Alexa মরুকরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৮ ১৪২৬,   ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪০

মরুকরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়

 প্রকাশিত: ১৩:০৬ ২০ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৩:৫১ ২০ জুন ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। গত কয়েক দশকে দেশে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা যেমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তেমনিভাবে শীতকালে ঠান্ডাও অনুভূত হচ্ছে বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে নানা রোগের সংক্রমণ, ঋতুচক্রে দেখা দিয়েছে হেরফের। 

এখন আর আগের মতো প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে যথাসময়ে ঋতুর আবির্ভাব ঘটছে না। ঋতুর সংখ্যাও বোধ করি হ্রাস পেয়েছে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ছাড়া অন্য সব ঋতুর আমেজ একেবারেই উপভোগ করা যায় না। শীত বিলম্বিত হচ্ছে, বর্ষার আগমন ঘটছে অসময়ে। হঠাৎ করেই ভারী বর্ষণ কিংবা ঠান্ডা জেঁকে বসছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মরুকরণের প্রাথমিক আলামত হচ্ছে এসব। সমগ্র বাংলাদেশেই এটি খুব স্পষ্ট। ফলে বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৭ জুন বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবসে গণমাধ্যমগুলোতে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট হতে পারে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে মরুকরণ ঝুঁকির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু জলবায়ুর এই নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের কি কিছুই করণীয় নেই- এ প্রশ্নটিও বিবেচনার দাবি রাখে বৈকি। 

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে ৪২ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে, যা মরুভূমির তাপমাত্রার মতো। আবার শীতে তাপমাত্রা প্রায় হিমাঙেআকর কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। কোনো এলাকা করুকরণের জন্য বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত ‘সোনোরান’ মরুভূমির কথা। এটি উত্তর আমেরিকার শুষ্ক ও উষ্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। গ্রীষ্মকালে এখানে ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ওঠে। আর শীতকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ১০ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাতও সেখানে সন্তোষজনক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের এখনো বৃষ্টিপাতের ‘সোনোরান’-এর পরিমাণ বেশী আছে, বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণও বেশি। এ তথ্যটুকু স্বস্তিকর হলেও সময়ের ব্যবধানে  তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে স্পষ্ট হতে পারে, কতটুকু ঝুঁকির মুখে আছে আমাদের দেশ। 

এর আগে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ নিয়ে বিশ্বের পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। মার্কিন ভূ-বিজ্ঞানী ড. নারম্যান ম্যাকলিয়ও জানিয়েছিলেন, ‘সাহারা মরুভূমি শুরু থেকে যেভাবে মরুকরণের দিকে এগিয়েছে, ঠিক একই কায়দায় বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’ সাহারা মরুভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা এই বিজ্ঞানী আরো বলেছেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের বাতাসে সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো আগুনের ফুলকি বেরে হচ্ছে।’ সুতরাং ওই বিজ্ঞানীর ভাষ্যমতে, স্পষ্ট হতে পারে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ গোটা দেশই ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মরুকরণ প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে না। মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা পরিপূর্ণতা পেতে অর্ধশতাব্দী বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। কিন্তু গত এক দশকের নানান সময় ‘উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে’, ‘২০৫০ সালের মধ্যে বাসভূমি হারাবে বাংলাদেশের ২ কোটি মানুষ’, ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লেই দেশের ৪ হাজার ৮০০ বর্গমিটার এলাকা তলিয়ে যাবে। আর দুই মিটার বাড়লে তলিয়ে যাবে ১২ হাজার ১৫০ বর্গমিটার’-এসব তথ্যে বাংলাদেশের অসহায়ত্বই ফুটে ওঠে বলে আমি মনে করি।  

মরুকরণের প্রধান দুটি ধাপ হচ্ছে- একটি বিস্তৃত এলাকা জুড়ে যদি সেখানকার মাটি অনুর্বর হতে থাকে এবং যদি নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টির অভাব ঘটে। আর বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ এ লক্ষণগুলো খুব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে কৃষিজমি সংরক্ষণ, কৃষিকাজে জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিতকরণে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, নদীর পানি প্রবাহে যথাযথ উদ্যোগ, খাল-বিল ও জলাভ‚মিসমূহ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ কথা ঠিক যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের অনেক দেশই বর্তমানে জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে মরুকরণের ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে। যদিও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার তহবিল গঠনসহ দুর্যোগ মোকাবিলার নানান উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু তার আগেও মরুকরণ রোধের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার, সেসবের ওপর জোর দেয়া জরুরি। 

মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় যোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃতিকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করলে তা ধ্বংস ডেকে আনবে এটাই স্বাভাবিক। সার্বিকভাবে সেই পথেই হাঁটছে দেশ। যেমন কৃষি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার করায় সাময়িক উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কৃষিজমির ঊর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মাটির গুণাগুণ। অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মারা যাচ্ছে উপকারী প্রাণী এবং দেশীয় জাতের মাছ। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের কৃষিজমি একদিন পুরোপুরি অনুর্বর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে; যা মরুকরণ ঝুঁকির একটি প্রধান দিক। অপর ঝুঁকি হচ্ছে বৃষ্টিপাতের পানি ধরে রাখে যে জলাধারগুলো তাও বিপন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমিতে যথেচ্ছভাবে কৃষিকাজ করার কারণে জলাভূমিগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার জলাভূমি দখল করে নিচ্ছে ভূমিদস্যুরা- জলাভূমি কমে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। সরকারি তথ্যে দেশে মোট নদীর সংখ্যা ৩১০টি হলেও এরমধ্যে মৃত ও মৃতপ্রায় নদীর সংখ্যা ১১৭টি। তীব্র নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর কোনো না কোনো নদীর শাখা ধীরে ধীরে পলি পড়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশ থেকে নদী হারিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে। আসলে মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতার কারণেই প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপে মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা। কিন্তু এ থেকে কী উত্তরণের কোনো উপায়ই নেই? 

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রতিবছর বিশ্বের কোনো না কোনো দেশে প্রায় দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকা মরুকরণ হচ্ছে। এটি সমগ্র বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর জন্য একটি বিস্ময়কর সংবাদ। এ জন্য দায়ীও মানবকূল। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে দেয়ার নেপথ্য নায়ক ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো। বড় বড় শিল্পকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, নির্বিচারে বন উজাড়, নদীশাসন ইত্যাদির ফলে দারুণভাবে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। মেরু অঞ্চলের বড় বড় বরফের চাঁই গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা একদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে মরুকরণ হচ্ছে পর্যাপ্ত জলের অভাবে আরেক এলাকা। যার প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া দুই মেরুর বরফ গলার ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও মালদ্বীপ, মুম্বাই, ইন্দোনেশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, মার্শাল আইল্যান্ড, মিসরের ব-দ্বীপ অঞ্চল, টোকিও, লন্ডন, নিউইয়র্ক ও ভিয়েতনামের উপকূলীয় শহর সমুদ্রে তলিয়ে যাবে- এমন আশঙ্কার তথ্য রয়েছে। এটা ঘটলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। এর অর্থ দু’ভাবেই আক্রান্ত হবে বাংলাদেশ। 

আমাদের দেশ যে সার্বিকভাবে মরুকরণ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যাচ্ছে, তা স্পষ্ট। ফলে এখন থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে। সতর্ক ও সচেতন হওয়া গেলে বিপর্যয় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। ফলে মরুকরণ রোধে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব কারণে মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় তা রোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। নদ-নদী দখল কিংবা জলাশয় যেন কেউ ভরাট করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি থাকা বাঞ্ছনীয়। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে করে বৃক্ষ নিধনসহ বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করতে হবে। আর যেহেতু বনায়ন সৃষ্টি মানে মরুকরণের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া, সেহেতু অধিকমাত্রায় বনায়ন করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিককেই ভাবতে হবে। অন্যদিকে অভিন্ন নদী-নদীগুলোর পানিপ্রবাহ যাতে ঠিক রাখা যায়, সে ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিতে হবে সঠিক উদ্যোগ। সর্বজনবিদিত যে, ফারাক্কা বাঁধের ফলে পর্যাপ্ত পানি বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রবাহিত হতে পারছে না। তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীও শুকিয়ে যাচ্ছে। এসবও মরুকরণের ধাপ। বলা যায়, এতে মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। সুতরাং সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। সরকার এবং জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই মরুকরণ প্রতিরোধে সহায়ক হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর