.ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৯ ১৪২৬,   ১৭ শা'বান ১৪৪০

ভেঙে পড়েননি হোসনে আরা

 প্রকাশিত: ১৪:০৮ ৯ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৪:১১ ৯ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নাটোরের রাণী ভবানী চৌকিরপাড় এলাকায় হোসনে আরা গড়ে তুলেছেন জিশান পোল্ট্রি হ্যাচারি।যা নাটোর জেলার মোট পাঁচটি পোল্ট্রি হ্যাচারির মধ্যে সবচেয়ে বড়। হ্যাচারির ইনকিউবেটরের স্যাটার অংশের মোট নয়টি কম্পার্টমেন্টে ট্রেতে করে সাজানো হয় লক্ষাধিক ডিম।৩৭.৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় এখানে ডিমের অবস্থান ১৮ দিন। এরপর ডিমগুলোকে স্থানান্তর করা হয় ইনকিউবেটরের হ্যাচার অংশের ট্রেতে।  হ্যাচারে ৩৭.২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিন দিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেড়িয়ে আসে সদ্য জন্ম নেয়া লক্ষ মুরগীর বাচ্চা।

হ্যাচারিতে ডিম সরবরাহের জন্যে আছে সাড়ে এগারো হাজার ধারণ ক্ষমতার দুটি সোনালী মুরগীর খামার।গুণগতমানের ডিম সরবরাহের জন্যে আছে যৌথ উদ্যোগের আরো মুরগীর খামার।

হ্যাচারিতে জন্ম নেয়া মুরগীর বাচ্চা ৭২ ঘন্টার মধ্যে বাঁশের ঝুঁড়ির মধ্যে ডেলিভারী দিতে হয়। নাটোর ছাড়াও রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ জেলার খামারীরা এর ক্রেতা। প্রতিটি বাচ্চার বিক্রি মূল্য ১৮ থেকে ২০ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে মুনাফার পরিমাণ মন্দ নয়। নাটোরের সিংড়া উপজেলা বাজার এলাকার ব্যবসায়ী দৌলত হোসেন নান্টু ১৯ টাকা দরে আট হাজার মুরগীর বাচ্চা কিনলেন।

স্বপন সাহা বললেন, এই হ্যাচারির বাচ্চাগুলোর মান ভালো, অসুখ-বিসুখ কম হয়, তাই ঝুঁকি কম। দীর্ঘদিন ধরে আমি নিয়মিত বাচ্চা নিয়ে এলাকার খামারীদের মাঝে সরবরাহ করে আসছি।একদিনে আসেনি হোসনে আরার এই সফলতা।অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে তিনি অর্জন করেছেন এই সমৃদ্ধি। দশ বছর আগে শুরু করেছিলেন পোল্ট্রি হ্যাচারি। তারও দশ বছর আগে পোল্ট্রি খামার। 

আলাপচারিতায় হোসনে আরা বললেন, সখের বশে মাত্র ১০টা মুরগী দিয়ে শুরু করেছিলাম। এরপর ধাপে ধাপে বাড়িয়েছি মুরগীর সংখ্যা। বর্তমানে স্বামী-সন্তানরা হোসনে আরার হ্যাচারির সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন। তবে শুরুতে তাদের মনোভাব ছিল নেতিবাচক। 


চার সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমসিম অবস্থা। হোসনে আরা মুরগীর খামারের পরিধি বাড়িয়েছেন তিল তিল করে। এক সময় হাল ধরেছেন পুরো সংসারের। চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে জিশান আইনে পড়াশুনা শেষ করে মায়ের হ্যাচারী দেখাশোনা করছেন। মেজ ছেলে ইমরান বিসিএস নন ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পেয়েছেন। সেজ ছেলে নাঈম পটুয়াখালী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে অনার্স করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সমাপ্ত করেছেন।ছোট ছেলে তানভির ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড টেকনোলজ ‘র ট্রিপলইতে অনার্স করছেন। 

স্বামী হাফেজ লুৎফর রহমান জানান, একবার খামার ভেঙেও দিয়েছিলাম।ভেঙে পড়েননি হোসনে আরা। হার না মানার কারণেই দুই দশক পরে স্পর্শ করতে পেরেছেন। 

ন্যাশনাল ব্যাংক নাটোর শাখায় প্রায় একশ নারী উদ্যোক্তার ব্যাংক ঋণের গ্যারান্টার হয়েছেন হোসনে আরা।  মাত্র পাঁচ শতাংশ লভ্যাংশে বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির ঋণ পেয়েছেন তাঁরা। ঋণগ্রহীতা মর্জিনা  বলেন, আপা গ্যারান্টার হওয়ায় ব্যাংক ঋণ পেয়েছি। ঋণের টাকায় খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।

নাটোর সদর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ সেলিম উদ্দিন জানান, সততা, অক্লান্ত পরিশ্রম আর অধ্যবসায় হোসনে আরাকে সফলতা দিয়েছে।তিনি আজ  নাটোর জেলার সবচে বড় পোল্ট্রি হ্যাচারির মালিক। সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে হোসনে আরার কার্যক্রম সকলের জন্যেই অনুকরনীয়।

ডিসি শাহিনা খাতুন হোসনে আরার হ্যাচারি পরিদর্শন করে বলেন, হোসনে আরা শুধু নিজে সফল উদ্যোক্তা নন, অসংখ্য উদ্যোক্তা তৈরি করে যাচ্ছেন তিনি। সবার আশীর্বাদে তিনি পৌঁছে যাবেন তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্যে। আর লক্ষ্য সম্পর্কে হোসনে আরা বললেন, এখনো অনেক দূরে যেতে হবে। এন্টিবায়োটিকমুক্ত মুরগী পালনে সফলতা অর্জনের চেষ্টা করছি। দেশ ও জাতিকে নিরাপদ মাংস উপহার দেয়ার পাশাপাশি লক্ষ্য আছে বিদেশে রপ্তানীর।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিপি