Alexa ভুলে দণ্ডিত সাকিব, ভেলকি সৌরভের হাতে 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৬ ১৪২৬,   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

ভুলে দণ্ডিত সাকিব, ভেলকি সৌরভের হাতে 

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ২ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৮:৪২ ২ নভেম্বর ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

আগামীকাল ভারতের মাটিতে প্রথম টি-২০ খেলতে নামবে বাংলাদেশ। অথচ সাকিব আল হাসান নেই। সাকিব নেই তো আমার কী? আমি তো ভারতীয়। বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার বিপক্ষে নেই, ভালোই তো। নাহ, সাকিব সম্পর্কে এভাবে যে ভারতীয়রা ভাবে না সেটা বাংলাদেশের জানা দরকার। তাই এই আলোচনার অবতারণা।

সাকিব আল হাসান ভারতে খুবই জনপ্রিয় তার সরলতা ও ব্যবহারের জন্য। অথচ আজ অদ্ভুতভাবে তিনি নির্বাসিত। সাকিবের অপরাধ কী ছিল? বুকিদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তা গোপন করে যান। এই কারণেই তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ, আম্পায়ার, স্কোরার যদি বুকিদের কাছ থেকে কোনো প্রস্তাব পান, তা হলে আইসিসি বা সংশ্লিষ্ট দেশের ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি দমন কর্তাদের তা জানানো বাধ্যতামূলক। দুর্নীতি দমন বিভাগের ৬.২ ধারা অনুযায়ী ২.৪.৪ ধারায় বলা হয়েছে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ ধরনের সব অনৈতিক প্রস্তাব যত দ্রুত সম্ভব কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এই ধারায় সর্বনিম্ন ছয় (৬) মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ (৫) বছরের নিষেধাজ্ঞা দেয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সাকিব আল হাসানকে দুই বছর (এর মাঝে স্থগিত শাস্তি এক বছর) শাস্তি দেয়া হয়েছে। অনেকে বলছেন শাস্তি কম দেয়া হয়েছে। অনেক কলমচি ও প্রাক্তন খেলোয়াড় হাতখুলে চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন সাকিবের বিরুদ্ধে। তাদের প্রশ্ন করি সাকিব আল হাসান ভারতের ক্রিকেটার হলে কতটা শাস্তি হত? সাকিব স্বীকার করেছেন ফাঁস হওয়া মেসেজ। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ তখনই ফাঁস হয় যখন একপক্ষ সেটা ফাঁস করে। এখানে সাকিব নিশ্চয়ই এই পাত্তা না দেয়া বা গুরুত্ব না বোঝা কথোপকথন আইসিসি’কে তুলে দেননি। রইল বাকি বুকি। তার অসৎ প্রস্তাবে সায় না দেওয়া সাকিবকে ফাঁসাতে তিনি সম্ভবত ফাঁস করে এখন আড়ালে বসে আছেন আর শাস্তি হল সাকিবের।

ইতিহাস ঘাঁটলে অভিযুক্তদের তালিকায় কিংবদন্তিদের নামও রয়েছে৷ এমনকি সচিনের নামেও তো উঠেছিল একই অভিযোগ৷ ওই দক্ষিণ আফ্রিকাতেই! সেটা ২০০১ সালের নভেম্বর৷ ক্যাপ্টেনের নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়৷ সেটাই ক্যাপ্টেন হিসেবে সৌরভের প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকা সফর৷ প্রথম টেস্টে ব্লুমফন্টেনে হেরে যাওয়ার পরে পোর্ট এলিজাবেথে দ্বিতীয় টেস্ট৷ সব ঠিকঠাকই চলছিল৷ সবুজ উইকেটে এই টেস্টেও ম্যাচ বাঁচাতে লড়তে হচ্ছিল ভারতকে৷ যা-ই হোক, টেস্টের চতুর্থ দিন হঠাত্ই টিভি ক্যামেরা দেখাতে শুরু করল, বল থেকে কিছু একটা খুঁটে নিচ্ছেন সচিন৷ তখন টুইটার-ফেসবুক ছিল না, তবু দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল খবর৷ এমনকী পোর্ট এলিজাবেথের মাঠে থাকা বিগ স্ক্রিনেও বারবার সচিনের ওই বলে কারিকুরির ফুটেজ দেখানো হচ্ছিল৷ ঠিক যে ভাবে মাত্র ক’দিন আগে কেপ টাউন টেস্টে দেখানো হয় ব্যানক্রফ্টের কীর্তি৷ সচিনের মতো কেউ কিভাবে এই কাজ করছেন? ম্যাচের শেষদিনই এসে গেল ম্যাচ রেফারি মাইক ডেনেসের বিবৃতি৷ সচিন পরের টেস্টে সাসপেন্ড, সঙ্গে টিম ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন সৌরভ সহ আরও পাঁচজন৷ অভিযোগ এক্সেসিভ অ্যাপিলিং৷

ম্যাচ রেফারির রুমে শুনানিতে সচিন বলেছিলেন, তিনি মোটেই বল খুঁটছিলেন না এবং বলের পরিস্থিতি বা কন্ডিশন বদলে দেয়ার কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না৷ যুক্তি ছিল, বলের সিমে লেগে থাকা কাদা আর ঘাসই পরিষ্কার করছিলেন তিনি৷ এই যুক্তি শোনেননি মাইক ডেনেস এবং সম্ভবত কল্পনার বাইরে ছিল, ভারতীয় বোর্ড এবং জগমোহন ডালমিয়াকে চটানোটা কী ভয়ঙ্কর হতে পারে৷ দ্রুত লড়াইটা ভারতীয় বোর্ড বনাম আইসিসি-তে দাঁড়িয়ে গেল, যখন কলকাতায় বসে মোক্ষম চালটা দিলেন বোর্ড প্রেসিডেন্ট ডালমিয়া৷ সেঞ্চুরিয়নে পরের টেস্টে হয় ডেনেসকে ম্যাচ রেফারি হিসেবে সরাতে হবে, নয়তো ভারত খেলবে না৷ টিম দেশে ফিরে যাবে৷ দ্বিতীয়ত, সচিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাহার করতে হবে৷ বহু টালবাহানার পরে বেরিয়েছিল সমাধানসূত্র৷ যেখানে পরের টেস্টটাই খেলা হয়েছিল আনঅফিশিয়াল টেস্ট হিসেবে৷ মাইক ডেনেসকেও সরতে হয়েছিল ম্যাচ রেফারি পদ থেকে এবং আইসিসি-র তদন্তে সচিনকে দেয়া হয়েছিল ক্লিনচিট৷ যেখানে বলা হয়েছিল, সচিন বলের সিমে লেগে থাকা ঘাস আর মাটি পরিষ্কার করছিলেন৷ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেস আজও মনে করে, বিশ্ব ক্রিকেটে ডালমিয়ার একচ্ছত্র প্রভাব আর দাপট সে যাত্রা সচিনকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল৷ আর ম্য্যাচ রেফারি ডেনেসের নামের পাশে বসে গিয়েছিল ‘বর্ণবিদ্বেষী’ তকমা।

সাকিব কোনো অন্যায় করেননি। শুধু আইনের একটি ধারা ভুলে যাওয়ার কারণে অথবা অবহেলা করার কারণে আজ সততার পরিচয় দিয়েও তিনি শাস্তি পেয়েছেন। যদিও আমার কাছে গত কয়েকদিনের বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে যে অচলাবস্থা ছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়নি যে, সাকিব ভুল করেছেন। অথবা সে আইন ভুলে গিয়েছিলেন। অথবা জুয়াড়ি আগারওয়ালা তিন বার প্রস্তাব দেয়ার পরও তার একটি বারের জন্যও আকসু বা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে সেই ঘটনা জানানোর কথা মনে পড়েনি। বরং মনে হয়েছে ২০১৭-১৮ সালের ঘটনা আজকে সামনে নিয়ে আসা এবং সাকিবের শাস্তির পেছনে কোনো রহস্য আছে। ক্রিকেটারদের যৌক্তিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সভাপতিসহ অনেক প্রভাবশালী সাকিবের ওপর ক্ষিপ্ত, তা বলা যায়। ক্রিকেট বোর্ড সভাপতির প্রকাশ্য গণমাধ্যমে সাকিবকে আর কোনো ছাড় না দেয়ার ঘোষণা তার বড় প্রমাণ। এক্ষেত্রে সাকিবের ঘাড় মটকানোর জন্য প্রথমে গ্রামীণ ফোনের সঙ্গে সাকিবের সদ্য সম্পাদিত চুক্তিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন দেখা গেলো ওই চুক্তি নিয়ে বেশিদূর যাওয়া যাবে না। বড় জোর সাকিবকে একটি শোকজ করা যেতে পারে, তখন জুয়াড়ির সঙ্গে সাকিবের কথোপকথনের ইস্যুটি সামনে আনা হয়েছে বলে মনে হয়।

আইসিসির আইন অনুসারে আকসুকে অথবা নিজ দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে জুয়াড়ির প্রস্তাবের বিষয়টি জানালে হবে। যে নিয়ম বলে তামিম পার পেয়ে গেছে। আমার ধারণা তামিমের মতো সাকিবও বোর্ডকে জানিয়েছিলেন মৌখিকভাবে। ফলে এতদিন ওই ঘটনা নিয়ে উচ্চবাচ্য হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি যেহেতু সাকিব নেতৃত্ব দিয়ে ক্রিকেটারদের দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেছে সেহেতু তাকে শায়েস্তা করতে ওই ইস্যুকে সামনে আনা হয়েছে। না হলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যদি আইসিসিকে জানাতো যে, তারা তামিমের মতো সাকিবের বিষয়টিও জানে,  তাহলে হয়তো এত বড় সাজার খড়গ সাকিবের ওপর নেমে আসতো না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভূমিকা খতিয়ে দেখা উচিত।

বিসিবি সভাপতিসহ অনেকে সাকিবের ওপর সন্তুষ্ট নয়, এটা নতুন কিছু নয়।  ২০১৪ সালের দিকে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ চলাকালে সাকিবপত্নীর সঙ্গে দর্শকের গ্যালারিতে অশোভন আচরণকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিসিবি সাকিবের পাশে দাঁড়ায়নি। বরং স্ত্রীকে রক্ষার ঘটনায় সাধুবাদ না জানিয়ে বিসিবি সাকিবের ওপর আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করেছিল।
শুধু পদ্মাপারে নয়, গঙ্গাপারেও বড় আপন হয়ে গিয়েছিলেন সাকিব। একমাত্র বাঙালি ক্রিকেটার হিসেবেও একসময়ে সাকিব প্রতিনিধিত্ব করেছেন নাইট হিসেবে। ৭ বছর ধরে খেলেছেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ-এর (আইপিএল) দল কলকাতা নাইট রাইডার্স-এ। দু’ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কেকেআর। কলকাতার জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। এহেন সাকিবের মাঠের বাইরে থাকা মেনে নিতে পারছে না কলকাতা।

আপনারা যাই বলুন, সাকিব যদি ভারতের হত এই বিড়ম্বনায় তাকে পড়তে হত বলে মনে করি না। এমন কি জগমোহন ডালমিয়া যদি বেঁচে থাকতেন তাহলেও এমন কাণ্ড ঘটত না। তবে মনের মধ্যে একটা প্রত্যয় আছে ডালমিয়ার আসনে এখন সৌরভ, কলকাতা টেস্টের আগে যদি সাকিব নিয়ে ভেলকিটি দেখান। কিন্তু সমস্যা এই যে বিসিবি তো সাকিবের পক্ষে লড়াই শুরু করছে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/এমআর