ভূমিকম্পের মাধ্যমে ধ্বংস হয়েছিল ‘পবিত্র নগরী’!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ভূমিকম্পের মাধ্যমে ধ্বংস হয়েছিল ‘পবিত্র নগরী’!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:১৬ ৫ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৯:৫২ ৫ এপ্রিল ২০২০

ছবি: কারাল সভ্যতা

ছবি: কারাল সভ্যতা

পবিত্র এক শহর! যেখানে কখনো ঘটেনি হানাহানি কিংবা যুদ্ধের মতো ঘটনা। অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল পেরুর সমুদ্র তীরে। বলছি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এক সভ্যতার কথা। 

তিন হাজার মানুষকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল সভ্যতাটি। এই সভ্যতাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ‘পবিত্র নগরী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পেরু-পের্পের এ সভ্যতাকে বলে কারাল। পৃথিবীর ইতিহাসে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হলো কারাল বা কারাল-সুপে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, তিন হাজার ৮০০ বছর পূর্বে এই সভ্যতার পতন ঘটে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের মধ্য দিয়ে।

মানবজাতির প্রথম সভ্যতাগুলোর মধ্যে মেসোপটেমিয়া, মিশর, চীন এবং ভারতের নাম উঠে আসে। তবে এসব সভ্যতার চেয়েও প্রাচীন হলো কারাল সভ্যতা। কারাল নামটি এসেছে পেরুর সুপে উপত্যকায় অবস্থিত কারাল অঞ্চলের নাম থেকে।

কারাল সভ্যতার গোড়াপত্তন ঘটে এখান থেকেইঅন্যদিকে পেরুর এই অঞ্চলকে কথ্য ভাষায় বর্তমানে নর্তে চিকো (স্পেনীয়, অর্থ উত্তরের ছোট্ট স্থান) বলা হয়। এর রাজধানী ছিল স্যাক্রেড সিটি অব ক্যারাল। এ সভ্যতার মানুষেরা কৃষি চর্চা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, মৃৎশিল্প ও অ্যাম্ফিথিয়েটারের জন্য বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। 

সভ্যতাটি যেভাবে আবিষ্কৃত হয়

জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ১৮০০ অব্দে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে। উত্তর-মধ্য পেরুর সমুদ্র উপকূলে এই সভ্যতার অন্তত ৩০টি কেন্দ্র প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পেয়েছেন। এদের মধ্যে কারাল, আসপেরো, উয়ারিকাঙ্গা, কাবালেত, প্রভৃতি স্থলে খননকার্যের মাধ্যমে এই সভ্যতার প্রচুর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯০৫ সালেই পেরুর সমুদ্র তীর থেকে কিছুটা দূরে সুপে উপত্যকায় এই সভ্যতার বেশ কিছু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। সমুদ্র তীরেই পাওয়া যায় আসপেরো জাতিগোষ্ঠী। আর সমুদ্র থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সন্ধান মেলে কারালে সভ্যতার নিদর্শন।

এখানেই গড়ে উঠেছিল কারাল সভ্যতাপ্রাচীন এই সভ্যতার নিদর্শন ১৯৪০ সালের আগেই প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে যথেষ্ট সুপরিচিত হয়ে ওঠে। তবে সেই সময় এই নিদর্শনগুলোর উপর তেমন কিছু গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি। এরপর পেরুর প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলের লিমা থেকে ২০০ মাইল উত্তরে সুপ ভ্যালিটি ১৯০৫ সালে জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক ম্যাক্স উহলে সমীক্ষা শুরু করেন। তিনিই এই অঞ্চলে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেন। বেশ কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলে খননকার্য চালানো হয়। এসময় তারা উঁচু কিছু পাহাড় আবিষ্কার করেন। 

পাঁচ হাজার বছরের পুরনো পিরামিডের সন্ধান

১৯৭০ সালে খননকার্য শেষ হলে প্রাকৃতিক কাঠামো অনুসারে প্রত্নতাত্ত্বিকরা পাহাড়গুলোকে প্রকৃতপক্ষে পিরামিড হিসেবে আবিষ্কার করেন। এরপর ১৯৯০ সালের মধ্যেই কারাল মহানগরীর পুরো পরিধি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। কারালের পুরো অঞ্চল আবিষ্কারে সময় লেগেছিল প্রায় ৯০ বছর। 

পুরো অঞ্চলজুড়ে অনেক কিছুর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে পাথরের তৈরি সম্ভাব্য বড় বড় মন্দিরের উঁচু প্ল্যাটফর্ম, বসবাসের জন্য তৈরি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ, বেশ কিছু ঢিবি, প্ল্যাটফর্মের উপর খাওয়া-দাওয়ার চিহ্ন, হাড়ের তৈরি বেশ কিছু বাঁশি প্রভৃতি। 

এই স্থানটি আবিষ্কার করতে ৯০ বছর সময় লেগেছিলকালের বিচারে ধারণা করা হয়, মিশরে যে সময়ে পিরামিডগুলো নির্মাণ করা হয় তার সমসাময়িক সময়েই কারাল সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। পশ্চিম গোলার্ধের অপর প্রাচীন সভ্যতা কেন্দ্র মেসো আমেরিকার থেকে এই সভ্যতা অন্তত দুই হাজার বছর প্রাচীন। প্রায় ৬৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে সুপে উপত্যকায় চিহ্নিত ১৮ টি বসতির মধ্যে কেরাল অন্যতম। কেরালার চারপাশে ছয়টি বড় পিরামিড রয়েছে। 

এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির আয়তন ৬০ ফুট উঁচু এবং ব্যাস ৪৫০ x ৫০০ ফুট। যা প্রায় চারটি ফুটবল মাঠের আয়তনের সমান। এই পিরামিডের উপর থেকে কারালের শাসকরা পুরো শহরটি পর্যবেক্ষণ করতেন। এর ভেতরের সিঁড়িগুলো ২৯ ফুট প্রশস্ত। এর ভেতরে রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটি কক্ষ। যার মধ্যে একটি অলিন্দ এবং একটি পবিত্র বেদী রয়েছে। 

অনুমান করা হয়, কারালে প্রায় তিন হাজার লোকের বসবাস ছিল। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, নর্তে চিকোর পরে আসা অনেক সভ্যতা তাদের উৎকর্ষে এ শহরের মডেল ব্যবহার করেছিল। আমেরিকা মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো নগরসভ্যতা এই কারালের কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে অত্যন্ত শুষ্ক এই অঞ্চলের বুক দিয়ে বয়ে গেছে সুউচ্চ আন্দিজ পর্বতমালা থেকে নেমে আসা প্রায় ৫০টি ছোট নদী। এদের ধার বরাবর প্রতিষ্ঠিত এই সভ্যতার কেন্দ্রগুলোরও মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। 

কারালদের জীবন-ধারণ কেমন ছিল?

কারাল সভ্যতার নিদর্শনকারাল সভ্যতার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। তবে তারা কোনো খাদ্যদ্রব্য চাষ করত না। কারাল সভ্যতার লোকেরা চাষ করত তুলা। সেই তুলা দিয়ে মাছ ধরার জাল তৈরি করে সরবরাহ করা হত সমুদ্র তীরে অবস্থিত এই সভ্যতার কেন্দ্রগুলোতে। সেখান থেকে সংগৃহীত মাছ ও সামুদ্রিক নানা খাদ্যদ্রব্যই ছিল এই সভ্যতার মানুষের বেঁচে থাকার আহার। অবশ্য সঙ্কীর্ণ নদী উপত্যকাগুলোতে কিছু ফল ও সবজি চাষের নিদর্শনও পাওয়া যায়। এই ধরনের সভ্যতার নজির অন্য কোনো প্রাচীন নিদর্শনে এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তবে রুথ শেডি সলিস কারালে খননকার্য পরিচালনার সময় খননস্থল থেকে সেই সময়ে ব্যবহৃত কিছু শস্য ও ফল উৎপাদনকারী ও কন্দজাতীয় উদ্ভিদের অস্তিত্বের প্রমাণ পান। সেগুলো হলো স্কোয়াশ, কয়েক রকমের বিনস, পেয়ারা, লুকুমা, মিষ্টি আলু প্রভৃতি। পরবর্তীকালে জোনাথন হাস প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদরা আরো উত্তরে কিছু খননস্থলেও এই উদ্ভিদগুলোর খোঁজ পান।

সেখানে তারা আভোকাডো, আচিরাসহ বেশ কিছু উদ্ভিদের খোঁজ পান। এর থেকে ধারণা করা হয়, কারাল জাতির খাদ্যের মধ্যে এই শস্যগুলো ছিল। এছাড়াও সেখানে গবেষকরা প্রাণীজ ভুক্তাবশেষ পান যার প্রায় পুরোটাই সামুদ্রিক। এর মধ্যে শামুক বা ঝিনুকের খোল থেকে শুরু করে অ্যাঙ্কোভি, সার্ডিন, প্রভৃতি মাছের কাঁটা ও হাড়, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

কারালে পাওয়া পাঁচ হাজার বছরের পুরনো পিরামিডচার্লস মান প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদ মত প্রকাশ করেছেন, কারাল সভ্যতার প্রশাসন ছিল মূলত ধর্মভিত্তিক। মজার বিষয় হচ্ছে, কারালের কোথাও যুদ্ধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুরো অঞ্চলের কোথাও কোনো প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো, কোনো অস্ত্র এবং সহিংসতার চিহ্ন পাননি প্রত্নতাত্ত্বিকরা। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, কেরালের মানুষেরা শান্তি প্রিয় ছিল। তাদের ছিল একটি শান্ত সংস্কৃতি। 

কেরাল থেকে প্রাপ্ত সবচেয়ে অবাক করা জিনিসগুলোর মধ্যে ছিলো, হরিণ ও কনডর শকুনের হাড়ের তৈরি ৩২ টি বাঁশি এবং ৩৭ টি কর্নেট (একটি ছোট শিংগলের মতো বাদ্যযন্ত্র)। এই বাদ্যযন্ত্রগুলো একটি পিরামিড ভেতরের বৃত্তাকার প্লাজার বাইরের অংশে আবিষ্কৃত হয়েছিল। এছাড়াও বিভিন্ন খোদাই করা চিত্র পাওয়া যায় পিরামিডের দেয়ালে। যেখানে দেখা যায়, বানর, পাখি, পাখির মুখোমুখি সাপ, একটি পাখি এবং একটি সাপ সমন্বিত একটি মাথা এবং দুটি নৃতাত্ত্বিক চিত্র।  

২০০১ সালে সুপের স্যাক্রেড সিটি অব কারাল ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়। ইউনেস্কো একে পবিত্র শহর হিসেবে আখ্যা দেয়। এ জাতির হারিয়ে যাওয়ার সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার ৮০০ বছর আগে ভূমিকম্পের কারণে এই সভ্যতার পতন ঘটে।  

সূত্র: অ্যানসাইন্টঅরিজিন

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস