ভালোবাসায় ভয় যাদের

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪২৬,   ১৮ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

ভালোবাসায় ভয় যাদের

 প্রকাশিত: ১৪:০৭ ১২ জুন ২০১৮   আপডেট: ১৪:০৮ ১২ জুন ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আনিতা। দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ২৩ বছরের তরুণী। রুপে গুণে কোথাও যেন তার কমতি নেই। খুবই হাসিখুশি বলেই চেনে তাকে সবাই। তাই তাকে পছন্দ করে কিংবা ভালবাসে এমন তরুণের সংখ্যাও নেহায়াত কম নয়। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল সেখানেই। আনিতার যেন এসবে ঘোর আপত্তি। কিছুতেই সে এসব সম্পর্কে জড়াতে চায়না।কারো প্রেমের প্রস্তাব সে যতটুকু পারে এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করে।কেউ কাছে আসতে চাইলেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় , সে ঘামতে থাকে কী যেন এক অজানা ভয় তাকে ঘিরে ধরে। মাঝে মাঝে সে নিজেও বুঝতে পারেনা কিসের এত ভয়। ভালবেসে সে কষ্ট পাবে, কেউ তাকে ছেড়ে যাবে এর চেয়ে তার কাছে আজীবন একা থাকাটাই যেন তার কাছে বেশি পছন্দনীয়।

কি আপনাদের অনেকের সাথে মিল মনে হচ্ছে গল্পটা ? মনে হচ্ছে যে আরে গল্পটাতো আমারই? তবে জেনে রাখুন শুধু আপনার না এই গল্পটা ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথের(Elizabeth-I) ও । সে সময় অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ডিউকরা তার পাণিপ্রার্থী ছিলেন। কিন্তু এক দুইজনের সাথে ঘনিষ্টতা থাকলেও তিনি কখনও বিয়ে করেননি। বিয়ে নিয়ে তিনি বলেছিলেন-“ I would rather be a beggar and single than a queen and married.” কিন্তু এর কারণ কি ছিল? এর কারণ ছিল ভয়। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি শৈশবে তার বাবার ( রাজা অষ্টম হেনরি ) দ্বারা তার মায়ের পরকীয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছিলেন।এবং সেই থেকেই তার এই ভয়। হ্যাঁ, ভালবাসার ভয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা এই ভয়ের নাম দিয়েছেন ফিলোফোবিয়া।

ফিলোফোবিয়া শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ থেকে । ফিলোস বা ফিলিয়া শব্দের অর্থ ভালবাসা বা আসক্তি এবং ফোবিয়া শব্দের অর্থ ভয় বা আতংক। সহজ কথায় প্রেমে পড়ার ভয় ! মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায় - The irrational and unwarranted fear of falling in love.

খুব অদ্ভুত মনে হলেও আমাদের আশেপাশেই অনেকের গল্পটা এমন।মনোবিজ্ঞানীদের মতে অতীত কোনও দুঃসহ স্মৃতি , শৈশব অথবা কৈশোরের প্রেম ঘটিত কোনও বিরহ কাছ থেকে দেখা, প্রথম প্রেমে প্রত্যাখাত এই ভয়ের কারণ হতে পারে। মাঝে মাঝে পিতামাতার বিবাহ বিচ্ছেদ ও শিশুমনে ভালবাসার প্রতি একটা বিরূপ ধারনা তৈরি করে। মাঝে মাঝে সামাজিক কিংবা ধর্মীয় বিধিনিষেধ মানুষকে ভালবাসতে বাঁধা দেয়। সেখান থেকেও ভালবাসার প্রতি একটা ভয় জন্ম নেয়। মাঝে মাঝে ব্যাক্তিগত হতাশা কিংবা পছন্দের মানুষের কাছ থেকে বারবার কষ্ট পাওয়া থেকেও এই ভয়ের সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরনের মানুষের তাই সবসময়েই মনে হয় সকল সম্পর্ক মানেই বুঝি দুঃখ , কষ্ট আর হতাশা।

এই ধরনের মানুষেরা প্রেমে পড়লেই আতংকিত হয়ে পড়েন। তারা তাদের পছন্দের মানুষ থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।তারা তখন এক ধরনের মানসিক অশান্তিতে ভুগেন। তাদের কাছে মনে হতে থাকে ভালবাসলেই বুঝি মানুষটি হারিয়ে যাবে। তাই তারা ভালোবাসা থেকে একশো হাত দূরে থাকেন। কেউ তাদের প্রেমের প্রস্তাব দিলেও তারা তা সহজভাবে নিতে পারেনা। তাই তারা সবসময়েই এসব মানুষ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন ।

কীভাবে আপনি বুঝবেন আপনার এই সমস্যাটি আছে :



ফিলোফোবিয়া নানাভাবে প্রকাশিত হতে পারে। কেউ কেউ প্রেম ভালোবাসা থেকে আজীবন দূরে থাকেন। তারা বেশিরভাগ সময় কারো সামনে নিজেকে খুলে ধরতে ভয় পান এবং যে কোনও ধরনের সম্পর্ক এড়িয়ে যান। তবে বেশিরভাগ ফিলোফোবিক রোগী সম্পর্কে জড়ান। কিন্তু এই যে তাদের এই অবচেতন মনের ভয় এটিই পরবর্তীতে তাদের সম্পর্কে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা হয়ে পড়েন খুব সন্দেহপ্রবন ও সংকীর্ণমনা । এবং এই যে তাদের এই দুশ্চিন্তা এটি তাদের পছন্দের মানুষ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দেয় এবং ফলাফল আলাদা হয়ে যাওয়া কিংবা ব্রেকাপ যেটা তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। এভাবেই তাদের সব সম্পর্কের ইতি ঘটে এবং না চাইতেও তারা এই ব্রেকাপ সাইকেলে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়াও তাদের মধ্যে যে শারীরিক লক্ষন দেখা যায় :

তীব্র ভয় বা প্যানিক

অনিয়মিত হৃদস্পন্দন

অতিরিক্ত ঘাম

শ্বাসকষ্ট

বুকে ব্যথা

কম্পন অনুভূতি

চরমভাবে এড়িয়ে চলার প্রবনতা যেকোনো ভীতিমূলক রোগের প্রধান লক্ষণ। সুতরাং ফিলোফোবিক রোগী যেকোনো ধরনের রোমান্টিক জায়গা অথবা বিয়ের অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন। শুধু তাই নয় তাদের রোমান্টিক গান কিংবা মুভিতেও রয়েছে চরম এ্যালার্জি।

এই রোগের চিকিৎসা :
যে কোনও ধরনের ভীতিমূলক রোগেরই রয়েছে চিকিৎসা। ফিলোফোবিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। সমস্যা খুব সহজেই সমাধান হতে পারে যদি ফিলোফোবিক রোগী এই নিয়ে মন খুলে কথা বলেন। এছাড়াও মনোবিদেরা শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ গুলির জন্য এ্যন্টি ডিপ্রেসেন্ট ওষুধ দিয়ে থাকেন।

তবে যেকোনো ভীতিমূলক রোগের জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হচ্ছে জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি (CBT)।সিবিটি নেতিবাচক ধারনা , ভয়ের উৎস এবং পরিবর্তনে সাহায্য করে।

এক্সপোজার থেরাপিতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সাহায্যে কৃত্রিম রোমান্টিক পরিবেশ সৃষ্টি করে চিকিৎসা করা হয়।
এবং হিপনোথেরাপিতে হিপনোটিসমের মাধ্যমে রোগীদের মধ্য থেকে প্রেম বিষয়ক নেতিবাচক ধারনা কমানোর চেষ্টা করা হয়।



যদি এমন কাউকে ভালবেসেই ফেলেন তাহলে তার প্রতি সহানভূতিশীল হন। তাদেরকে ভালোবাসা দিন এবং তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করুন। নিজে ফোবিয়া সম্পর্কে জানুন ।

ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। আমরা সবাই ভালোবাসা পেতে চাই। এমনকি একজন ফিলোফোবিক ও ভালবাসার আশা করে। তারা নিজেও বুঝতে পারে এই ভয় অমূলক। তবে এই ভয় দূর করা অসম্ভব ও না। শুধু দরকার মনোবল এবং পছন্দের মানুষটির ভালবাসা। তাহলেই একজন ফিলোফোবিক আবার ভালোবাসায় বিশ্বাস খুঁজে পাবে এবং ভালবাসবে মন খুলে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics