করোনার ভ্যাকসিন তৈরি হবে কবে? জানুন ৫০ বছরের পরিসংখ্যানে

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

করোনার ভ্যাকসিন তৈরি হবে কবে? জানুন ৫০ বছরের পরিসংখ্যানে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৯ ২০ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:৫৭ ২০ মে ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

সারাবিশ্বই এখন করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দিশেহারা। গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম দেখা দেয় এই ভাইরাসটি। যা এখন সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছে তিন লাখেরও বেশি মানুষ। প্রতি দিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। 

পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি কেউ। রাতদিন একযোগে কাজ করে চলেছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। রীতিমত ভাইরাসটি মোকাবেলায় ভ্যাকসিন আবিষ্কারে চলছে প্রতিযোগিতা। যদিও এখনো কেউ শতভাগ সফল হয়নি। তবে নানা আশার বাণী শুনাচ্ছেন জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)। 

বিভিন্নভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। কবে এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে কেউই বলতে পারছে না। প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিল এর ভ্যাকসিন তৈরিতে সময় লাগবে ১৮ মাসেরও বেশি সময়। তবে আমরা কি সত্যিই এই সময়ের মধ্যে করোনার প্রতিষেধক হাতে পাব? 

করোনাভাইরাসপ্রতি শতাব্দীতে বিভিন্ন মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্ব। গত ৫০ বছরেই বিশ্বে ইবোলা, জিকা, মার্স  নামের আরেক ধরনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। আগের রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যায় সেসব ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের কয়েক বছর লেগেছিল। 

তবে করোনাভাইরাসটি চিহ্নিত করার কয়েক ঘন্টার মধ্যে এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন ধরণের গবেষণা শুরু হয়। জানেন কি? আগের এসব ভাইরাস মোকাবিলায় ভ্যাকসিন তৈরি করতে কত সময় লেগেছিল? তা কি কারো জানা আছে? কিংবা একটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে ঠিক কতটা সময় প্রয়োজন? চলুন তবে জেনে নেয়া যাক আগের এসব ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে বিজ্ঞানীরা কত সময় নিয়েছিলেন। 

জিকা ভাইরাস

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত এক শিশুজিকা ভাইরাস হচ্ছে আবরণযুক্ত ও আইকসাহেড্রাল আকৃতির একসূত্রক আরএনে ভাইরাস। এটি প্রথম ১৯৪৭ সালে উগান্ডায় রেসাস ম্যাকাক বানরের দেহে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে উগান্ডা ও তানজানিয়াতে মানবদেহে এই ভাইরাসের অবস্থান পাওয়া যায়। ১৯৫০ সাল থেকে এই ভাইরাস আফ্রিকা থেকে এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত নিরক্ষরেখা বরাবর অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পরে। 

উগান্ডার জিকা নামের একটি গ্রামের নাম অনুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়। স্থানীয় ভাষায় জিকা মানে বাড়ন্ত। এটি ২০০৭ সালে ইয়াপ দ্বীপপুঞ্জে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়। এতে কমপক্ষে ৪৯ জন মানুষ আক্রান্ত হয় কিন্তু কেউ মারা যায়নি। এই ভাইরাসের সময়কাল ৭৩ বছর গড়িয়ে গেছে। এখনো এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। গবেষণারত অবস্থায় আছে এখনো।  

চিকেনপক্স

চিকেনপক্সচিকেনপক্স অতিমাত্রায় সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত রোগীর লালা, থুতু, ফোসকা থেকে নির্গত তরল পদার্থ এবং কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। ফুসকুড়ি শুরু হওয়ার প্রায় দুই দিন আগে থেকে যতক্ষণ না সব ফোসকা পুরোপুরি শুকিয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত এটি সংক্রামক। এটি প্রথম সনাক্ত হয় ১৯৫৩ সালে। এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সময় লেগেছে ৪২ বছর। ১৯৯৫ সালে এসে চিকেনপক্সের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হতে সক্ষম হন বিজ্ঞানীরা। 

এডওয়ার্ড জেনারকে বলা হয় গুটি বসন্ত বা চিকেনপক্সের টিকার জনক। এজন্য তিনি তার সারা জীবন ব্যয় করেছেন। এই টিকা তিনি তার মালির আট বছরের পুত্র জেমস ফিপস এর উপর প্রয়োগ করেন। এর মাধ্যমেই পৃথিবী জানতে পারে চিকেনপক্সের টিকার কার্যকারিতার কথা।
 
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস

হেপাটাইটিস বি ভাইরাসহেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রথম সনাক্ত হয় ১৯৬৫ সালে। এটি একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। যা লিভারকে আক্রমণ করে। অনেক সময় সংক্রমণের প্রথম দিকে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে বমি ভাব, চামড়া হলুদ হওয়া, ক্লান্তি, পেট ব্যথা, প্রস্রাব হলুদ হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যায়।

সাধারণত এই লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয় এবং কদাচিৎ লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর মৃত্যু হয়। সংক্রমণের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৩০ থেকে ১৮০ দিন সময় লাগতে পারে। ভাইরাস সৃষ্টি হওয়ার ১৬ বছর পর ১৯৮১ সালে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়। এটি আবিষ্কার করেন পাবলো ডি ভ্যালেনযুয়েলা।

ইবোলা ভাইরাস

ইবোলা ভাইরাসপ্রথম এই ভাইরাস সনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে। ইবোলা ভাইরাস সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। জ্বর, গলা ব্যথা, পেশীর ব্যথা, এবং মাথা ধরা শুরুতে দেখা দেয়। এরপর গা গোলানো, বমি, এবং ডায়রিয়া, লিভার ও কিডনীর কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। ধারণা করা হয়, করোনার মতোই বাদুড় থেকে এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পরে। 

ইবোলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের সময় লাগে ৪৩ বছর। ২০১৯ সালে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হন বিজ্ঞানীরা। জনসন এন্ড জনসন তার জনসন ফার্মাসিউটিক কোম্পানিতে ইবোলা ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন।   

এইডস 

এইডসে আক্রান্ত এক শিশু ও বৃদ্ধএইচআইভি এমন একটি ভাইরাস যেটা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। এটি জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে মানবদেহকে প্রতিরোধহীন করে নিরাময়হীন অবস্থায় নিয়ে যায়, যা এইডস নামে পরিচিত। এটি প্রথম ১৯৮১ সালে আফ্রিকায় সনাক্ত হয়। পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকার কোনো এক প্রজাতির প্রাণী থেকে উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। 

২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় তিন কোটি ৬৭ লাখ মানুষ এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত। ওই বছরই এইডসের কারণে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। আমাদের দেশেও এর সংখ্যা নেহাত কম নয়। ভাইরাসের ৩৯ বছর গড়ালেও এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। এখনো এর ভ্যাকসিন আবিস্কারে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন।   

সার্স ভাইরাস

সার্স ভাইরাস২০০৩ সালে চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল সার্স ভাইরাস। এর পুরো নাম সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। বিশ্বের ২৫টি দেশে আট মাসে সার্স ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল আট হাজার ৯৮ জন। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭৭৪ জন। ১৭ বছর পর এখনো এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার গবেষণারত।    

মার্স ভাইরাস

সার্সের একই গোত্রীয় ভাইরাস মার্স। মার্স অর্থাৎ মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। এটি মূলত ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের এক জটিল রোগ। ২০১২ সালে প্রথম সৌদি আরবে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়। সেখানে আক্রান্তদের ৩৫ শতাংশই মারা যায়। সৌদি আরব ছাড়াও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বিভিন্ন দেশে। 

মার্স ভাইরাসএই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পাঁচ থেকে সাত দিন পরই শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। অল্প জ্বর, সর্দি কাশি, শরীর ও মাথাব্যথা, ডায়রিয়া, অরুচি, বমি, শরীরিক দুর্বলতা এর প্রাথমিক লক্ষণ। তবে অনেক সময় জ্বরের কয়েকদিন পর শ্বাসকষ্ট হতে পারে এবং তা ক্রমে জটিল আকার ধারণ করে। আট বছর হয়ে গেলেও এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন এখনো গবেষণারত।

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত যত ভাইরাস আক্রমন করেছে বিশেষজ্ঞদের মতে কোভিড-১৯ সবচেয়ে মারাত্মক। এখন পর্যন্ত এর কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। আর সংক্রমণ ঠেকাতে লক ডাউনসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তারপরও বেড়েই চলেছে এর তাণ্ডব। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ভ্যাকসিন হয়তো খুব তাড়াতাড়িই আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। পৃথিবী মুক্ত হবে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস