ভেনাসের বিস্ময়কর যত তথ্য

.ঢাকা, বুধবার   ২৪ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১১ ১৪২৬,   ১৮ শা'বান ১৪৪০

ভেনাসের বিস্ময়কর যত তথ্য

সিফাত সোহা

 প্রকাশিত: ১১:১০ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১১:১০ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আমাদের সৌরমণ্ডল আটটি গ্রহ ও একটি সূর্য নিয়ে গঠিত। তবে এখানে একটি গ্রহ আছে যেটি সব থেকে আলাদা। যেখানে এই ব্রহ্মাণ্ডের সব থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ বাস করে। আর এই আলাদা জায়গাকে আমরা ভালোবাসা নিয়ে বলে থাকি পৃথিবী। বিজ্ঞানীদের মত অনুসারে, পৃথিবী তৈরি হতে প্রায় ৪.৫৪৩ বিলিয়ন বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু শুধু কি আমরাই  এতটা ভাগ্যবান ছিলাম যে আমাদের পৃথিবী একটি নিষ্প্রাণ জায়গা থেকে জীবন সমৃদ্ধ গ্রহতে রূপান্তরিত হয়েছে,  না কি আমাদের সৌরমণ্ডলের অন্য কোন প্ল্যানেটে কোন এক সময় জীবনের অস্তিত্ব ছিল? কিন্তু কিছু কারণের জন্য আজ সেই সব গ্রহ নিষ্প্রাণ হয়ে পরেছে। সত্যিই কি এমন কিছু ছিল?  

আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন যে বিজ্ঞানীরা বলেন মার্স এবং ভেনাস গ্রহতে এক সময় পৃথিবীর মতো সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে আজ সে সব কোথায় হারিয়ে গেছে? যদি পৃথিবীর যমজ গ্রহ ভেনাসে কখনো পানির অস্তিত্ব থেকে থাকতো তবে কি এমন হয়েছিল যার জন্য ভেনাস এমন হয়ে গেছে। আর ভেনাস কি আমাদের এটা বলে দেয় যে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কখনও এমন হয়ে যাবে। চলুন জেনে নেয়া যাক ভেনাসের কাহিনী শুরু থেকে। ডেইলি বাংলাদেশের আজকের আয়োজনে আমরা ভেনাস গ্রহ এবং ক্যাসিনি মিশন নিয়ে আলোচনা করবো।

আমাদের সোলার সিস্টেমে চারটি রকি প্লানেট আছে। সূর্য থেকে দূরত্ব অনুসারে মার্কারি, ভেনাস, আর্থ এবং মার্স। মার্কারি হলো সূর্যের সব থেকে কাছের গ্রহ। কিন্তু আমাদের সৌরমণ্ডলের সব থেকে গরম প্ল্যানেট ভেনাস অর্থাৎ শুক্র। যার সার্ফেস টেম্পারেচার ৪৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এর সাথেই শুক্র আমাদের সৌরমণ্ডলের একমাত্র গ্রহ যে নিজের কক্ষপথের উল্টো দিকে পরিভ্রমণ করে। ভেনাস গ্রহে সূর্য পশ্চিম দিকে উদয় হয় এবং পূর্ব দিকে অস্ত যায়। কিন্তু এই গ্রহ নিজের কক্ষপথে খুব ধীর গতিতে পরিক্রমণ করে। 

ভেনাসের একদিন পৃথিবীর আট মাসের সমান হয়ে থাকে। ভেনাসে পৃথিবীর থেকে মোটা বায়ুমণ্ডল। যেটা অধিক মাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইডে ভরপুর। যেটা আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মাত্র ০.০৪ শতাংশ আর আমরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর মত বিপদে ভুগছি। অন্যদিকে ভেনাসের অ্যাটমোস্ফিয়ারে এই কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এবার আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, কেন ভেনাস আমাদের সৌরমণ্ডলের সব থেকে গরম গ্রহ। 

আজ থেকে কয়েক কোটি বছর আগে ভেনাস আর আমাদের পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইড এর মাত্রা প্রায় সমান ছিল  কিন্তু পৃথিবীতে এই কার্বন ডাই অক্সাইড অম্ল বৃষ্টির কারণে পুরু পাথরের আকারে জমে যায়। যার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা কম হয়ে যায়। কিন্তু ভেনাসের বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা একই রকম থেকে যায়। 

আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে ভেনাস আর পৃথিবীর, দুইটি গ্রহের জন্ম প্রায় একই রকম ভাবে হয়েছিল। এই দুইটি গ্রহের আকার প্রায় সমান। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে, ভেনাস গ্রহের পুরো বায়ুমণ্ডলের নিচে পৃথিবীর মতোই গাছপালা, জঙ্গল, ডাইনোসরের অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু আসল খেলা উনিশো পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু হয়। যখন স্পেস যাত্রা শুরু হয়। 

যখন আমেরিকা চাঁদের যাওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছিল তখন রাশিয়া আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ সম্পর্কে জানতে পারে। রাশিয়ার ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৮৬  সালের মধ্যে একের পর এক ১৬টি ভ্যানেরা স্পেস প্রবস ভেনাসের দিকে লঞ্চ করে। যার মধ্যে কেবল মাত্র ছয়টি এক্সপ্রেস প্রবস ভেনাসের সারফেসে ল্যান্ড করতে পারে। ভেনাসের সার্ফেসে ল্যান্ড করা খুবই কঠিন ছিল। বেশির ভাগ স্পেস প্রবস বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করার সাথে সাথেই হারিয়ে যায়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাশিয়ার কঠিন পরিশ্রমে ভ্যানেরা নাইন স্পেস প্রবস ভেনাসের সার্ফেসে ল্যান্ড করতে সক্ষম হয়। আর আমরা দেখতে পাই ভেনেসের চিত্র। কিন্তু সেখানে যা দেখা গেছে সেটা একদমই তেমন ছিল না যেটা ভেনাস সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন। 

স্পেস প্রবস এর মাধ্যমে নেয়া চিত্রগুলোর সময় সেটাই ছিল প্রথম চিত্র যা আমাদের পৃথিবীর মানুষ প্রথম বারের মত কোন গ্রহের সার্ফেসকে দেখেছিল। আর সেই চিত্রটি একদমি আমাদের পৃথিবীর মত ছিল না। এর ঠিক সাত বছর পর ভ্যানেরা থার্টিন এবং ফরটিন প্রথম ভেনাসের কালারফুল ইমেজেস আমাদেরকে প্রদান করেছিল। যেখানে এমন কিছু জিনিস দেখানো হয়েছিল যে এই জায়গা কোন নরকের থেকে কম নয়। এখানে পাঠানো কোন স্পেস প্রবস এর ভল্কানিক সার্ফেস এবং হিউজ অ্যাটমোস্ফিয়ারের প্রেসারে কয়েক ঘন্টার থেকে বেশি টিকতে পারেনি। বিজ্ঞানীরা এটা  মনে করেন যে আজ থেকে প্রায় কয়েক কোটি বছর আগে ভেনাসের সার্ফেসে ও সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু সেই সমুদ্র বা তার পানি কোথায় হারিয়ে গেছে? 

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ১৯৮৯ সালে নাসা একটি স্পেস লঞ্চ করেন যেটা ভেনাস রাডার ম্যাপার নামে পরিচিত। এই স্পেস ক্র্যাফট রাডার টেকনোলজির মাধ্যমে ভেনাসের সার্ফেসের মাপিং করে। আর আমরা ভেনাসের না দেখা রুপ দেখতে পাই। যেটা ভেনাসের ঘন মেঘের নিচে লুকিয়ে ছিল। আর এখানে দূর দূর পর্যন্ত কথাও পানির নাম মাত্র ছিল না। এখানে শুধুমাত্র গরম লাভার নদী ছড়িয়ে আছে। উপরে তপ্ত হওয়া লাল আকাশ আর গরম প্রেসার কুকারের সমান অ্যাটমোস্ফিয়ারিক প্রেসার, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকা অসম্ভব। ভেনাস প্ল্যানেট এটার উদাহরণ দেয় যখন গ্রীন হাউস মাত্রা থেকে অধিক হয়ে যায় তখন কি হতে পারে। 

গ্রীন হাউজ ইফেক্ট এর কারণে গরম ভেনাসের আট্মস্ফেয়ারের ভিতরে আসতে পারে কিন্তু সেখান থেকে আর বাইরে যেতে পারে না। ভেনাসের বায়ুমণ্ডলের প্রেসার এতটাই বেশি যেখানে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস এর আকারে নয় বরং একটি  সুপার ক্রিটিকাল ফিউল রুপে আছে। যদি কোন স্পাস্যাল স্যুট এর মাধ্যমে মানুষে ভেনাসে কাছে পৌঁছেও যায় তা হলেও মানুষ এখানে বাঁচতে পারবে না। আর এর কারণ, এখানে চলা ভয়ংকর আন্ধি। যেটা ৩৭০ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হয়।  কিন্তু আপনি এটা জেনে আশ্চর্য হবেন যে আমাদের সৌরমণ্ডলের সব থেকে গরম প্ল্যানেটেও বরফের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ওই রূপে নয় যেমন আমরা জানি। 

রাডার টেকনোলজির মাধ্যমে যখন ভেনাস গ্রহের ম্যাপিং করা হচ্ছিল তখন এর মাউনটেইন্স এর উপর খুব সাদা রংয়ের কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। যদি আপনি ভেনাসের সার্ফেস দেখেন তাহলে এই মাউন্টেন্স এর শিকড় খুব উজ্জ্বল রঙের দেখতে পাবেন।  আর এটি উজ্জ্বল হওয়ার মূল কারণ সূর্যের আলোকে রিফ্লেক্ট করছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন ওই উজ্জ্বল  জিনিসটা আসলে অন্য কিছু নয় ভেনাসে থাকা বরফ। যেগুলো ধাতুর আকারে এসব পর্বতের উপর জমে আছে। কিন্তু এটি একটি ধাধা বা কল্পনার মত।  

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, প্রোগ্রাম ভেনাস এক্সপ্রেসের দ্বারা  সমাধান করার চেষ্টা করছে। আমরা আজও এটা দেখতে পারি যে সোলার উইন্ড এর জন্য ভেনাস এর সার্ফেস থেকে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন এর  রুপে পানি বাইরের স্পেস এ চলে যাচ্ছে। যেটা আমাদের ঐদিকে সংকেত করে যে হয়তো কখনো এখানে সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু দুঃখের কথা এটাই যে আমরা আজও এটা জানি না যে ভেনাসের এমন অবস্থা কেমন করে হলো। কোন ঘটনা ভেনাসকে এই রুপে রূপান্তরিত করেছে। কিছু বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, কোন এক সময় নিজের চাঁদ ছিল যেটা কোন কারণে ভেনাসের সাথে ধাক্কা লেগে যায়। তার জন্যই ভেনাসের ঘুর্ণন উল্টো দিকে শুরু হয়ে যায় এবং খুব ধীরে হয়ে যায়। যার কারণে ভেনাস নিজের ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড হারিয়ে ফেলে। আর সূর্য থেকে আসা সোলার এর আগের কাজ করে যায়। 

ভেনাসে  বিদ্যমান পানি স্পেসে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা আসলে এটা জানিনা যে আসলে কেন হয়েছে এমনটা হয়েছে  কিন্তু একটা কথা আমাদের একটা জিনিস ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয় যে ভেনাসের বর্তমান অবস্থা পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে দেখিয়ে দেয়। যেভাবে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইড এর মত ঘাতক গ্যাস উৎপাদন করছি তার ফলে এটা ঘটার সম্ভাবনা অনেক যে একদিন পৃথিবী ভেনাসের মত রূপ নিতেই পারে।  

যদি আপনি এখনও ভাবেন যে কার্বন ডাই অক্সাইড আমাদের পৃথিবীর জন্য কোন বিপদ নয় তাহলে আপনি ভেনাস সম্পর্কে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস কতটা ভয়ঙ্কর সেই সম্পর্কে একটু রিসার্চ করলেই জানতে পারবেন যে এই গ্যাস কতটা বিপদজনক। তাই আমি আপনাদের বলব বেশি বেশি গাছ লাগান আর কার্বন ডাই অক্সাইড এর মত গ্যাস উৎপাদনের থেকে নিজেদের দূরে রাখুন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ