‘ভুল উচ্চারণ ছড়ালে সমাজের বিশাল ক্ষতি’

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

‘ভুল উচ্চারণ ছড়ালে সমাজের বিশাল ক্ষতি’

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৯ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ২২:০৬ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

শিমুল মুস্তাফা, যাকে দেশে কবিতার হৃৎপিণ্ড বলা হয়। কারণ তার কণ্ঠে কবিতা এক অনন্য রূপ পায়। বহুবছর ধরে সুনীল, শামসুর রহমান থেকে শুরু করে একালের কবিদেরও আকাঙ্খা থাকে তার কণ্ঠে নিজের কবিতার ছন্দ শোনার। তিনি সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছেন ডেইলি বাংলাদেশ-এর।

ডেইলি বাংলাদেশ: আবৃত্তির প্রতি ভালো লাগাটা কিভাবে তৈরি হল?

শিমুল মুস্তাফা: এটা তো কোনো আয়োজন করে হয় না। ঘটে যায়! আমার ক্ষেত্রেও তাই!

ডেইলি বাংলাদেশ: কবিতা ও আবৃত্তি- শিল্পের দুটি মাধ্যমকে কিভাবে বিবেচনা করবেন?

শিমুল মুস্তাফা: কবিতা এবং আবৃত্তির সম্পর্ক অনেকটা মা-মাসির মত। আমি এটাই বলি কবিতা জন্ম দেন কবি, তিনি মা। আর কিন্তু আবৃত্তিকাররা কবিতার মাসি অন্তত। জনক না হলেও স্নেহের জায়গাটা, প্রেমের জায়গাটা, আন্তরিকতার জায়গাটা, লালনের জায়গাটা একটা আবৃত্তিকারের কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়। কবিতা হচ্ছে বোধের জায়গাটা তৈরি, মানুষকে উপলব্ধি করার জায়গাটা। আমি কবিতাকে এভাবেই ধারণ করি। কবিতা ভালবেসেই পড়ি। আমি যা পড়ি তা বিশ্বাস করি। যেমন ভাল লাগল একটি কবিতা , কিন্তু আমার আদর্শের সাথে মেলেনা, আমি সে কবিতা পড়ি না। আবৃত্তি কন্ঠের শিল্প নয়, মস্তিষ্কের শিল্প। কণ্ঠ হচ্ছে একটি সাউন্ড বক্সের মত। মস্তিষ্ক যদি পরিশিলীত না হয়, সাউন্ড বক্স নিজে নিজে আর কি রকম বাজতে পারে? আমার মস্তিষ্কে যে বোধ এবং  দৃশ্যপট তৈরি হচ্ছে, সেটাই আমি কন্ঠ দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: বাংলাদেশের আবৃত্তি চর্চার পটভূমি নিয়ে যদি কিছু বলেন..

শিমুল মুস্তাফা: আবৃত্তি চর্চার ব্যাপারটা আসলে স্বাধীনতার আগে থেকেই শুরু হয়। কিন্তু আমি বলব আবৃত্তির মূল বহিঃপ্রকাশ গোলাম মোস্তফা, ইকবাল বাহার চৌধুরী, হাসান ইমাম এদের হাত ধরে বাংলাদেশে  শুরু হয়। এবং স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়ে  আবৃত্তি সেই অর্থে ভূমিকা না রাখলেও মধ্য সত্তরের দিকে কাজী আরিফ, জয়ন্ত চট্টপাধ্যায় সাথে প্রবীন যে আবৃত্তি শিল্পীদের কথা বললাম এরা মিলে আবার আবৃত্তি চর্চা শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আবৃত্তি বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। সত্তরের দশকের রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটের কারণে শিল্প চর্চায়ও একটি ধ্বস নেমে আসে। কারণ আমরা দেখেছি দেশের ক্রান্তিকালে শিল্পীরা তাদের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী করে ফেলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য পচাত্তর থেকে আশি সাল পর্যন্ত শিল্পকলার প্রত্যেকটি মাধ্যম সেই ভাবে জেগে উঠতে পারেনি। অনেকটাই আস্থাহীন, হতাশায় পড়ে গিয়েছিল শিল্পীরা। আমাদের বিগত দু’শত বছরে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় আমরা যেভাবে রুখে দাড়িয়েছি, কিন্তু এই পাঁচ বছর আমাদের সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এখন মিডিয়া যেভাবে কাজ করছে, তখন তো এত মিডিয়া ছিল না। আর যেগুলো ছিল সেগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করেছে। ফলে অনেক কিছুই নিষিদ্ধ ছিল।

ডেইলি বাংলাদেশ: গণমাধ্যমে এখন বাংলা ভাষার চর্চা কেমন হচ্ছে। বিশেষ করে টিভি বা এফএম স্টেশনে...

শিমুল মোস্তফা: খুব প্রকট চর্চা ছিল একসময়। কিন্তু সচেতনতা বাড়ছে দিন। তবে এই ধারাবাহিকতটুকু আরো ভালোভাবে থাকারে প্রয়োজন। সবার মনে রাখা উচিত একটি জনপ্রিয় মাধ্যমে ভুল উচ্চারণ ছড়িয়ে গেলে সমাজের বিশাল ক্ষতি হয়ে যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ: গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্পট রিপোর্টিং এ দেখা গেছে তারা শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কেই জানেন না-

শিমুল মোস্তফা: এটাও অনেকখানি কমেছে। এর প্রকপ বেড়েছিল ইংরেজী মিডিয়াম স্কুল গুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপে। এটি এখন অনেকখানি কমতে শুরু করেছে। আমার মনে হয় পরিবারে আধুনিক বাবা মায়েরাও এখন পড়াশোনার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কার শেখানোর ব্যাপারে মনোযোগী হচ্ছেন। তবুও বলছি সময় লাগবে। গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: কিন্তু নাটক বা সিনেমার নামে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার তো দিন দিন বাড়ছে-

শিমুল মোস্তফা: এগুলো খুব গুরুত্ব সহকারী নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আমরা যেমন প্রত্যেকটা বিপনী দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পেরেছি। এটাও আইন করেই করতে হবে। আমি ইংরেজী শব্দের বিরোধী নই। খুব জনপ্রিয় শব্দগুলো আসতেই পারে। কিন্তু নিজেকে বিশাল মাপের আধুনিক প্রমান করার জন্য যে ইংরেজী শব্দ ব্যাবহার করার চেষ্টা করছি, সেখানে সচেতন হওয়া জরুরি। আমি অনেককে দেখেছি এমনিতে আড্ডায় বেশ ভালো বাংলা বলেন। কিন্তু টক শো বা সভা সেমিনারে তার ইংরেজী শব্দের প্রয়োগ বেড়ে যায়। এটা মহা অন্যায়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার ইংরেজীর শিক্ষক। উনার মতো দারুণ ইংরেজী বলা মানুষ কম রয়েছে। অথচ তাকে ২ ঘণ্টা বক্তব্য দিতে বলুন ১ টা ইংরেজী শব্দ ব্যবহার না করেই সাবলীল কথা বলতে পারবে। এখানেই আধুনিকতা।

ডেইলি বাংলাদেশ: শেষ প্রশ্ন, আবৃত্তির সংগঠন গুলো যেভাবে কাজ করছে, আবৃত্তি শিল্পী কি আমরা সেভাবে পাচ্ছি?

শিমুল মোস্তফা: ওটার জন্য আমরা কিছু দায়ী, আর আমাদের মন মানসিকতা অনেকখানি দায়ী। একটি জাতীর পরিচয় বহন করে তার শিল্পকলা। বাংলাদেশকে আমরা চিনবো এদেশের শিল্পকলা দিয়ে। ভারতে যে বাণিজ্যিক শিল্পকলা গুলো হচ্ছে- চলচ্চিত্রে, গানে আমরা কিন্তু ওটা দ্বারা মোহিত হচ্ছি। কিন্তু ভারতে একজন উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীকে একজন বানিজ্যিক শিল্পীর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যায়ণ করা হয়। ভারতে একটি গানের লিরিক জাবেদ আকতার লিখলে পাঁচ লক্ষ রুপি পায়। বাংলাদেশে একটি গানের লিরিক লিখলে পাঁচশত টাকা পায়। আমাদের দেশে একজন উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীকে যেভাবে মূল্যায়ণ করা হয়, তার চেয়ে দশগুণ বেশি মূল্যায়ন করা হয় আধুনিক একজন ড্যান্সারকে!

প্রজ্ঞা লাবনী বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান আবৃত্তিশিল্পী। একটি টিভি চ্যানেলে তিন ঘণ্টা সরাসরি অনুষ্ঠান করার পর তার হাতে একহাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। আমি প্রতিবাদ করে ছিলাম। আমি বলেছিলাম, শিল্পীকে টাকা না দাও, কিন্তু অসম্মান করো না। সেই চ্যানেলে পাঁচ বছর ধরে আমাকে ডাকে না।  আমি প্রতিবাদ করব, আরেক জন করবে, তৃতীয়জন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে টেলিভিশনে আবৃত্তি করবে। কারণ আমাদের লোভ লালসাটা অনেক বেশি। কেউ কেউ অর্থের জন্য লালসা দেখায়, আবার কেউ অর্থ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চায়। এদের দলে তো আমরা নই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে