ভাষার মাসের শপথ হোক বাঙলা ভাষার আগ্রাসন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২৪ ১৪২৭,   ২৪ রজব ১৪৪২

ভাষার মাসের শপথ হোক বাঙলা ভাষার আগ্রাসন

 প্রকাশিত: ১৪:৪৩ ১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৭ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

অমিত গোস্বামী
পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমি প্রথম জেনেছিলাম যে প্রস্তর যুগে যখন শিকার ও আহরণের সাহায্যে মানুষ জীবনধারণ করত তখন তারা সৃষ্টি করেছিল ভাষা। উদ্দেশ্য পারস্পরিক ভাবপ্রকাশ। ক্রমে স্থান ও কালের নিরিখে তার আঙ্গিক হলো বহুবিধ। একইভাবে ভারতীয় উপমহাদেশীয় অঞ্চলে অনেকগুলি ভাষার সৃষ্টি হলো। কিন্তু সেই ভাষার উপস্থিতি চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হল যাকে বলা হয় লিপির প্রচলন।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির প্রচলন ছিল। এরও বহু পরে খ্রিস্টপূর্ব দুইশত পঞ্চাশ অব্দের প্রায় কাছাকাছি সময়ে সম্রাট অশোকের লিপি সৃষ্টি হয়েছিল। তারও পর কুণাল লিপি, গুপ্ত আমলে গুপ্ত লিপি, মৌর্য লিপি, আর্যলিপি, কুটিল লিপি ইত্যাদির সৃষ্টি হয়েছিল। এক হাজার খ্রিস্টাব্দের সময় নাগাদ প্রাচীন বাংলা লিপির সৃষ্টি হয়েছিল। সৃষ্টি হলো বাংলা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা। বিশ্বে প্রায় পাঁচ হাজার ভাষায় মানুষ কথা বলেন। যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশই হলো আফ্রিকার ব্যবহৃত ভাষা। এদের অনেকেরই বর্ণমালা নেই।  

তবে পৃথিবীতে একশো কোটিরও বেশি মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন, সেটি হলো চীনা ভাষা। চীনা শব্দে প্রায় সত্তর হাজার চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। পনেরোশো শতক আধুনিক ইংরেজির সূচনা হয়। ১৬০৪ সালে প্রথম ইংরেজিজ শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে এখানকার আধুনিক ইংরেজি শব্দের প্রচুর ফারাক আছে। স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেন পৃথিবীর প্রায় তেত্রিশ কোটিরও বেশি মানুষ। চিলি, মেক্সিকো, পানামা, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, কিউবা, গুয়েতামালা, গিনি, কিউবা, নিকারাগুয়া, প্যারাগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, এল সালভাদর ইত্যাদি দেশের রাষ্ট্রভাষাই হলো স্প্যানিশ। এমনকি কানাডা মরক্কো ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রেও স্প্যানিশ ভাষার চর্চা হয়। ব্রাজিল, এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশে এবং পর্তুগালে, পতুর্গিজ ভাষায় কথা বলেন সাড়ে তেরো কোটিরও কিছু বেশি মানুষ। ফরাসি ভাষায় বিশ্বে প্রায় দশ কোটি মানুষ কথা বলেন। ফ্রান্স তো বটেই, সুইজারল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম, কানাডা, আফ্রিকা, ইতালি দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রায় ফরাসি ভাষা ব্যবহৃত হয়। রোমান ভাষায় কথা বলেন বলকান ও রোমানিয়ার আড়াই কোটি মানুষ। স্পেন নানা দেশে তাদের উপনিবেশ বিস্তার করতে শুরু করার সঙ্গে তাদের ভাষাও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে আমেরিকার প্রায় সব জায়গায়ই।

মাতৃভাষাই সমস্ত গোষ্ঠীকে এক জাতিতে একত্রীভূত করে। কবি একদা লিখেছিলেন, ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা...’। আমাদের এই বাংলা ভাষা এমনই এক ঐতিহ্য আছে যা কিনা বৃহৎ এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আগলে রেখেছে নিজস্ব বনেদিয়ানায়। বস্তুত ভাষাকে মাধ্যম করেই এক একটি অঞ্চল বিশেষে এক একটি জনজাতির সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষার ব্যবহার এখন পৃথিবীর এক বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত ভাষা। পৃথিবীর জনসংখ্যার নিরিখে প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। বিশ্বে বহুল প্রচারিত ভাষাগুলির মধ্যে সংখ্যানুসারে বাংলা ভাষার স্থান পঞ্চম। বাংলা ভাষাটি মূলত ইন্দো-আর্য ভাষা। সংস্কৃত পালি ও প্রাকৃত ভাষার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। খ্রিস্টায় প্রথম সহস্রাব্দের শেষ দিকে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলির অপভ্রংশ থেকে যে আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির উদ্ভব হয়, তার মধ্যে বাংলা একটি। বাংলা ভাষার ইতিহাস তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ১) চর্যাপদ (৯০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ), ২) মধ্য বাংলা (১৪০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) এর মধ্যে চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ ধরা হয়। ৩) আধুনিক বাংলা (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ)। তবে ভাষারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলা ভাষার কথ্য রূপের জেলাভিত্তিক কিছু কিছু প্রভেদ থাকলেও বাংলা ভাষার লিখিত রূপ বিশেষ করে সাহিত্যে, ইতিহাস, সংবাদপত্রে, গান ইত্যাদিতে এই ভাষা ব্যবহারকারীকে বাঙালি বলে পরিচয় দেয়।

সমসাময়িক বিশ্লেষণে এটা দেখা যায়, বাংলা ভাষার ঐতিহ্য সম্বন্ধে বাঙালির যে অতীত গৌরব ছিল, তা এখন অনেকখানি ইতিহাসে পরিণত। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন, ভাবের ঘরে চুরি করার মতোই এই ‘মহান একুশে’ বা ‘উনিশে মে’ পালন করে সত্যিই কি বাংলা ভাষার ব্যবহার বা প্রয়োগের ব্যবহারিক দিক মসৃণ হচ্ছে। বিভিন্ন সাহিত্যসভা বা সেমিনারে প্রথিতযশা সাহিত্যিককে সংশয় প্রকাশ করতে দেখা যায় বাংলা ভাষাটাই আদৌ ‘মোদের গরব মোদের আশা’ আছে কিনা। গত শতকের মাঝামাঝি বাংলাদেশের রফিক, বরকত, আব্দুল, জব্বার-এর মাতৃভাষার জন্য আহুতি দানকে এতগুলো বছর পরও স্মরণ করে, আবেগ আতিশয্যে প্রতিবছর ‘ভাষা শহিদ দিবস’ পালন করে আত্মপ্রসাদ লাভ করই।  শুধু। কতই না উদার কণ্ঠে, সোচ্চারে বা ব্যানার লিখনে, পত্রিকার ক্রোড়পত্র জুড়ে ওই কিছু সময় চলে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’র চর্বিতচর্বণ। হয়তো এই আকুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ত বটেই  বাংলাদেশেও   মাতৃভাষার ব্যবহার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। চালু হচ্ছে উদ্ভট বাংলা। বাংলা ভাষাটাই যেন কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। এখন তো প্রকৃত বাংলার সঙ্গে ইংরাজি ভাষার মিশেল দেখে দেখে, শুনে আমরা এতটাই ধাতস্থ হয়ে গেছি যে এই জগাখিচুরির ব্যাপারে আর কোনো তাপ-উত্তাপ বোধ করি না। জেন ওয়াইয়ের সঙ্গে পূর্ববর্তী প্রজন্মও ইন্টারনেটে ট্যুইটার ফেসবুক চ্যাটে মোবাইল বার্তাতেও মিশ্র ভাষায় দিব্যি সড়গড় হয়ে গেছি। অযথা তত্ত্বকথায় ভারী ভাষার মাসের আবেগ আতিশয্যের বাহুল্যতা অনেকটাই আপেক্ষিক মাত্র। এই বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন চাহিদা সত্ত্বেও ভাষার মিশেল যেন ঐকান্তিক হয়ে উঠেছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত একটা রব প্রায়ই ওঠে যে বাংলা বই পড়ার অভ্যেস বা পাঠকের সংখ্যাও দিনকে দিন কমে আসছে। এই সর্বনেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়া মানুষকে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নততর করলেও মানুষের বাংলা পাঠের অভ্যাসকে গ্রাস করছে।

এমন একটা কথাও প্রায়ই ঘুরে ফিরে আসে বাঙালিই নাকি বাংলা ভাষাটাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে। ইংরাজি শিক্ষার মূল্য, কথন ও পঠনপাঠনেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইদানীং বিশেষ করে বাংলা বইয়ের পাঠক সংখ্যা কিন্তু বাড়েনি। যদিও কলকাতা বইমেলার কিছু মানুষ ধুয়ো তোলে তারা এখানে প্রতিবছর কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। তবে সেখানে বাংলা বই কত আদৌ বিক্রি হলো, তা জেনেও না জানার মতো ভান করে তারা এ কথা বলেন। তবে বাংলাদেশের ‘একুশের বইমেলার’ ব্যবসা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সহস্রাব্দের সূচনায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে খাতায় কলমে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ রূপে উদযাপন করার ডাক দিয়েছে। এক যোগে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে, ভাষাপ্রেমী জনগণের কাছে যা প্রভূত তাত্পর্যপূর্ণ। আমরা এই দিনটিকে যথাযথ মর্যাদা-সহ পালন করছি নানা উত্সব-অনুষ্ঠান-সেমিনার-বক্তৃতা-কবিতা পাঠের আসর ইত্যাদির স্মরণে-বরণে। কিন্তু উত্তরণের পথ খুঁজি কতটুকু? বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে আমরা এখনো বাংলা ভাষায় ব্যবসায়িক ও দাফতরিক কাজ করতে দ্বিধা বোধ করি। আমরা উত্তর প্রজন্মকে শেখাই না শুদ্ধ বাঙলায় একটা আবেদনপত্র লিখতে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা তো বহুদূরের ব্যাপার। এখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। কীভাবে পারে? একথা সত্যি যে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক পটভূমিকায় ক্রমশ পিছনে ফেলছে ভারতকে। পশ্চিমবঙ্গ বহুভাষাভাষী ভারতের অংশ। কাজের তাদের চলতে হবে সর্বভারতীয় ভাষার প্রেক্ষিতে। কিন্তু বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশের ভাষা বাঙলা। বাংলাদেশে জীবিকার জন্যে আসছেন অনেক ভিনদেশি নাগরিক। ব্যবসায়িক ও দাপ্তরিক কাজ বাংলায় চালু করলে ভিনদেশিদের জীবিকার প্রয়োজনে বাংলা শেখা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। আমরা ইংরেজি শিখব না, তা নয়, অন্যদের বাধ্য করব বাঙলা ভাষা শিখতে। একেই বলে ভাষা আগ্রাসন। নিজের ভাষার প্রসারের জন্যে এইটুকু আক্রমণাত্মক হতে বাধা কোথায়? 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/আরএজে