Alexa মক্কা থেকে ফিরেই ইংরেজ তাড়াতে নামেন তিতুমীর

ঢাকা, শনিবার   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১৬ ১৪২৬,   ০৫ রজব ১৪৪১

Akash

মক্কা থেকে ফিরেই ইংরেজ তাড়াতে নামেন তিতুমীর

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:১৪ ২৮ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১২:৫৭ ২৮ জানুয়ারি ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

তিতুমীরের প্রকৃত নাম ছিল মীর নিসার আলি। কৃষক পরিবারের সন্তান তিতুমীর ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় হজ করতে যান। সেখানে স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে দেখা হয় তার। পরে সৈয়দ আহমেদের শিষ্য বনে যান তিনি। আর ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। এরপর মক্কা থেকে ফিরে এসে তিতুমীর তার গ্রামের কৃষকদের নিয়ে জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। 

বাংলারই স্বাধীনতা সংগ্রামী সেই তিতুমীরকে নিয়ে আলোচনা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। সেইসঙ্গে হারিয়েছে বাঁশের কেল্লা গড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তার ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ইতিহাসও। 

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাকে কেন্দ্র করে ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ফলে মধ্যবিত্ত, কৃষক, তাঁতী, কারিগর ও শিল্পীরা নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়। কারণ ইংরেজদের এই আধিপত্য স্থাপনের মূলে সাম্রাজ্যবাদী ব্যাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল। এর ফলে কোম্পানির সরকার প্রবর্তিত নতুন রাজস্ব নীতি ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, চিরাচরিত বিচারব্যবস্থার স্থলে নতুন বিচারব্যবস্থা ও আইনকানুন প্রবর্তন এবং ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ভারতবাসীর মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের জেরে ব্রিটেনের কলকারখানায় ব্যাপক হারে ভোগ্যপণ্য উৎপাদিত হতে থাকে। এর ফলে ভারতীয় পণ্যের উপর উচ্চহারে কর ভার চাপিয়ে সরকার বিভিন্ন কৌশলে ভারতীয় শিল্প ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে বিভিন্ন কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়ে যায়।

এই সময়ে বেকার কৃষক, তাঁতী, কারিগর, শিল্পী সবাই এক বিদ্রোহে সামিল হয়। এর থেকে বিভিন্ন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এই সব বিদ্রোহের মধ্যে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধাননেতা তিতুমীরের নেতৃত্বে “বারাসাত বিদ্রোহ” তিতুমীরের আন্দোলনের জেরে জমিদার ও নীলকর সাহেবরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

জমিদার, নীলকরসাহেব ও ব্রিটিশ সরকার তিতুমীরের আন্দোলনের বিরুদ্ধে সমবেত হয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল, ‘যারা তিতুমীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করবে এবং ওয়াহাবি হবে ও দাড়ি রাখবে তাদের জরিমানা দিতে হবে। তিতুমীরকে বাড়িতে স্থান দিলে বাড়ি ঘর থেকে উচ্ছেদ করা হবে।

এতেও দমে থাকেননি তিতুমীর। সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত ছিল তিতুমীরের সেনা। ১৮৩১ সালে ২৩ অক্টোবর উত্তর চব্বিশ পরগণার বারাসাতের কাছে বাদুরিয়ার থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তিনি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। এই কেল্লা ছিল তিতুমীর ও তার সহ-আন্দোলনকারীদের সদর দফতর। চব্বিশ পরগণা, নদীয়া, এবং ফরিদপুর (বাংলাদেশ) বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জমিদার ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের কাছে বেশ কয়েকবার পরাজিত হয়। শোনা যায় তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষক সেনা যোগদান করেছিল।

১৮৩১ সালের এই বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরের বিরুদ্ধে এক অভিযান শুরু করেন। প্রথমে ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারিদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল। ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, তিতুমীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন,’ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে, লড়াইয়ে হার জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে হবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যাদা অনেক, তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়, আমাদের কাছে থেকে প্রেরণা পেয়েই এদেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে, আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এইপথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।’

তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র, বল্লম, বর্শা, ও লাঠি এসব নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। কারণ ব্রিটিশদের উন্নতমানের অস্ত্র থাকার ফলে হার নিশ্চিত ছিল তিতুমীরদের। শেষে কামানের আঘাতে বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হয়। এর ফলে তিতুমীর ও তার অনেক অনুগামীরা বীরের মত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন। তিতুমীরের বাহিনী প্রধান মাসুম খাঁ’কে ফাঁসি দেয়া হয়। এছাড়া অনেককেই দীর্ঘমেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস