মহামারি স্প্যানিশ ফ্লু থেকে বাঁচতে ব্যবহৃত হয়েছিল নিষিদ্ধ পানীয়!

ঢাকা, সোমবার   ২৫ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭,   ০২ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মহামারি স্প্যানিশ ফ্লু থেকে বাঁচতে ব্যবহৃত হয়েছিল নিষিদ্ধ পানীয়!

মো. হাসানুজ্জামান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩০ ৩ মে ২০২০   আপডেট: ১৬:২১ ৩ মে ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

অজানা কোনো রোগ মাহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে যেকোনো জাতিই অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কীভাবে রোগটি প্রতিরোধ করা যাবে? তার চিকিৎসা কি? এর প্রতিষেধক কিভাবে আবিষ্কৃত হবে? এ সব কিছুই পুরো জাতিকে ভাবিয়ে তোলে। 

জনগণের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ভীতি জেগে বসে। তারা অনেক সময় ভুল কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিও বিশ্বাস যোগ্য হিসেবে বিশ্বাস করতে থাকে। বিশ্বের ইতিহাসের ভয়াবহ প্রাণঘাতী মাহামারিগুলোর মধ্যে অন্যতম ১৯১৮ সালে ছড়িয়ে পড়া স্প্যানিশ ফ্লু। তখনো করোনার মতোই প্রাণঘাতী স্প্যানিশ ফ্লু থেকে বাঁচতে বিশ্ববাসী অসামঞ্জস্যপূর্ণ ওষুধের উপর বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল।

১৯১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে বিশ্বব্যাপী। পুরো জাতির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল। তারা হন্যে হয়ে এই ব্যাধি থেকে পরিত্রানের সন্ধানে ছিল। এমন সময় তাদের সামনে একটি খুবই পরিচিত বস্তু প্রতিকার হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের এই ওষুধ ছিল হুইস্কি। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে হুইস্কির কার্যকারিতার কোনো প্রমাণিত ভিত্তি ছিল না। হুইস্কি প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা ছিল। 

স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়েতখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি অঙ্গরাজ্যে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সুতরাং মদ পাওয়াটাও প্রায় অসাধ্য কাজ ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অঙ্গরাজ্যে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সেগুলোকে ‘ড্রাই স্টেট’ হিসেবে অভিহিত করা হত। প্রাণঘাতী ফ্লু থেকে বাঁচতে সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ড্রাই স্টেটের’ নাগরিকরা হুইস্কি অনুমোদনের আর্জি জানায়। 

এই সুযোগে কিছু তীক্ষ্ণ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা একটা সমাধানের পথ বাতলে দেয়। যা অনেকটা কৌশলী ছিল। এসব ঘটনার মধ্যেই পুরো যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী খবর প্রকাশিত হয় যে, সামরিক ডাক্তাররা ফ্লু আক্রান্তদের চিকিৎসায় বাজেয়াপ্ত করা হুইস্কি দিচ্ছেন। সাংবাদিকরা এর পক্ষে বেশ কিছু প্রমাণও উপাস্থাপন করেন। তবে এর আগেই কর্মকর্তারা বেসামরিক হাসপাতালের জন্যেও বুটলেগ হুইস্কি দিচ্ছিলেন। 

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওমাহা ও নেব্রাস্কার হাসপাতালগুলো স্থানীয় প্রশাসকদের পক্ষ থেকে ৫০০ গ্যালন হুইস্কি পেয়েছিলেন। ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিষেবার কমিশনার তখন উত্তর ক্যারোলাইনের রাজস্ব এজেন্টদের বাজেয়াপ্ত করা হুইস্কি রাজ্যের আশেপাশের হাসপাতালে বিতরণ করার আদেশ দেন। 

পত্রিকায় উঠে আসে ওষুধ হিসেবে হুইস্কির বিষয়টিহুইস্কির ওষুধি কার্যকারিতা সম্পর্কে চিকিৎসকদের মতভেদ  

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্য রোগের ক্ষেত্রে হুইস্কির কার্যকারিতা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা সংক্রান্ত শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ফার্মাকোপিয়া ১৯১৬ সালে হুইস্কি, ব্রান্ডি এবং ওয়াইন ওষুধের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল। যার বিপক্ষে আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনের কিছু প্রতিনিধি মতামত দিয়েছিলেন। 

এর একবছর পর অর্থাৎ ১৯১৭ সালে মতবিরোধের ক্ষেত্রে ওষুধ হিসেবে হুইস্কি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দেয়া হয়। তারা ওষুধ হিসেবে চিকিৎসকদের অ্যালকোহলের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারপরও অনেক চিকিৎসক ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি এবং অন্যান্য অসুস্থতার জন্য বিস্তৃত আকারে ওষুধ হিসেবে হুইস্কির পরামর্শ দিতে থাকে। আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন ১৯২২ চিকিৎসকদের উপর একটি জরিপ চালায়। সেখানে উঠে আসে ৫১ শতাংশ চিকিৎসক মনে করেন, হুইস্কি চিকিৎসার জন্য সহায়ক।

তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক চিকিৎসকের বিশ্বাস ছিল, দুর্বল রোগীর হৃৎপিণ্ড এবং শ্বাস প্রশ্বাস প্রক্রিয়া উদ্দীপ্ত করে মদ। আবার কারো মতে, অ্যালকোহলে বিদ্যমান ঘুমের প্রভাব রোগীদের যন্ত্রণা প্রশমন করে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের যে সব অঙ্গরাজ্যে অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় নিষিদ্ধ ছিল, সে রাজ্যগুলোতেও চিকিৎসকরা প্রায়শই প্রেসক্রিপশনে ওষুধ হিসেবে হুইস্কির পরামর্শ দিতেন। অন্যদিকে ফার্মাসিস্টরা নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধসহ মদ সরবরাহ করত। 

ফ্লু থেকে বাঁচতে অনেকেই তখন মদ কিনে সংরক্ষণ করে রাখে, তবুও শেষ রক্ষা হয়নি!উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কলোরাডা এবং মিশিগান অঙ্গরাজ্যের চিকিৎসকরা শর্ত সাপেক্ষে চার ও আট আউন্স পর্যন্ত প্রেসক্রিপশনে লিখতে পারতেন। ইন্ডিয়ানাতে চিকিৎসকরা শুধু খাঁটি শস্যের অ্যালকোহল লিখতে পারতেন। যেসব শহরে হুইস্কি বিষয়ে বিধি-নিষেধ ছিলনা সেখানে সরাসরি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে হুইস্কি দেয়া হত। যেমন- মহামারি জরুরি অবস্থার মধ্যে বার্লিংটন এবং ভার্মেন্টের স্থানীয় পুলিশ বিভাগ এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। 

ন্যাশভিলের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার মানুষকে প্রেসক্রিপশনসহ আধা পাইট করে হুইস্কি বিতরণ করেছিল।চিকিৎসকদের অনেকেই লাভের জন্য প্রেসক্রিপশনে হুইস্কি পরামর্শ দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকত। ১৯১৯ সালে রোগীদের কাছে হুইস্কি বিক্রয়ের জন্য চারজন চিকিৎসক এবং একজন ওষুধ বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা প্রতিটি প্রেসক্রিপশনে হুইস্কির পরামর্শ দেয়ার জন্য এক মার্কিন ডলার পেতেন। অন্যদিকে ওষুধ বিক্রেতারা পেতেন পাঁচ মার্কিন ডলার। 

হুইস্কি বিক্রির এই চক্র এতোটাই সফল হয়েছিল যে, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। এরপর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য স্থানীয় বুটলেগাররা হুইস্কির মূল্য হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছিল। যে রাজ্যগুলোতে হুইস্কির অনুমোদন ছিল সেখানে অনেকেই মহামারি থকে রক্ষা পেতে অতিরিক্ত পরিমাণ হুইস্কি কিনে রেখেছিল। যদিও এর কার্যকারিতা পরীক্ষিত ছিল না। তারপরও স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সময় লাভের জন্য অনেক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালকোহলযুক্ত দ্রব্য প্রস্তুত করতে থাকে।  

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস