Alexa ভয়াল ২৯ এপ্রিল, দুঃসহ স্মৃতি আজও কাঁদায়

ঢাকা, সোমবার   ১৯ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৪ ১৪২৬,   ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

ভয়াল ২৯ এপ্রিল, দুঃসহ স্মৃতি আজও কাঁদায়

 প্রকাশিত: ০০:১৪ ২৯ এপ্রিল ২০১৮   আপডেট: ১২:৩৪ ২৯ এপ্রিল ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রোববার ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ২৭ বছর আগে এই দিন কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নেমে এসেছিল ভয়াবহ দুর্যোগ। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস তছনছ করে দিয়েছিল উপকূলীয় জনপদ। নিহত হয়েছিল কয়েক লাখ মানুষ। ভেসে গিয়েছিল ফসলের ক্ষেত, লাখ লাখ গবাদি পশু। সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে কক্সবাজারের আট উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী-আনোয়ারাসহ উপকূলের হাজার হাজার গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়েছিল। ক্ষতি হয়েছিল কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

১৯৯১ সাল। ২৯ এপ্রিল, সোমবার। আবহাওয়ার সর্তকবার্তা আর সারাদিনের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ ছিল শান্ত। বিকেলে বাতাসের গতি বাড়লে দেখা দেয় খানেকটা অজানা আতঙ্ক। সন্ধ্যায় সর্তকবার্তার ধরণ পাল্টে চট্টগ্রাম শহর পরিণত হয় ভূতুড়ে নগরীতে। উপকূলীয় এলাকায় দেখা দেয় আতঙ্ক, শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। আশ্রয় নেয়ার চেষ্টায় যখন ব্যস্ত উপকূলবাসী, ঠিক তখন রাত সাড়ে ৮ট থেকে ৯টার মধ্যে ঘন ঘন পাল্টাতে শুরু করে সর্তকবার্তার বিপদসীমা। বাড়তে থাকে বাতাসের গতিবেগ। বৃদ্ধি পায় সারাদিনের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাত্রা। পাল্টে যায় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ভোলা, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকার দৃশ্যপট। শুরু হয় প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়। আকাশ-বাতাস মাতিয়ে নেমে আসে সীমাহীন মাত্রার বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়ার গতি এতটাই তীব্র ছিল যে, রাতের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে এর ভয়াবহতা। আকাশে বিজলী চমকানোর মাত্রাটাও যেন ছিল আগুনের ফুলকির মতো। আর বজ্রপাতের শব্দের তীব্রতা ছিল মাটি থেকে আকাশজুড়ে। ঘোড় অন্ধকারে খুব কাছ থেকে মানুষের অস্তিত্ব বোঝা না গেলেও, বিজলীর ভয়াবহ ও তীব্র আলো আর বাতাসের শো শো শব্দে উড়ে যাওয়া টিনের আঘাতের বুঝতে কষ্ট হয়নি কারো। প্রায় টানা ৯ ঘণ্টা চলে তাণ্ডব।

রাত ১০টার পর ১০ থেকে ২৫ ফুট উচ্চতায় সাগরের পানি মুর্হুতেই ধেয়ে আসে লোকালয়। জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলায় ওই রাতে অনেক মা হারায় সন্তানকে, স্বামী হারায় স্ত্রীকে, ভাই হারায় বোনকে। কোথাও কোথাও গোটা পরিবারই হারিয়ে যায় পানির স্রোতে। ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ও দুঃসহ সে স্মৃতি আজও কাঁদায় স্বজনহারা মানুষগুলোকে।

২৭ বছর আগে ১৯৯১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় দুঃস্বপ্নের মতো বয়ে গিয়েছিল ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। ২৯ এপ্রিলের সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বয়ে উপকূলীয় মানুষের কাছে দিনটি ফিরে আসে বার বার। দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি শোকাবহ দিন। 

২৯ এপ্রিলের মধ্যরাতে আঘাত হানা প্রকৃতির নিষ্ঠুর কষাঘাত প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গিয়েছিল কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ দেশের ১৩টি উপকূলীয় জেলার শত শত ইউনিয়ন। ঘণ্টায় ২০০ থেকে ২২৫ কিলোমিটার গতিবেগের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় এবং ২৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে দেশের উপকূলীয় এলাকা পরিণত হয়েছিল বিরাণভূমিতে। ভয়াবহ ওই ঘূর্ণিঝড়ে মারা যান প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। যদিও সরকারি হিসেব মতে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার। এতে লাখের উপরে প্রাণ হারিয়ে ছিল শুধু কক্সবাজার উপকূলীয় জনপদে। সম্পদহানি হয়েছিল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ৬০ লাখ মানুষ। 

চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হালিশহর, আগ্রবাদ, কাটঘর, বন্দর, পতেঙ্গাসহ নগরীর উল্লেখযোগ্য এলাকা। বন্দর থেকে ছিটকে যায় নোঙর করা বড় বড় জাহাজ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নৌবাহিনীর জাহাজ। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় নৌবাহিনীর অনেক অবকাঠামো। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ। শিশু-সন্তান ও পরিবার নিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় জলোচ্ছ্বাসে আটকা পড়েন নৌ ও বিমানবাহিনীর বহু সদস্য। ভেসে যায় অনেকের আদরের ছোট্ট শিশু।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের পর কক্সবাজার জেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হচ্ছে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা। ওই ঘূর্ণিঝড়ে কুতুবদিয়া দ্বীপে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ মারা যান। ঘূর্ণিঝড়ের পর সামর্থ্যবান প্রায় মানুষ দ্বীপ ছেড়ে চলে যায় অন্যত্র।

ভয়াল এই ঘুর্ণিঝড়ে উপকুলীয় ১৯ জেলার ১০২ থানা ও ৯টি পৌরসভায় সরকারী হিসাব মতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন নিহত, ১২ হাজার ১২৫ জন নিখোঁজ, ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪ জন আহত হয়। মাছ ধরার ট্রলার, নৌকা, বৈদ্যুতিক খুটি, গাছ-পালা, চিংড়ি ঘের, স্কুল-মাদরাসা, পানের বরজ, লাখ লাখ গবাদি পশু, ব্রীজ কালভার্ট ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ। তাই ২৭ বছর পরও অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেনি উপকুলবাসী। ২৯ এপ্রিল এলেই উপকূলীয় মানুষের কাছে বেদনাময় করুণ স্মৃতি ভেসে ওঠে আতঙ্কে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮৯৭ সালে কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রামে ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হয় ১৭ হাজার ৫ শ মানুষ। ১৯৬০ সালে কুতুবদিয়া, হাতিয়া ও নোয়াখালীতে ২১০ কি.মি. ঘন্টা গতি সম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় ও ৫ মিটার উচ্ছতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ৬ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৬৩ সালে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীতে ২০০ কি.মি. গতিসম্পন্ন ঝড়ে মারা যায় ১২ হাজার মানুষ। ১৯৬৫ সালে কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও বরিশালে ১৬০ কি. মি. ঘন্টা ৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ১৯ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৮৫ সালে কক্সবাজার চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালীতে ১৫৪ কি.মি. ঘন্টা ৪ মিটার উচ্চতার জলোচ্ছাসে ১২ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৯১ সালে কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও বরিশালে ২২৫ থেকে ২৬০ কি.মি বাতাসের গতিবেগে ঘন্টা ৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ১ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৯৭ সালে টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম ১৮০ কি.মি/ঘন্টা ৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ২ শত এর অধিক মানুষ মারা যায়।

এছাড়া ১৮২২, ১৮৭৬, ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৮৮, ২০০৭ ও ২০০৯ সালে সিডর, আইলাসহ বিভিন্ন ধরণের ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকার ২৬টি জেলায় চরম আঘাত হানে। তবে সবচেয়ে বেশি ৯১ সালের ২৯ এপ্রিল শতাব্দীর ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী-ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারের কুতুবদিয়াসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি উপকূলীয় এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভয়াবহ জ্বলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার খুদিয়ার টেক পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এলকে/এসআই

Best Electronics
Best Electronics