয় প্লেগ থেকে মুক্তির পর ভেনিসের সান্তা মারিয়া ডেলা স্যালুটের মতো বড় বড় গির্জা নির্মাণ করেছিল কয়েকটি শহরে। 

মধ্য যুগের প্লেগ মহামারি থেকে মুক্তির পর ভিক্টরি কলামও নির্মিত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক বিখ্যাত অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের প্লেগ কলাম। যা পেস্টসিউল নামেও পরিচিত। দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত ভিয়েনা। শহরটি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে একটি প্রধান বাণিজ্য পথ ছিল। 

চতুর্দশ শতক থেকে ছড়িয়ে পড়া প্লেগ মহামারিতে আক্রান্ত হতে থাকে ভিয়েনাবাসী। বণিকদের শহর হওয়ায় ভিয়েনার নদী উপকূলীয় শহরগুলোতে পোশাক, কার্পেট এবং শস্যের মতো পণ্য কয়েক মাস ধরে গুদামজাত করে রাখা হত। গুদামগুলোতে সে সময় প্রচণ্ড ইঁদুরের উৎপাত চলত। শহরটি খুবই ঘন বসতিপূর্ণ ছিল কিন্তু কোনো নর্দমা বা পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল না। 

জনগণ বর্জ্য নদীতে ফেলত কিংবা রাস্তায় জমা করে রাখত। যে কারণে শহরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। মধ্যযুগে গোটা ইউরোপ জুড়ে জীবনযাত্রা অস্বাস্থ্যকর ছিল। এজন্য সেখানে বারবার প্লেগ মহামারির প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৬৭৯ সালে ভিয়েনায় প্লেগ মহামারির প্রকোপ দেখা দেয়।

প্লেগ মহামারি জয়ের স্মৃতিস্মারকএসময় ভিয়েনা অস্ট্রিয়ান হাবসবার্গ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। অন্যান্য সব মহামারির মতো প্লেগও দরিদ্র জনগণের বসতি অঞ্চলে প্রথম ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ধনী জনগণ অধ্যুষিত অঞ্চলে এর প্রকোপ দেখা দেয়। সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাবসবার্গের সম্রাট প্রথম লিওপোল্ড শহর ছেড়ে পালিয়েছিলেন। 

জনগণের দুর্দশা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্লেগ মাহামারিতে ভিয়ানায় মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহ হারে বৃদ্ধি পায়। শহরের মোট এক লাখ ১০ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে ৭৬ হাজার জনগণের মৃত্যু হয়। শহরের বাইরে বড় বড় গর্তে ফেলে মৃতদেহগুলো পোড়ানো হয়েছিল। সংক্রমণের ভয়ে স্বেচ্ছায় কেউ সৎকারেও এগিয়ে আসতে চায়নি। 

অবশেষে, আজীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মুক্ত করে এই কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রচণ্ড চিকিৎসক সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। অনেক সময় চিকিৎসকদের বেঁধে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো। প্লেগ মাহামারি থেকে মুক্ত হওয়ার পর ভিয়েনা নগর কর্তৃপক্ষ হলি ট্রিনিটির প্রতি উৎসর্গ করে একটি প্লেগ কলাম স্থাপন করে। 

প্রথমে কাঠের তৈরি ভাস্কর্যে নয়টি দেবদূতের মূর্তি স্থান পেয়েছিল। ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্লেগ কলামটি পাথর দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে অস্ট্রিয়ান অনেক শহরে প্লেগ কলাম নির্মিত হয়েছিল। প্রথম দিকে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হলেও পরবর্তীতে পাথরের স্থায়ী স্মৃতি হিসেবে প্রতিস্থাপিত হয়। এর ধর্মীয় গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। 

প্লেগ কলামগুলো জনপ্রিয় শৈল্পিক ফর্মে পরিণত হয়েছিল। বেশিরভাগ কলামের নকশা করেছিলেন ইতালিয়ান স্থপতি ও ভাস্কর লুডোভিচি বার্নাসিনি এবং অস্ট্রিয়ান ভাস্কর জোহান বার্নহার্ড ফিশার ফন ভন এরলাচ। ভিয়েনার প্লেগ কলামের ভিত্তির নকশা করেছিলেন ফিশার। বার্নাচিনি উপরের অংশের নকশা করেছিলেন। যেখানে হলি ট্রিনিটির নিচে দেবদূতের ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে।

এর পাশেই সাম্রাট লিওপোল্ডের হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করার ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের কয়েকটি শহরেও প্লেগ কলাম নির্মত হয়েছে। স্লোভাকিয়ায় ১৭০৯ থেকে ১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্লেগের সমাপ্তির স্মৃতিস্বরূপ কোয়েসি শহরে একটি প্লেগ কলাম নির্মিত হয়েছিল। বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের কুতান হোরাতে এসময় একটি প্লেগ কলাম নির্মিত হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস