মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষ

ঢাকা, রোববার   ২৬ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৬,   ২১ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ১৯:৪৬ ১ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৯:৫৪ ১ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ধর্মীয় সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে শনিবার যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার নেপথ্যে মূলত কাজ করেছে বিবদমান দু’পক্ষের ধর্মীয় মতাদর্শ। যার প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বের তাবলীগ জামাতের অনুসারীদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সবশেষে এর চূড়ান্ত পরিণতি কোন দিকে যেতে পারে, সে বিষয়েও রয়েছে নানা মত ও আশঙ্কা।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তাবলীগ জামাতের অন্যতম নেতা দিল্লীর সাদ কান্দালভি ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয়ে যে মতাদর্শ ধারণ করেছেন তার সঙ্গে প্রথাগত তাবলীগ অনুসারীদের মত পুরোপুরি উল্টো। যার ফলশ্রুতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় উপমহাদেশের সুন্নী মুসলিমদের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুসারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা ও নানামুখী টানাপোড়ন।

বলা হচ্ছে, বেশ কিছুদিন যাবৎ কান্দালভি তাবলীগ জামাতে এমন কিছু সংস্কারের কথা বলছেন, যা অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করছে।

সাদ কান্দালভির মতে, কোনো ধর্মীয় শিক্ষা বা প্রচারণায় অর্থের ব্যবহার করা উচিত নয়। যার মধ্যে মিলাদ বা ওয়াজ মাহফিলের মতো কর্মকাণ্ডও পড়ে। এছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষকদের মাদ্রাসার ভেতরে নামাজ না পড়ে মসজিদে এসে নামাজ পড়া উচিত বলেও মন্তব্য কান্দালভির।

এদিকে অন্য একটি পক্ষ মনে করে, কান্দালভির মতাদর্শ তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের নির্দেশিত পন্থার বিরোধী। এক্ষেত্রে কান্দালভির বক্তব্য আহলে সুন্নাত ওয়া’ল জামাতের বিশ্বাস ও আকিদার বাইরে বলে মনে করেন তারা।

আর কান্দালভির সমর্থকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, তাবলীগ জামাতের ৯০ শতাংশই কান্দালভির অনুসারী। তবুও একটি গোষ্ঠী তার মতাদর্শকে সহজভাবে নিতে পারছে না।

তারা এটাও বলছেন, কান্দালভির বক্তব্য বা সংস্কারের প্রস্তাব না মানতে পেরে বাংলাদেশে সংগঠনটির কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও কান্দালভির বিরোধী পক্ষ এটাকে স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে।

একটি সূত্র বলছে, সাদ কান্দালভি এখনো তার মতবাদ পাল্টাননি। এটা যেন বাংলাদেশে ছড়াতে না পারে এবং মুসলিমরা যেন পথভ্রষ্ট না হয়, সেজন্য তার বিরোধীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

এভাবে মতাদর্শগত ভিন্নতার জেরে তাবলীগ জামাতের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকাশ্য রূপ নেয় গেল বছরের নভেম্বরে। তখন কাকরাইলে এই দুই দলের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে এ বছরের জুলাই মাসে ঢাকায় কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতিতে তাবলীগ জামাতের একাংশের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যাতে সাদ কান্দালভিকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

এতে আরো সিদ্ধান্ত হয়, দিল্লিতে তাবলীগের কেন্দ্রীয় এই নেতার বক্তব্য ও মতবাদকে কোনোভাবেই অনুসরণ করা হবে না। এছাড়া আগামী বিশ্ব ইজতেমার সময় তাকে দেশে আসতেও দেয়া হবে না।

শুধু তাই নয়, কান্দালভির মতাদর্শ নিয়ে তাবলীগ জামাতের দু’টি গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের প্রভাব গত ইজতেমাতেও পড়েছিল। তখন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় এই নেতা ইজতেমা কেন্দ্রে অংশ নিতে পারেননি এবং তাকে কাকরাইলে অবস্থান করতে হয়। পরে সেখান থেকেই তাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিলো।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাবলীগ জামাতের এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী এখনো তাদের প্রধান দফতর কাকরাইল মসজিদেই অবস্থান করছেন। তবে কার্যক্রম চলে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে।

এদিকে অভ্যন্তরীণ এই কোন্দলের কারণে টঙ্গীতে এবার বিশ্ব ইজতেমার একটি তারিখ ঘোষিত হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।

তারপরেও তাবলীগ জামাতের একটি গ্রুপ আগামী ১১ জানুয়ারি থেকে ইজতেমা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবদমান দু’পক্ষের সদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠকে এবার ইজতেমা না করার সিদ্ধান্ত দেন।

এমন পরিস্থিতিতে শনিবার সকাল থেকে দু’পক্ষের সংঘর্ষে ইজতেমা ময়দান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে মাথায় আঘাত পেয়ে ইসমাইল মণ্ডল নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। এছাড়া আহত হন অন্তত শতাধিক মুসল্লি। অবশেষে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চলতি বছর বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন বন্ধ রাখতে গাজীপুর জেলা প্রশাসক, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআইএস/টিআরএইচ

Best Electronics