ঢাকা, রোববার   ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৪ ১৪২৫,   ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪০

মহাবিশ্বের প্রথম মৌল!

সালমান আহসান নাঈম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৩ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৩:৩৩ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৯০ শতাংশ হাইড্রোজেন। যার গল্প শুরু অন্যসব পদার্থের আগে এবং বিগ ব্যাংয়ের ৩লাখ ৭৯হাজার বছর পরে। যখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ঘন ও প্লাজমা অবস্থার প্রোটন, ইলেকট্রন ও ফোটন ঠাণ্ডা হচ্ছিলো এবং মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছিলো, তখন ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্র হয়ে তৈরি হলো হাইড্রোজেন। এভাবে পেরোলো ৪০লাখ বছর।

হাইড্রোজেন গ্যাসের মেঘ মহাকর্ষের টানে কোথাও কোথাও একত্র হলো। তাদের সংঘর্ষে উৎপন্ন হলো তাপ। জন্ম হলো প্রথম নক্ষত্র। যে ঘটনা না ঘটলে মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে হতে ঠাণ্ডা হয়ে যেতো। প্রাণ বেঁচে থাকার মতো কোনো পরিস্থিতিই আসতো না। আরো ভয়ঙ্কর হতো মহাবিশ্বে যদি শুধু হাইড্রোজেন আর অল্প কিছু হিলিয়াম ও লিথিয়ামই থাকতো। এরপর তারাদের নিয়মিত জন্ম হয়েছে হাইড্রোজেন মেঘ থেকে। তাদের সংঘর্ষে তৈরি হওয়া তাপে শুরু হয়েছে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া। হাইড্রোজেন থেকে তৈরি হলো হিলিয়াম। এরপর অন্য সব পদার্থ।

হাইড্রোজেন জগতের গল্পটা ৪৪০ কোটি বছর আগের। যখন পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমে হয়েছে ১০০ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম। ডাই হাইড্রোজেন অক্সাইড বাষ্প থেকে তরল হতে শুরু করলো। যাকে আমরা এখন বলি পানি।

মহাবিশ্বের ৯০ শতাংশ হাইড্রোজেনের উপস্থিতি ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আমাদের শরীরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরমাণুই হলো হাইড্রোজেন। পর্যায় সারণির প্রথম মৌল হাইড্রোজেনের নানা গুণ রয়েছে। কিন্তু প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি শক্তির এক অফুরন্ত আঁধার। পৃথিবীর শক্তির প্রধান উৎস সূর্য কিন্তু শক্তি পাচ্ছে হাইড্রোজেন পুড়িয়ে, হিলিয়াম বানিয়ে। সাড়ে ৪শ কোটি বছর আগের পৃথিবীতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াল এনজাইম ছিলো, যার নাম হাইড্রোজিনেস। এরা হাইড্রোজেন অণু বা পানি থেকে শক্তি উৎপন্ন করতো। সেই থেকে হাইড্রোজেনের শক্তি ব্যবহার শুরু।

হাইড্রোজেন বাতাসে পুড়তে পারে-এই তথ্যটি বিজ্ঞানী ভন হেলমন্ট প্রথম আবিষ্কার করেন। ১৬৭১ সালে রবার্ট বয়েল দেখলেন, এসিডের মধ্যে লোহার টুকরা ফেললে তা থেকে গ্যাস বের হয়। এরপর ক্যাভেন্ডিস দেখলেন, এই গ্যাস অন্যসব গ্যাস থেকে আলাদা। এর নাম দিলেন অদাহ্য বাতাস। এই অদাহ্য বাতাস অক্সিজেনে পোড়ালে তৈরি হয় পানি। ততদিনে কিন্তু পানির গুরুত্ব সবাই জানতো। এই আবিষ্কার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৭৮৩ সালে ল্যাভয়সিয়ে এই অদাহ্য গ্যাসের নাম দিলেন হাইড্রোজেন(Hydro-gen) বা পানি উৎপাদক।

উল্টোদিকে ১৮০০ সালে নিকলসন ও কার্লাইল তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পানি ভেঙ্গে উৎপন্ন করলেন হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন। হাইড্রোজেন উৎপন্ন করতে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই কাজটি করেন। তবে এক্ষেত্রে তাদের মূল লক্ষ্য যতো কম বিদ্যুৎ খরচ করে তা করা যায়। বর্তমানে ব্যবহৃত হয় আলোক রাসায়নিক ক্রিয়া।

উৎপন্ন হাইড্রোজেন গ্যাস শক্তির অন্যতম উৎস। খুবই হালকা হলেও এটি জ্বালানি হিসেবে একেবারে আদর্শ। জ্বালানি হিসেবে অক্সিজেনের সঙ্গে হাইড্রোজেন পোড়ালে উৎপন্ন হয় পানি। পরিবেশের উপর তাই কোনো খারাপ প্রভাবই পড়ে না, অন্য জ্বালানির ক্ষেত্রে যা এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। ১৭৮৩ সালে মানুষ যখন প্রথমে বেলুনে করে আকাশে উড়েছিলো, তখন এতে ব্যবহার করা হয়েছিলো হাইড্রোজেন। আক্ষরিক অর্থেই হাইড্রোজেনে ভর করে মানুষ অজানার উদ্দেশ্যে ছুটেছে।

১৯৭০ সালে ফিলিপস রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে দুর্ঘটনাক্রমে আবিষ্কার হলো, ধাতুর ওপর হাইড্রোজেন শোষণ করে তা হাইড্রাইড হিসেবে আলাদা করা সম্ভব। এ আবিষ্কার তড়িৎ রাসায়নিক হাইড্রোজেন ব্যাটারির নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছিলো। ১৯৯৭ সালে জাপানে প্রথম নিকেল ধাতব হাইড্রাইড ব্যাটারির গাড়ি রাস্তায় নামে। দিন দিন উৎকর্ষ বাড়তে লাগলো হাইড্রোজেন-অক্সিজেন ফুয়েল সেলের। এমনিতে সাধারন ব্যাটারিতে কঠিন পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় ইলেকট্রন। ফুয়েল সেলে কঠিন পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় প্রোটন। আস্তে আস্তে এই প্রোটন পরিবাহীর সক্ষমতাও বাড়ছে।

বিজ্ঞানীরা পৌঁছে গেলেন ১৮৭৪ সালে লেখা জুল ভার্নের গল্প দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড'-এর জ্বালানির কাছাকাছি। যে জ্বালানি হবে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের, আলো আর তাপের অফুরন্ত উৎস। পারমাণবিক(H) ও আণবিক(H2) হাইড্রোজেন অন্য সব অণু-পরমাণুর চেয়ে সরল। তাই তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কারের পর থেকে গত শতাব্দীজুড়ে হাইড্রোজেনকে ব্যবহার করেছেন মডেল হিসেবে। কোয়ান্টাম মেকানিকাল মডেল এবং ধারণাগুলো তাই অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে হাইড্রোজেনের ওপর। রসায়নে হাইড্রোজেনের অবস্থান অনন্য। এর জারণ অবস্থা হতে পারে -১( হাইড্রাইড) ০(পারমাণবিক) বা +১(প্রোটন)। প্রতিটি জারণ অবস্থার জন্য রয়েছে একদমই আলাদা সব ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য। এমনিতে আণবিক হাইড্রোজেন(H2) প্রায় নিষ্ক্রিয় পদার্থ।

১৯৮৪ সালে কুবাস দেখান যে, হাইড্রোজেন অবস্থান্তর মৌলের সঙ্গে সন্নিবেশ সমযোজী বন্ধন গঠন করতে পারে। অন্যদিকে হাইড্রাইড অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষার ও বিজারক। আবার প্রোটন হলো শক্তিশালী এসিড ও জারক। আসলে এসিড আর ক্ষারের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার অন্যতম একটা ভিত্তি হাইড্রোজেন। ব্রনস্টেড-লাউরি তত্ত্ব অনুযায়ী এসিড ক্ষারের বিক্রিয়া হলো প্রোটন আদান-প্রদানের বিক্রিয়া।

পর্যায় সারণির প্রথম মৌল বা মহাবিশ্বের প্রথম মৌল হিসেবেই শুধু হাইড্রোজেন-এর গুরুত্ব নয়, এই মুহূর্তে আমাদের পৃথিবীর সাসটেইনেবল জ্বালানির এক বড় ভরসার নাম হাইড্রোজেন। ভবিষ্যতে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে বিশেষভাবে প্রয়োজন হবে হাইড্রোজেনের।

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে