‘মহানির্মাণ’-এর নির

ঢাকা, শুক্রবার   ২৯ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৭,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবনের আলোকে রচিত উপন্যাস 

‘মহানির্মাণ’-এর নির

অমিত গোস্বামী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১৬ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

(বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোটবেলা থেকে সম্পৃক্ততা ছিল কলকাতার সঙ্গে। কলকাতায় সাত বছর ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনের মহানির্মাণ পর্ব তার কলকাতায়। ‘মহানির্মাণ’ উপন্যাসে অমিত গোস্বামী লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর মহানির্মাণ পর্ব। আর আমরা আজ শুনব এই উপন্যাসের নির্মাণ কাহিনী)

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব এক বৈপ্লবিক আত্মপ্রকাশ। বাংলাদেশের বাঙালি তো বটেই ভারতের বাঙালিও এই মানুষটির প্রসঙ্গ উঠলে ধর্ম নীতি বা বিশ্বাস দূরে সরিয়ে দিয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন। মূল কারণ তার অর্জন। ভারত সাহায্য করেছিল এ কথা মেনে নিয়েও বলা যায় একটা দেশের জন্ম দেয়া একজন নেতার একক কৃতিত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় দুর্লভ। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে কারণ বর্ণনা করে প্রচুর শব্দ খরচ করা হয়ে গেছে এর মধ্যে। বঙ্গবন্ধুর জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এতজন এতভাবে করেছেন যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু লেখা নিতান্তই চর্বিতচর্বন হয়ে যাবে বলে আমার মনে হতো। তার ওপরে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তার সাহিত্যিক মুন্সিয়ানা বিস্ময়করভাবে প্রতিভাত। শহীদ আলতাফ মাহমুদের ও সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জীবনকাহিনী নিয়ে উপন্যাস ‘আলতাফ’ ও ‘হুমায়ূন’ লিখে ফেলেছি ঠিকই কিন্তু সেখানে তাদের পরিবারের সাহায্য ছিল। আলতাফ মাহমুদ বা হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের কৃতী সন্তান হলেও জাতির পিতা বা আপামর বাঙালির আবেগের মূল উৎসস্থল ছিলেন না। এহেন জাতির পিতার জীবনের কোনো অংশ নিয়ে লেখার ন্যূনতম স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা আমার ছিল না। সে স্বপ্ন দেখিনি কোনোদিন।

কিন্তু এই স্বপ্ন আমায় দেখালেন বাংলাদেশের এবং অবশ্যই ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় কবি কামাল চৌধুরী। যারা কবিতা লেখেন বা সাহিত্য করেন তাদের দল বা গোষ্ঠী থাকে। আমাদেরও আছে। কলকাতায় আমরা বাংলাদেশের সমসাময়িক যত কবিদের (কবি নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরীদের বাদ রাখছি) কবিতা পড়ি তার মধ্যে কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা কোথায় যেন আমাদের মতো। চট করে হৃদয়ে বসে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে আমরা তার গুণগ্রাহী। কিন্তু সমস্যা আমাদের সবসময় একটা জায়গায়। তাকে নিজেদের মধ্যে পাওয়া। কারণ তার ব্যস্ততা। কিন্তু একবার আমি ঢাকায় যাওয়ার পরে তিনি অসুস্থতার কারণে গৃহবন্দি ছিলেন দিনকয়েক। আমায় ডেকে নিলেন তার বাসায়। সকাল সকাল হাজির। বাসায় কেউ নেই। 

প্রাতরাশের পরে প্রায় তিন ঘণ্টা আড্ডা চলল। তিনি তখন আমায় স্বপ্নটা দেখালেন। যে বিষয় নিয়ে আমায় ভাবতে বললেন তা হলো বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সম্পৃৃক্ততা এবং তার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উত্থানের পেছনে কলকাতা ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের ভ‚মিকা। কাজটা তখনকার মতো মনে হলো অসম্ভব। কারণ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি কলকাতার জীবনের বেশ বিশদেই বর্ণনা করেছেন। আমি আর নতুন কী বলব! কিন্তু কামাল ভাই আমাকে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। সত্যিই তো, পড়তে তো ক্ষতি নেই।

আবার শুরু করলাম ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। তবে এবার দৃষ্টিকোণ ছিল চুলচেরা বিচারের। পড়তে পড়তে আবিষ্কার করলাম বেশ কিছু জায়গা যাকে মিসিং লিঙ্ক বলা যায়। যেমন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান যে শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুকে গড়ে তুলেছিলেন তা প্রগতিবাদী সংস্কারহীন শিক্ষা। এই মননের মুসলমান নাগরিকরা সে সময়ে জাতীয়তাবাদী হতেন অর্থাৎ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থক হতেন। কিন্তু তিনি কেন শুধুমাত্র মুসলমানদের হিতার্থে সারাজীবন এত কষ্ট সহ্য করলেন। তিনি অবশ্যই ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কখনোই সা¤প্রদায়িক ছিলেন না। এর উত্তর পেতে গেলে সে সময়ের অবিভক্ত বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করতে হবে। ব্রিটিশ ভারতে কর আদায় হতো পূর্ববঙ্গ থেকে, কিন্তু উন্নয়ন হতো পশ্চিমে। নবাবী আমলের অবসান হওয়ার পরে সরকারের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় মুসলমানরা। ইংরেজি প্রথাগত শিক্ষাগ্রহণে তারা অনিচ্ছুক ছিল যা তাদের ঠেলে দেয় দারিদ্র্যের গভীর গাড্ডায়। এহেন সমাজের একটা অংশ যারা ধর্মীয়ভাবে মুসলমান তাদের প্রয়োজন ছিল মূল স্রোতে ফিরে আসা। একদিকে সে উদ্যোগ নেয়া ছিল জরুরি। তাই এম ই স্কুল যেখানে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা শুরু সেই স্কুল প্রতিষ্ঠায় শেখ লুৎফর রহমানের অবদান ছিল যথেষ্ট। সে সময়ের সমাজে হিন্দু উচ্চপদাধিকারীর সংখ্যা ছিল বেশি। তারা মুসলমানদের কখনোই প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। সে সময়ের ভারতের মূলদল কংগ্রেস এই ব্যাপারে হিরন্ময় নীরবতা নিয়ে চলত। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানরা এ ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন বলেই প্রাণ পেয়েছিল মুসলিম লীগ। তাই শেখ লুৎফর রহমান বিশ্বাস করতেন যে মুসলমানদের ভালো করতে পারবে শুধু মুসলিম লীগ।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার পিতা-মাতার চারিত্রিক দৃঢ়তা তার চরিত্রগঠনের মূল স্তম্ভ। কিন্তু একইসঙ্গে বলতে হবে তার স্ত্রীর তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও অকুণ্ঠ সমর্থন। বিনা প্রশ্নে ভরসা রেখেছেন বঙ্গবন্ধুর সব কাজকর্মে। বঙ্গবন্ধু সবসময়েই স্থির ছিলেন তার সংকল্পে। কিন্তু তার দোদুল্যমানতা পরিলক্ষিত হয়েছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রামের প্রশ্নে। তিনি পাকিস্তানপ্রাপ্তির ব্যাপারে একবারই সন্দিহান হয়েছিলেন যখন নেতাজী আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে ভারতের দিকে আগালেন। অন্যান্য বাঙালির মতো অপেক্ষায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কী হয়! কী হয়! তিনি নেতাজীর ক্যারিশমা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন যে, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। নেতাজী শেষ যুদ্ধে পেরে ওঠেননি। কিন্তু মুজিব পেরেছিলেন তার নিজস্ব ভঙ্গিতে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজ ইউনেস্কো তথা পৃথিবীর সম্পদ। শোনা যায় যে, সেদিন তিনি কী বলবেন সেটা ঠিক করেননি আগে থেকে। হৃদয় উৎসারিত কথাগুলো তিনি বলছিলেন সেদিন। একইসঙ্গে স্মরণ করুন সুদূর জার্মানি থেকে নেতাজীর ভাষণ-বার্লিন থেকে আমি সুভাষ বলছি...। দুই ভাষণের ছাদ বা স্টাইলটা একই।

তখনকার দিনে চিকিৎসা বা অন্যান্য কাজে টুঙ্গিপাড়া থেকে কলকাতা আসা সহজ ছিল। চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ কলকাতায় বেশি। সে কারণেই বঙ্গবন্ধু ছোটবেলা থেকে বারেবারে কলকাতা এসেছেন। মূলত চিকিৎসার কারণে। তবে মেট্রিক পাস করে পরবর্তী শিক্ষাগ্রহণের জন্যে কলকাতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। আর এখানে এসে পেলেন গুরু শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। এই মানুষটি বঙ্গবন্ধুকে প্রায় হাতে ধরে রাজনীতি শিখিয়েছেন। সুযোগ দিয়েছেন বৃহত্তর অঙ্গনে। আর অসম্ভব প্রতিভাবান বঙ্গবন্ধু ক্রমাগত প্রমাণ করেছেন নিজেকে। কংগ্রেসী রাজনীতির যে বিভিন্ন দিক তাকে আহত করত তা তিনি যেমন বর্জন করেছেন তার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে ঠিক তেমনই কংগ্রেসের সাংগঠনিক গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করে তার উন্নততর প্রয়োগ করেছেন তার দলীয় গঠনতন্ত্রে। বঙ্গবন্ধু অবিভক্ত ভারতে দ্রুত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে উঠে এসেছিলেন অতি দ্রুত। তিনি অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন দেখতেন। 

এমনকি ভারত যে বিভক্ত হবে সে ব্যাপারেও তার মনে দ্বিধা ছিল। যদি সত্যি ভারত ভাগ না হতো তাহলে তিনি যে একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতেন সে কল্পনা করাই যায় তার কলকাতার রাজনীতি দেখে। কলকাতা কোন দিকে যাবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চোখের সামনে গদিলোভী বঙ্গীয় লীগ নেতাদের সঙ্গে দরাদরিতে না গিয়ে ঢাকায় প্রস্থান দেখলেন। একদিকে মুসলমানদের স্বার্থ ও নিরাপত্তারক্ষায় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিরলস প্রচেষ্টা দেখলেন আবার দেখলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার জন্যে বাঙালি লীগ নেতাদের পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে তুমুল ষড়যন্ত্র। মাঝখান থেকে কলকাতা ও পাহাড় পাকিস্তানের ভাগ্যে জুটল না। চোখের সামনে দেখলেন পশ্চিমের নেতারা পূর্বকে আরেক উপনিবেশ গড়ার জন্যে এগোচ্ছেন। তাকে ছাড়তে হলো তার প্রিয়তম শহর কলকাতা। কলকাতাকেও ছাড়তে হলো তার প্রিয়তম সন্তানকে। ঢাকা শহর তিনি চিনতেন না। সে কথা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। এই ছেড়ে যাওয়া ছিল এক তীব্র বেদনার কাহিনী। শিকড় উপড়ে ফেলা নিজের ধাত্রীভ‚মি থেকে। অন্যান্য উদ্বাস্তুদের যেমন ভিটেমাটি ছেড়ে নতুন দেশে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণাভোগ করতে হয়েছে যা নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক কাহিনী, বঙ্গবন্ধুকেও যে তীব্র জ্বালা নিয়ে কলকাতা ত্যাগ করতে হয়েছিল তার যন্ত্রণা কোনো অংশে কম ছিল না। এই যন্ত্রণার কাহিনী বিস্তারের মধ্য দিয়েই ‘মহানির্মাণ’ উপন্যাসের সমাপ্তি।

এই উপন্যাসের আরেকটি পর্ব খুব জরুরি। আমার পড়াশোনা ও সংগৃহীত তথ্য ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ যা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামক কুখ্যাত দাঙ্গা নামে পরিচিত সে সম্পর্কে যে সাক্ষ্য দেয় তা হলো দাঙ্গার প্ররোচনা ও সূত্রপাত ঘটায় হিন্দুরা এবং এর পেছনে জনৈক ভবিষ্যতে বিখ্যাত বাঙালি কংগ্রেস নেতার সুক্ষ চালে। অথচ এখনো পর্যন্ত প্রায় সব হিন্দুদের এবং বেশ বড় সংখ্যক মুসলমানদের ধারণা আছে যে,  ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু মহাসভার প্ররোচণায় গোলমালের সূত্রপাত যা দাঙ্গায় গড়ায় মুসলমানদের নৃশংস হিন্দু নিধনে এবং হিন্দুদের রক্ষাকর্তার ভ‚মিকা নেন কংগ্রেসী কিছু নেতা। কিন্তু সঠিক তথ্য একমাত্র পাওয়া যায় কলকাতার স্বরাষ্ট্র বিভাগের আর্কাইভে রক্ষিত তথ্যভাণ্ডার থেকে। কিন্তু সেই তথ্য প্রচলিত ধারণার উলটো কথা বলে। আমি লেখার প্রয়োজনে যেটুকু গবেষণার প্রয়োজন সেটুকুই করেছি। লিখছি তো উপন্যাস কাজেই দায় নেই কিছু তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত করার। তবু নতুন কোনো তত্ত্ব যখন কোনো লেখক আবিষ্কার করে তার প্রবণতা থাকে সেই তথ্যকে সূত্র সহযোগে উপস্থাপিত করার। আমি সেই ফাঁদে পা দিলাম। বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত যে তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না সেটা যখন আমি জানতে পেরেছি সেটা বলব না কেন? কিন্তু উপন্যাস অন্য কিছু দাবি করে। এখানেই আমাকে আটকালেন কবি কামাল চৌধুরী। সরাসরি বললেন- অমিত, এই জায়গাটা নিবন্ধ হয়ে গেছে। তুমি ঘটনার বিবরণ দাও গল্পের আকারে। তথ্যের বিশদ বর্ণনাকে ছেঁটে ফেলে দাও। নিজের লেখা আবার পড়তে গিয়ে দেখলাম যে, সত্যি আমি এখানে গতি হারাচ্ছি। নতুন করে লিখলাম। একবার নয়, তিনবার। কারণ এবারে পুরো উপন্যাস পড়লাম সংশোধনের পরে চারজনকে দিয়ে এবং মতামত নিলাম। কিন্তু এই তথ্যবিতরণের কুঅভ্যাস ছেড়ে উপন্যাসে ফিরে আসা কি অতই সহজ? কিছুতেই না। অবশেষে কামাল ভাইয়ের কাছে ফের পাঠালাম। তিনি তার আই-প্যাডে ডাউনলোড করে নিলেন। তিনি পাণ্ডুলিপি পড়েছেন দীর্ঘ বিমান যাত্রায়, বিদেশে মিটিংয়ের ফাঁকে, ইউরোপে বইমেলার অবসরে। কাজেই তার এই ঋণ আমাকে চিরজীবনের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে।

উপন্যাস লেখা নিয়ে অনেকের অনেক মন্তব্য দেখি। বাস্তব চরিত্র নিয়ে উপন্যাস লেখাকে অনেকেই উপহাস করে বলেন ঘটে যাওয়া ঘটনাকে সাজানো কী এমন কঠিন কাজ! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে তার বিখ্যাত তিনটি উপন্যাস যা সময় ও চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে তা লিখতে যে পরিশ্রম করেছেন সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত বলে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে মন সায় দেয় না। অনেকেই বলেন যে, মৌলিক বা কল্পনাপ্রসূত উপন্যাস অনেক বেশি কৃতিত্বের। সে রকম তিনটি উপন্যাস লিখতে আমার ৩০+২০+২০ মোট ৭০ দিন লেগেছে। কিন্তু ‘আলতাফ’, হুমায়ূন’ ও এই ‘মহানির্মাণ’ লিখতে আমার ২+২+২ মোট ৬ বছর লেগেছে। এ এক অদ্ভুত সফর। প্রতি মুহূর্তে যেন মননে দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটছে। চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বসবাস করতে হচ্ছে। ভেবেছি এক আর তথ্য জন্ম দিচ্ছে অন্য ভাবনার। নিজের কলমকে নমনীয় রাখতে হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। শুধু সত্যকে ধ্রæবক ধরে এগোতে হচ্ছে। এমন কি নিজের স্ত্রী যখন বলছেন... না, না, এরকম হতেই পারে না। তখনো আমাকে অবিচল থাকতে হচ্ছে সত্যকে কল্পনার অজুহাতে বিকৃত না করার কঠিন সংকল্পে। এই স্থির থাকার অভ্যাস কি কম কঠিন?

এবারে আসি উৎসর্গের বিষয়ে। এ এক পুরনো প্রথা। এ যেন কাউকে শ্রদ্ধা জানানো অথবা কারোর ঋণস্বীকার বা ভালবাসার স্বীকৃতি কিংবা নিছক তেল দেয়া। ‘মহানির্মাণ’ উপন্যাসটি কাকে উৎসর্গ করা যায়? আমার শ্রদ্ধার আসনে চিরদিনই আসীন শেখ হাসিনা। তাকে ছাড়া অন্য কারোর কথা ভাবতে পারিনি। কিন্তু তিনি আমায় চেনেন না। দূর থেকে আমি আমার শ্রদ্ধা জানাতেই পারি। কিন্তু সহজেই কেউ ভেবে নিতে পারেন এ নিতান্ত তৈলসিঞ্চন। তাই ব্যাপারটা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। হঠাৎ একদিন মনে হলোÑ আমি আমরা বিভিন্ন উত্তর-সম্পাদকীয় নিবন্ধে তথ্যসহকারে বারবার বলেছি যে সমকালীন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আমার চোখে তিনি সেরা নেত্রী, তাহলে আমার এ দ্বিধা কেন? কী যায় আসে তিনি আমায় চিনুন বা নাই চিনুন। তার কাছ থেকে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। দূর থেকে কি কাউকে শ্রদ্ধা জানানো যায় না? আমার শ্রদ্ধাজ্ঞাপন আমারই। কাজেই সঙ্গে সঙ্গে উৎসর্গপত্রে লিখলামÑ ‘শেখ হাসিনা শ্রদ্ধাভাজনেষু...।’

এবারে আসি প্রকাশের প্রসঙ্গে। এখানে একটা বড় ভ‚মিকা পালন করেছেন আমার বন্ধু ড. মো. আবুল হাসনাৎ মিলটন। একাধারে কবি, চিকিৎসক, সমাজ সংগঠক এবং অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি পরিষ্কার জানালেন যে উপন্যাসটা আমার বন্ধু মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন প্রকাশ করবেন। অন্বেষা প্রকাশন। একটু দ্বিধায় ছিলাম না যে তা নয়। বইয়ের বিপণনে বিরাট ভ‚মিকা থাকে বিজ্ঞাপনের। সে  ক্ষেত্রে শর্ত আমার একটাই ছিলÑ বইয়ের প্রচার যেন এমন হয় যাতে এই বই যে প্রকাশিত হচ্ছে সে খবর সিরিয়াস পাঠকের কাছে যেন পৌঁছায়। শাহাদাৎ ভাই বললেন, ব্যাপারটা আমার ওপরে ছেড়ে দিন। তাই দিয়েছি। এবার আসছে কলকাতায় কী হবে! এখানেও বঙ্গবন্ধুর গুণমুগ্ধের সংখ্যা কম নয়। বাংলাদেশে এপারের বই যত যায় ওপারের বই সেভাবে আসে না। আনাও খুব ঝক্কি শুনেছি। কলকাতায় এক তরুণ, নাম বর্ণদীপ মাত্র বছর খানেক প্রকাশনায় এসেছে। পালক প্রকাশন। সে এগিয়ে এলো। শুনলাম সে ভালো কাজ করছে। মূলত ভারতে অনলাইনে ওর বই ভালো বিক্রি হয়। তার সঙ্গে শর্ত হলো বাংলাদেশে বই পাঠাবে না। আমি রাজি হলাম।

বর্তমানে কাজ চলছে দ্রুত। কলকাতা ও বাংলাদেশে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ‘মহানির্মাণ’ পাঠকের মুখ দেখতে সক্ষম হবে এই আশ্বাস আমি প্রকাশকদের থেকে পেয়েছি। সবশেষে একটা কথা পরিষ্কার বলি যে, বাংলাদেশের এই চরিত্রভিত্তিক বা অন্যান্য মৌলিক উপন্যাস যা লিখেছি তার পিছনে পাঠকের ভালোবাসা ছাড়া অন্যান্য কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা বা সম্ভাবনা আমার নেই। বাংলাদেশের কোনো সাহিত্য পুরস্কার বিদেশি হওয়ার কারণে আমার পাওয়ার প্রশ্ন নেই। আর্থিক প্রাপ্তি বই লিখে বিরাট কিছু হয় না। শুধু পাঠকের ভালো লাগা থেকে জন্মানো তাদের ভালোবাসা আমাকে সবসময় নতুন লেখার তাড়না দেয়। আমি ছুটে চলি সেই অভিমুখে। কারণ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে বাংলাদেশের পাঠক খুবই বিচক্ষণ। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ যাদের হাতে তাদের থেকে স্বীকৃতি না পেলে বাংলা ভাষায় লেখাই অর্থহীন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর