Alexa মরুভূমির বুকে ‘চলন্ত’ পাথর, ৬৩ বছর পর রহস্য উন্মোচন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৬ ১৪২৬,   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

মরুভূমির বুকে ‘চলন্ত’ পাথর, ৬৩ বছর পর রহস্য উন্মোচন

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২২ ৪ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৩৫ ৪ নভেম্বর ২০১৯

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

রাস্তা বা কোনো খোলা প্রান্তরে হাঁটার সময় পাথর কি আপনার নজর কাড়ে? নিশ্চয়ই না। কারণ এতে কোনো নতুনত্ব নেই। কিন্তু পাথরগুলো যদি আমার-আপনার মতো হেঁটে বেড়াতো তাহলে কেমন হতো? দৃষ্টি আকর্ষণ করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমনটা হওয়া কি আসলেই সম্ভব? রেসট্র্যাক প্লায়া নামক জায়গাতে কিছু ‘রহস্যময়’ পাথর দেখা যায়, যেগুলো মানুষের মতোই ঘুরে বেড়ায়।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালিতে এই রেসট্র্যাক প্লায়া অবস্থিত। আর এখানকার রেসট্র্যাক প্লায়াতেই দেখা মেলে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বয়কর পাথরের। এই পাথরগুলোকে বলা হয় সেইলিং স্টোন বা ভাসমান পাথর। সবাই বলে থাকে, এই পাথরগুলো প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায়। পাথরগুলিকে চলমান অবস্থায় কেউ কখনো দেখেনি, তবুও পাতলা কাদার স্তরে রেখে যাওয়া ছাপ থেকে পাথরগুলোর স্থান পরিবর্তন নিশ্চিত হওয়া যায়। পাথরের ট্রেইলে রেখে যাওয়া সূক্ষ্ম ছাপ থেকে বোঝা যায় পাথরগুলো এমন সময়ে স্থান পরিবর্তন করে যখন উপত্যকায় পাতলা কাদামাটির আস্তরণ থাকে।

ডেথ ভ্যালি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি সমতল ভূমি। ১৯৪৮ সালে লিফোর্নিয়ার রেসট্র্যাক প্লায়াতে এই বিশ্বয়কর ঘটনাটি বিশেষজ্ঞদের নজরে আসে। বিজ্ঞানীরা আজও পাথরের চলার ভিন্নতার কারণ রহস্য উম্মোচন করতে পারেন নি। কিছু কিছু পাথরের কয়েকশ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন হয়, এই ভারি ভারি পাথরগুলো কীভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, তা আজও রহস্যময়।

তবে অন্তত অর্ধশত বছর ধরে এই ভূতুড়ে রহস্যটি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে অনেক বিজ্ঞানী ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, এটি হয়তো বাতাস, পানির স্রোত এবং বরফ খণ্ডের ধাক্কার সম্মিলিত প্রভাব হতে পারে। কিন্তু তাদের এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না। অবশেষে একদল বিজ্ঞানী ঠিক করেন, তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমেই এ রহস্যটির সমাধান করার চেষ্টা করবেন।

সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা পাথরটি ভ্রমণ করে মোট ২২৪ মিটার

রহস্যের সন্ধান যেভাবে

ভূ-বিজ্ঞানীর দল নেমে পড়েন রহস্য উদঘাটনে। রেসট্র্যাক প্লায়ার চলমান পাথর নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি আসে ১৯৫৫ সালে। রেসট্র্যাক প্লায়াতে বেশ কয়েক মাস কাটিয়ে ফেলেন বিজ্ঞানী এম. স্ট্যানলি। তিনি বলেছিলেন, বছরের কোনো কোনো সময় ডেথ ভ্যালির পাহাড়গুলো থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে রেসট্র্যাক প্লায়াতে নেমে আসে। তখন রেসট্র্যাক প্লায়া টলটলে এক হ্রদের আকার নেয়। যদিও জলের উচ্চতা মাত্র ৭-৮ সেন্টিমিটার। রাতের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নামে। জল বরফে রূপান্তরিত হয়ে প্রসারিত হয়। বরফ ও বাতাসের যুগপৎ ঠেলায় পাথরগুলো স্থানচ্যুত হয়। স্ট্যানলির মতবাদ আইস-সিট মতবাদ নামে বিখ্যাত হয়ে যায়।

কিন্তু দুই ভূ-বিজ্ঞানী ডুইট ক্যারে এবং রবার্ট শার্প ১৯৭৬ সালে রেসট্র্যাক প্লায়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তারা স্ট্যানলি’র আইস-সিট মতবাদের বিরোধিতা করেন। ক্যারে এবং শার্প, ভুতুড়ে পাথরগুলোর চলার পথের বৈশিষ্ট্য এবং পাথরগুলির অবস্থানের জ্যামিতিক বিশ্লেষণ করেন। রেসট্র্যাক প্লায়ার বালির ওপর বিভিন্ন পাথরের তৈরি করা ট্র্যাকগুলোর মধ্যে আশ্চর্যজনক কিছু মিল পাওয়া যায়। পাথরগুলো বরফের ঠেলায় সরলে, ট্র্যাকগুলোর মধ্যে এতো গঠনগত মিল হয় কীভাবে?  অতএব বিজ্ঞানী স্ট্যানলির আইস-সিট মতবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হলো। এই দুই বিজ্ঞানী বললেন, বছরের নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট আবহাওয়ায়, অস্বাভাবিক ঝোড়ো বাতাসের কারণে পাথরগুলো সরে যায়। এই ঘটনা প্রতি বছর হতে পারে, আবার দু-তিন বছর পর পরও ঘটতে পারে।

বিজ্ঞানী স্ট্যানলির সূত্র ধরে ১৯৮০ সালের শেষ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত জন বি.রেইড-এর নেতৃত্বে হ্যাম্পশায়ার ইউনিভার্সিটির একদল ভূবিজ্ঞানী রেসট্র্যাক প্লায়াতে সাতটি অভিযান চালান। তারা ১৯৯৫ সালে, তাদের গবেষণাপত্রে শার্প-ক্যারে মতবাদ খারিজ করে স্ট্যানলির আইস-সিট মতবাদকে সমর্থন করেন।

ডেথ ভ্যালি

আবারো রহস্য!

সমুদ্রবিজ্ঞানী রিচার্ড নরিস এবং প্রকৌশলী জেমস নরিস ২০১১ সালে রেসট্র্যাক প্লায়াদে যান। তারা সেখানে কিছু ক্যামেরা স্থাপন করে আসেন, যেগুলো নিয়মিত বিরতিতে পাথরগুলোর ছবি তুলে রাখবে। এছাড়াও তারা ঐ স্থানের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, প্রভৃতি নথিভুক্ত করার জন্য একটি ছোট আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করেন। পাথরগুলোর নড়াচড়া লিপিবদ্ধ করার জন্য তারা বিভিন্ন আকারের অনেকগুলো পাথরের গায়ে বিশেষভাবে নির্মিত কিছু জিপিএস ট্র্যাকার সংযুক্ত করে দিয়ে আসেন, যেগুলো পাথরগুলো স্থান পরিবর্তন করলেই সঙ্গে সঙ্গেই তা রেকর্ড করে রাখবে।

কিন্তু সমস্যা ছিল, তারা জানতেন না ফলাফলের জন্য তাদেরকে ঠিক কত দিন অপেক্ষা করতে হবে। এই পাথরগুলোর রহস্য নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন গ্রহবিজ্ঞানী র‌্যাল্‌ফ লরেঞ্জ। তিনি অন্যান্য গ্রহের শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের পরিবেশ এবং আবহাওয়া সম্পর্কে বোঝার জন্য ২০০৭ সাল থেকেই এই শুষ্ক হ্রদ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে যে পাথরগুলোর রহস্যের সমাধান করা যাবে, এ ব্যাপারে তার আস্থা ছিল না। তার ধারণা ছিল, পাথরগুলো এতো ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে যে, এগুলো পরিমাপ করতে যুগের পর যুগ সময় লেগে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, এটি হতে যাচ্ছে বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিরক্তিকর পরীক্ষা। কিন্তু তাদের অবাক করে ফলাফল এলো দু’ বছরের মধ্যেই।

২০১৩ সালের ডিসেম্বর। যন্ত্রপাতির ব্যাটারি পাল্টানোর জন্য রিচার্ড আর জেমস আবারো রেসট্র্যাক প্লায়াতে যান। সেখানে গিয়ে তারা অদ্ভুত একটি দৃশ্য দেখতে পান। মরুভূমির মতো শুষ্ক হ্রদটির তিনভাগের একভাগ জুড়ে রয়েছে বরফের পাতলা চাদর। বরফের স্তর দেখেই স্ট্যানলির আইস-সিট মতবাদ চাক্ষুষ দেখার কথা ভাবেন দুই ভাই। প্রচন্ড ঠাণ্ডার মধ্যে তাঁবু খাটিয়ে ফেলেন। মৃত্যু উপত্যকায় কাটতে থাকে দিনের পর দিন। এক প্রাণান্তকর প্রতীক্ষায় তারা।

২০ ডিসেম্বর, ২০১৩। সকাল ন’টায় রোদ উঠলে বরফের পাতলা আস্তরণ ভাঙতে শুরু করলো। রেসট্র্যাক প্লায়ার কিছু কিছু জায়গার বরফ গলে একটা ফাঁকা এলাকা তৈরি করতে শুরু করলো। উপত্যকায় ঝাঁপিয়ে পড়া সকালের ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কায় ভেঙে যাওয়া বরফের প্লেটগুলি নড়াচড়া করতে শুরু করল। হড়কে হড়কে চলাচল করার সময় বরফের ভাঙা প্লেটগুলো তাদের সামনে থাকা পাথরগুলোকে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিতে শুরু করলো। সবিস্ময়ে রিচার্ড এবং জেমস শক্তিশালী বাইনোকুলারে দেখলেন বিভিন্ন মাপের পাথরগুলো বরফের প্লেটের ধাক্কায় আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করেছে!

জেনে রাখা ভালো, পাথরগুলো এতটাই আস্তে আস্তে এগোচ্ছিলো যা খালি চোখে বোঝা সম্ভব না। কিন্তু বিকেলের দিকে যখন অধিকাংশ বরফ গলে গেল, তখন দেখা গেল প্রায় ৬০টি পাথরের পেছনে নতুন করে দাগ তৈরি হয়েছে! রিচার্ড এবং নরিস শহরে গিয়ে র‌্যাল্‌ফ লরেঞ্জকে নিয়ে আবারও ফিরে আসেন। ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি তারা তিনজন মিলে আবারও পাথরগুলোর স্থানান্তর প্রত্যক্ষ করেন এবং ভিডিওতে ধারণ করেন। সে বছর শীতকাল শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা পাথরটি ভ্রমণ করে মোট ২২৪ মিটার! সাক্ষী-প্রমাণসহ সমাধান হয় অর্ধশত বছর ধরে মানুষকে ভাবিয়ে তোলা এক ভূতুড়ে রহস্যের।

তাদের এই গবেষণার মাধ্যমে একই সঙ্গে এটাও পরিস্কার হয়েছে যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন একাধিক পাথর পরস্পরের সঙ্গে হুবহু সমান্তরাল পথ অতিক্রম করে। তারা জানান, মাঝে মাঝে কিছু বরফখণ্ড আকারে এতো বড় থাকে যে, সেগুলো একই সঙ্গে একাধিক পাথরখণ্ডকে একই দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। বরফখণ্ডের আকারের উপর নির্ভর করে এরকম পাথরখণ্ডের সংখ্যা শতাধিক পর্যন্ত হতে পারে।

শেষ কথা

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে লরেন্স, রিচার্ড এবং জেমস যা প্রমাণ করলেন ২০১৪ সালে, বিজ্ঞানী এম স্ট্যানলি ১৯৫৫ সালেই তা বলে দিয়েছিলেন। তার প্রমাণের উপর শিলমোহর দিতে আধুনিক বিজ্ঞানের ৬৩ বছর লেগে গেল। তাই রেসট্র্যাক প্লায়ার চলমান পাথরের রহস্য উদঘাটনের পুরো কৃতিত্ব বিজ্ঞানী এম স্ট্যানলিরই।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে