ভিঞ্চির আবিষ্কৃত ‘পিপিই’ এখন মহামারি সংক্রমণ ঠেকাচ্ছে!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ভিঞ্চির আবিষ্কৃত ‘পিপিই’ এখন মহামারি সংক্রমণ ঠেকাচ্ছে!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:০৫ ৩ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৮:২১ ৩ এপ্রিল ২০২০

ছবি: পিপিই পরিহিত চিকিৎসকরা

ছবি: পিপিই পরিহিত চিকিৎসকরা

আপাদমস্তক শরীর ঢেকে রাখা সাদা এক ধরনের বিশেষ পোশাক। বর্তমানে সবাই কমবেশি এটি চিনে থাকবেন! এই বিশেষ পোশাকটির নাম পিপিই। শব্দটি শুনেই নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন!

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে চিকিৎসকরা ব্যবহার করছেন পিপিই। এর পূর্ণ রূপ হলো ‘পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট’। অর্থাৎ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম। এরই মধ্যে পিপিই’র সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত হয়েছেন!

ডাক্তার পিপিই পরছেন২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরের একটি মাছের বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। বাদুড় এবং সাপের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে এমন ধারণা করা হয়। তবে বিতর্ক রয়েছে অনেক। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে এ মরণঘাতী ভাইরাস। যাতে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। আর এ মহামারিতে এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫২ হাজারে। প্রতি মুহূর্তেই দীর্ঘ হচ্ছে এর সংখ্যা। তবে দুই লাখের বেশি মানুষ সংক্রমণের পর সুস্থ হয়েছেন। 

সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি- কাশি এমনকি সংস্পর্শ থেকে ছড়ায় করোনাভাইরাস। আর এজন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে অনেক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। অনেকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জাও লড়ছেন। তবে নিজেদের সুরক্ষায় তারা ব্যবহার করছেন এই পিপিই। আচ্ছা পিপিই তো চেনেন! তবে কীভাবে আর কবে এটি আবিষ্কার হলো জানেন কি? আর তাই আজকের আয়োজনে থাকছে এই পিপিইর আদ্যোপান্ত। চলুন জেনে নেয়া যাক কোন উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল পিপিই- 

পিপিই এখন চিকিৎসকদের রক্ষাকবচধারণা করা হয়, ষোড়শ শতাব্দীতে চিত্রকার লিওনার্দো দা ভিঞ্চিই প্রথম পিপিই আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি মূলত মাস্কের মতো করেই পুরো মুখ ঢেকে রাখা যায় এমন একটা কিছু তৈরি করেন। এর সঙ্গে তিনি জুড়ে দেন গাউন। তিনি মূলত রংয়ের রাসয়নিক গন্ধ থেকে বাঁচতে এটি তৈরি করেন। পরবর্তীতে ভিঞ্চির তৈরি এই পোশাক ব্যবহার করা হয় রাসায়নিক যুদ্ধে। যুদ্ধের সময় সৈন্যরা বিষাক্ত রাসায়নিক থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পিপিই ব্যবহার করে। এরপর সেখানকার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে বায়ুজনিত শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ঠেকাতে এটির ব্যবহার শুরু হয়।

১৭ শতকে যখন ইউরোপে মহামারি প্লেগ দেখা দেয়। তখন ডাক্তাররা পিপিই হিসেবে অদ্ভূত রকমের একটি পোশাক পরতেন। পিপিই হচ্ছে এমন একটি পোশাক যা জীবাণুর সংক্রমণ ঠেকাতে পারে। এজন্য এটি তৈরিতে এমন কাপড় ব্যবহার করা হয়, যা কোনোভাবেই তরল শুষে নেবে না। সেই সঙ্গে এই কাপড়ে এমন সব পদার্থ ব্যবহার করা হয় যাতে কোনো ধরনের তরলকে এটি ধারণ না করে। সেটা যেন গড়িয়ে পড়ে যায়। পিপিই থাকবে সম্পূর্ণ শুষ্ক।

অপারেশনের সময়ও ডাক্তাররা এটি পরে থাকেনসংক্রমিত বিভিন্ন রোগ থেকে বাঁচতে পিপিই ব্যবহার করা হয়। ধারণা করা হয়, প্লেগের সময় পোশাকটি ফরাসি চিকিৎসক চার্লস ডি’লরমি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি ছিলেন ওই সময়ের ইউরোপের রাজাদের চিকিৎসক। তবে যে তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পোশাকটি বানানো হয়েছিল সেটি ভুল ছিল। তাই এটি প্লেগের মহামারি ঠেকাতে পারেনি। সে সময় ডাক্তাররা যে পিপিই পরতেন, তার মধ্যে ছিল একটি লম্বা কোট, এর বাইরের আবরণে মোমের প্রলেপ দেয়া হতো। 

এছাড়া তারা ছাগলের চামড়ার তৈরি টুপি আর গ্লাভস পরতেন, চোখে থাকত চশমা। হাতে থাকত একটি লাঠি, পায়ে বুট জুতা। হাতের লাঠির সাহায্যেই তারা দূর থেকেই রোগীদের সেবা করতেন। তখনকার পিপিই এর সবচেয়ে চমকপ্রদ জিনিস ছিল মাস্ক। এটি দেখতে ছিল পাখির ঠোঁটের মতো। নাকের কাছ থেকে শুরু হওয়া এই ঠোঁট ছিল আধা ফুট লম্বা। নাকের পাশে দুটি ছোট ছিদ্র ছিল। যা নাক দিয়ে নিশ্বাস নেয়ার জন্য। ঠোঁটের ভেতর পারফিউম, সুগন্ধি, ফুলসহ বিভিন্ন পদার্থ রাখা হতো। ডাক্তাররা থেরিয়াক নামে এক ধরনের ওষুধি মিশ্রণ ব্যবহার করতেন। যাতে ৫৫ ধরনের পদার্থ থাকত। 

পিপিই পরিহিত ডাক্তাররা১৯০৫ সালে পিপিইর সঙ্গে গাউন আর গ্লাভস অন্তর্ভুক্ত করে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। ১৯০৭ সালে সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য আলাদা করে নতুনভাবে তৈরি করা হয় পিপিই। ১৯৭০ এর দশকে বিশ্বের প্রায় ৯৩ শতাংশ হাসপাতালেই পিপিই এর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। ১৯৮০ সালের পর ১৯৮৩ সালে সিডিসি একটি ম্যানুয়াল প্রকাশ করে। সেখানে তারা জীবাণু এবং বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে কীভাবে পিপিই ব্যবহার করতে হবে তার গাইডলাইন দেন। কারণ সঠিক ব্যবহারের অভাবে পিপিই কোনো কাজে আসছিল না। 

মরণব্যাধি এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পরে পিপিই এর ব্যবহার বেড়ে যায়। কারণ শুরুতে কীভাবে এটি ছড়ায় সে বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা ছিল না। ১৯৮৫ সালে ত্বকের নানা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যবহার করা হতো পিপিই। আবিষ্কারক ডি’লরমি ধারণা করেছিলেন, পাখির মতো ঠোঁট থাকায় এর সুগন্ধির মিশ্রণে প্লেগের দূষিত বাতাস ডাক্তারদের নাক এবং ফুসফুসে যেতে বাধা দেবে। তবে এ উদ্ভট পিপিই কোনো কাজেই আসেনি। কারণ প্লেগ কোনো দূষিত বাতাসের মাধ্যমে তা ছড়াতো না। এর জন্য দায়ী ছিল এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। 

অতীতের পিপিই দেখতে এমনই ছিলএই ব্যাকটেরিয়াটি ইঁদুরের ফ্লি এর কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে আসে। ২০১৪ সালে ইবোলা সংক্রমণ ঠেকাতে চিকিৎসকরা পিপিই ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়াও অনেক সময় অস্ত্রোপচার করতে চিকিৎসকরা পিপিই পরে থাকেন। তবে ১৭ শতকের উদ্ভট এই পোশাকটি পরবর্তিতে অনেক বিখ্যাত হয়েছিল। এখন সুরক্ষায় ব্যবহার হলেও ইতালিয়ান অপেরা, নাটক, ফেস্টিভেলে এ অদ্ভুত মাস্কের অনেক ব্যবহার দেখা যায়।

এ পোশাক সেসময় ডাক্তারদের নির্দিষ্ট করা গেলেও রোগ প্রতিরোধে কোনো কাজে আসেনি। তবে সেদিন রক্ষা না করতে পারলেও আজকের করোনা মহামারিতে আধুনিক পিপিই কিন্তু ঠিকই চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষিত রেখেছে। পিপিই বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তবে তা নির্ভর করে কী ধরনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।

পিপিই পরিহিত এক ব্যক্তিবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পর্যাপ্ত সুরক্ষার জন্য পিপিই-তে মোট পাঁচটি উপকরণ থাকা উচিত। এগুলো হলো-  ১. জুতার কভারসহ গাউন; ২. গ্লাভস; ৩. মুখের আবরণ (ফেস শিল্ড) ; ৪. চোখ ঢাকার জন্য মুখের সঙ্গে লেগে থাকে এমন চশমা বা গগলস এবং ৫. মাস্ক।

ব্যবহারকারীকে এটি পরার পর মেনে চলতে হয় বেশ কিছু সতর্কতা। সঠিক উপায়ে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করে পিপিই পরতে এবং খুলতে হয়। কারণ এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অনেক সময় পিপিই দূষিত হয়ে পড়তে পারে। পিপিই যাতে অবশ্যই মুখ, নাক ও চোখ রক্ষা করে সে ব্যাপারেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস