Alexa ভেজালের রাজ্যে কোনটা খাবো, কোনটা খাবো না

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

ভেজালের রাজ্যে কোনটা খাবো, কোনটা খাবো না

 প্রকাশিত: ১৩:৫৪ ২০ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৪:০৫ ২০ জুলাই ২০১৯

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

ভেজালের রাজ্যে বসবাস আমাদের। কূলপ্লাবী ভেজালের মধ্যে কোনটা খাবো কোনটা খাবো না ভাবতে গেলে, লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে। তাই ভেজাল এখন গা সওয়া। কেউ আর ভেজাল নিয়ে তেমনভাবে না। কিন্তু দুধের মতো শিশু আর জীবনরক্ষাকারী খাদ্যে ভেজাল নয়, এন্টিবায়োটিক আর ডিটারজেন্টের দেখা মিললে মানুষের টনক নড়বে  বৈকি! 

অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের নামটি এখন উচ্চারিত হচ্ছে মুখে মুখে। হ্যাঁ কিছুটা শ্রদ্ধা আর কিছুটা শঙ্কার সঙ্গে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সদ্য সাবেক পরিচালক। শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে এজন্য যে, ভয় ভীতি উপেক্ষা করে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন তার দুধ নিয়ে গবেষণার ফলাফল।

জাতিকে জানিয়েছেন, পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত উভয় দুধে পাওয়া গেছে মানব চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক। প্রথম দফা তার গবেষণার ফলাফল বিস্তরণের পর দেশব্যাপী আলোচনা, সমালোচনা, প্রশংসার ঝড় ওঠে। এমনকি তার নিজ বিভাগসহ ফার্মেসি অনুষদের চারটি বিভাগ পৃথক দুটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেয়, অধ্যাপকের এই গবেষণার সঙ্গে তারা যুক্ত নন। দুধ উৎপাদনকারীরা একজোট হয়ে যান। প্রশাসন, ব্যবসায়ী আর কতিপয় অধ্যাপকের  কোপানলে পড়েন তিনি।  এই পর্যায়ে  দ্বিতীয় দফা গবেষণা চালান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রবীণ অধ্যাপক । দ্বিতীয় দফা গবেষণায় আগের চেয়ে বেশি এন্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। প্রথম পরীক্ষায় পাওয়া গিয়েছিল ৭টি নমুনার মধ্যে ৩টি। এবার পাওয়া যায় ৪টি (অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, এনরোফ্লক্সাসিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন এবং লেভোফ্লোক্সাসিন) । এর মধ্যে আগেরবার ছিলো না এমন এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে ২টি ( অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ও এনরোফ্লোক্সাসিন) । অতি বিপদজনক কথা! এই ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কা জাগে এ কারণে যে, অধ্যাপককে এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ৭ দিনের ‘কারণ দর্শাও’ নোটিশ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বলেছেন, তার স্যাম্পলে ভুল ছিল। বলেছেন, অন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশ না করে এভাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি ঠিক করেননি। কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিক তার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৬ জন শিক্ষক তার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তার প্রশংসা করেছেন। এসব আশার কথা। কিন্তু তাকে বিদেশি এজেন্ট বানানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। এমন আলোচনাও এসেছে যে, তিনি দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে মেতেছেন। অশনী সঙ্কেত শুনছি। বর্ষিয়ান এই অধ্যাপক কোন বিপদে যেন না পড়েন, যেন কোন অন্যায়  না হয় তার প্রতি আমরা সেটাই চাই। তাকে হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে বলে শুনেছি।

প্রাণ, মিল্কভিটা,আড়ং, ফার্মফ্রেশ, ইগলু , ইগলু চকোলেট এবং ইগলু ম্যাগোংর মতো নামকরা এবং বহুল বিক্রিত পাস্তুরিত দুধের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন তিনি। অপাস্তুরিত দুধের তিনটি নমুনা পলাশী, গাবতলী ও মোহাম্মদপুর বাজার থেকে সংগ্রহ করেছেন। 

আ ব ম ফারুক সাহেব কারো হয়ে দুধের গবেষণাটি করেননি।  তাকে কেউ গবেষণার জন্য নিয়োজিতও করেনি। যদিও সেরকম একটা রঙচড়ানোর প্রচেষ্টা ছিলো। তিনি গবেষণাটি করেছেন নিজ দায়বদ্ধতা থেকে। 

২৫ জুন সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধে মানবদেহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ওই সম্মেলনে দুধে এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতির প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জরুরি প্রয়োজনে জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাসমূহ যেমন বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ( আইপিএইচ) ল্যাবরেটরিতে যেন নিয়মিতভাবে দুধে এন্টিবায়োটিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয় সেই অনুরোধ করেন। বিএসটিআই-এর দেড়যুগের পুরোনো দুধের স্ট্যান্ডার্ডে (বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড বিডিএস ১৭০২, ২০০২) এর ৯টি পরীক্ষার সঙ্গে যেন এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্ট পরীক্ষা করে দুধের স্টান্ডার্ডকে যুগোপোযোগী করা হয় সে অনুরোধও তিনি করেছেন। তিনি এটাও সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি মাঝে মাঝে এই গবেষণা করবেন। দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলি  যাতে তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে ভালো দুধ উপহার দিতে পারেন এবং বিএসটিআই যেন বিষয়টি হালকাভাবে না নেন এ বিষয়েও তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন। 

আম জাম কাঁঠাল কলা মাছ মাংস থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যে ভেজাল। কিন্তু দুধ শিশুখাদ্য। অনেক চিকিৎসক রোগিদের দুধ প্রেসক্রাইব করেন । আয়রণের উৎস দুধ। তাই শরীরে আয়রণ ঘাটতি পূরণ করার জন্য, হাড়ক্ষয়  রোধ করার জন্য দুধ জরুরি। গর্ভবতী ও প্রসূতিদের জন্যও দুধ অতি আবশ্যক। কিন্তু সেই দুধে যদি এন্টিবায়োটিক থাকে কি করে খাবে শিশুরা?  কি করে খাবে রোগি আর বয়স্ক মানুষেরা! গর্ভবতী নারীরা? আপনি আমি কি করে খাবো সে দুধ? দুধ দিয়ে যে সমস্ত স্ন্যাকস বা নাস্তা বানানো হয় সেগুলোই বা মানুষ খাবে কোন সাহসে! 
গরুর অসুখ বিসুখ দূর করার জন্য অনেক খামারি গরুকে এন্টিবায়োটিক দেয়। এই গরুর শরীরে এন্টিবায়োটিক থাকে। এই গরুর দুধ খেলে  সেই দুধে এন্টিবায়োটিক সংক্রমিত হতে পারে। তাছাড়া দুধ প্যাকেটজাত করার সময় ব্যবস্থাপনার ক্রুটির কারণেও দুধে এন্টিবায়োটিক বা  ডিটারজেন্টে প্রবেশ করতে পারে। দুধ সংগ্রহ ও প্রসেসিং-এ তাই সর্বত্র সতর্কতা নেয়া প্রয়োজন। 

মন্ত্রণালয় এবং দুধ উৎপাদনকারীরা যদি মনে করে থাকেন, আ ব ম ফারুকের পরীক্ষায় ক্রুটি আছে তাহলে তারা পুনর্বার পরীক্ষা করলেই পারেন। তা না করে তার পরীক্ষা ভুল এটা প্রমাণ করার চেষ্টা কেন? তাছাড়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশ করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঝুঁকি নিলে মুহূর্তেই বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই অতটা সময় না নিয়ে গবেষণার ফল প্রকাশ করে আ ব ম ফারুক সঠিক কাজই করেছেন বলে মনে করি। তার জবাবও এটাই ছিল। 

 আ ব ম ফারুক সাহেবের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর মাধ্যমটি তুমুলভাবে তার পাশে দাঁড়ায়। তার প্রতি কোন অন্যায় হলে বহুমানুষ তার পক্ষ নেবার ঘোষণা দেয়।  রাতারাতি আ ব ম ফারুক এদেশের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে যান। যেমন একসময় হয়েছিলেন মনজুর মোরশেদ শাহরিয়ার আর রোকন উদ দৌলা। তারা ভেজাল বিরোধী অভিযান করে চরম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন।  আড়ং-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় মনজুরকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছিল। দেশবাসীর তুমল প্রতিবাদের মুখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মনজুরের বদলির আদেশ রহিত হয়ে তিনি স্বপদে রয়ে গেছেন।

রোকনকে হয়ত এখন অনেকেই ভুলে গেছে। ভুলে যাবে মনজুরকেও। যেমন একদিন সবাই ভুলে যাবে আ ব ম ফারুককেও । কিন্তু দেশের মানুষের স্বার্থে তিনি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে যে কাজটি করেছেন তা প্রশংসনীয়। 

নিরাপদ খাদ্য পাওয়া জনগণের অধিকার। আর সেই খাদ্যের নিশ্চয়তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। দুধে এন্টিবায়োটিক থাকলে সেই দুধ খেলে শিশুরা সুস্থ সবল শরীর পাবে না। পাবেনা প্রত্যাশিত মেধা। দূষণযুক্ত খাবার আর পানীয় খেতে খেতে জাতি পরিণত হবে এক মেধাশূন্য পঙ্গু জাতিতে।

অনিশ্চয়তা নিয়ে দুধ খাচ্ছি আমরা। খাচ্ছি দুশ্চিন্তা আর শঙ্কা নিয়ে। বিষয়টির অবিলম্বে সুরাহা হওয়া দরকার। দেশবাসীর সামনে সঠিক তথ্য তুলে ধরা দরকার।  সরকারের দিতে তাকিয়ে আছি আমরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর