Alexa ভারতে যদি একজন শেখ মুজিব থাকতেন!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২১ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ৭ ১৪২৬,   ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

ভারতে যদি একজন শেখ মুজিব থাকতেন!

 প্রকাশিত: ১৬:০৫ ৯ জানুয়ারি ২০২০  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

ছাত্র আন্দোলন তখনই তীব্রতম গতি আহরণ করে যখন দেশের রাজনৈতিক দল কোনো দিশা দেখাতে না পারে। 

ছাত্ররা নিজেদের দাবি বা অধিকারের জন্যে যখন আন্দোলন করে তা একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা তখনই পথে নামে যখন বিরোধী রাজনীতি তাদের প্রত্যাশিত দিক নির্দেশ করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে যে বিক্ষোভ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল সংগঠিত করছে তা ছাত্রসমাজের কাছে খুব নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে না বলে ভারতে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে জ্বলে উঠছে আগুন। ক্রমশই এই আন্দোলন হয়ে উঠছে গণআন্দোলনের মুখ। অনেক রাষ্ট্রই একে ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে নিশ্চুপ থাকলেও এই সমস্যা আর শুধু ভারতের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। যেমন ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র ‘পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ ছিল না। নাগরিকত্ব আইন ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এই আইনের সংশোধনীর একটি অংশ যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা হয়েছে তা যে অসাম্প্রদায়িক নয় ও অমানবিক তা সহজবোধ্য। আপত্তি সেখানেই এবং আপত্তিটা আজ আর ভারতের সীমানায় আবদ্ধ নেই। আবদ্ধ নেই রাজনীতির আঙিনায়, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে।

পৃথিবীর প্রথম ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল চীন দেশে, খ্রীষ্টপূর্ব ১৬০ সালে৷ ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পড়ুয়া শাসকের কয়েকটি নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন৷ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ৷ সাধারণ মানুষও সেই আন্দোলনে যোগ দেন৷ ব্রিটিশ শাসনে ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে ধর্মঘটের পথে পা বাড়িয়েছিল ছাত্ররা। সফল সেই ধর্মঘটের হাত ধরেই শাসকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সেই সূচনা এদেশের ছাত্রদের। যার প্রভাব পড়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯০৬ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে বহু ছাত্র আন্দোলন দেখেছে দেশবাসী। সেই সময় শুধুমাত্র বাংলাতেই যে ১৮৪ জন বিপ্লবীর সাজা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৬৮ জনই ছিল ছাত্র। ১৯১২ সালে আমেদাবাদে সর্বভারতীয় কলেজ ছাত্রদের সম্মেলনের আওয়াজ ছিল, ‘আগে চরকা স্বরাজ, পরে শিক্ষা’। স্কুল,কলেজ বয়কটে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। ১৮৪৮ সালে এদেশে প্রথম ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে দাদাভাই নভরোজির হাত ধরে, নাম ছিল ‘দ্য স্টুডেন্টস সায়েন্টিফিক অ্যান্ড হিস্টোরিক সোসাইটি’। সেই অর্থ এটি ছিল বিতর্ক-আলোচনার মঞ্চ, সেই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছাত্রছাত্রীদের সোচ্চার হওয়ার শুরু। ভারতের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে ছাত্ররা ছিলেন সামনের সারিতে৷ ১৯৪২ সালের ভারত-ছাড়ো আন্দোলনে ছাত্ররা তীব্রভাবে মুখর হয়ে ওঠে৷ ১৯৪৭ সালের আগে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দি সেনাদের মুক্তির দাবিতে ছাত্ররাই পথে নেমেছিলেন৷ ১৯৪৬ সালে ক্যাপ্টেন রাশিদ আলির বিচারের সময় পড়ুয়ারা উত্তাল বিক্ষোভ দেখিয়েছেন শহরের রাজপথে৷ সেই সময় চলে পুলিশের গুলি, মারা যান কিছু পড়ুয়া৷ তবু পিছু হটেনি তারা৷

কিন্তু স্বাধীনতার পরে ছাত্র আন্দোলনের মূল ধারাটি চলে যায় পূর্ব-পাকিস্তানে। দেশভাগের মাত্র সাত মাস পরে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে আন্দোলন করতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের পুলিশ বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করে তাদের বিক্ষোভ জানাতে হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা গড়ে তোলেন ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। যে নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা মেনে স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ মিছিলে নামে তারা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ গুলি চালায়। নিহত হন ছাত্রসহ বেশ কিছু সাধারণ মানুষ। গর্জে ওঠে ছাত্র সমাজ। চাপের মুখে ছাত্রদের দাবীর কাছে মাথা নোয়ায় সরকার। বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। বিরোধী দলের ম্রিয়মাণ ভূমিকায় ক্ষুব্ধ তরুণ ছাত্রনেতা এই সময়ে প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী লীগ। ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আইয়ুব খান শিক্ষা কমিশন গঠন করেন এবং তার রিপোর্ট বার করেন ১৯৫৯ সালের অগাস্ট মাসে। রিপোর্টে সাম্প্রদায়িক চেতনা প্রকটিত হল এবং শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে বর্ণনা করা হল। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে ছাত্র সমাজ। ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি হোসেন শহিদ সোওরাওয়ার্দী গেফতার হতেই শুরু হয় ছাত্র ধর্মঘট ও তীব্র আন্দোলন। ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্ররা ডাকে দেশব্যাপী হরতাল। এদিন পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হন। ১৯৬৮ সালের ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত হয় ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ এবং তারা ১১ দফা দাবি ঘোষণা করেন যার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বায়ত্ত্বশাসন সংক্রান্ত ৬ দফা দাবি সংপৃক্ত ছিল। ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসভা ও প্রতিবাদ মিছিলে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান গুলিতে নিহত হন। ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণআন্দোলনে। এর পরে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ১৯৯০ এর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনের কথা আমরা জানি যেখানে তারাই মূখ্যভূমিকা নিয়েছিল রাষ্ট্রের ভবিতব্য নিরূপণে।

ভারতে স্বাধীনতা পরবর্তী তিনটি এমন আন্দোলন হয়েছিল যা রাজনীতির কিছুটা প্রভাবিত করলেও অভিমুখ নির্দেশ করতে পারে নি। এই তিনটি আন্দোলন হল। ১৯৬৭-৭০, চারু মজুমদারের ডাকে  বন্দুক তুলে নিয়েছিল দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু পড়ুয়া। তার পর ১৯৭৩-৭৪।  জয়প্রকাশের নেতৃত্বে দেশজুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্র-ছাত্রীরা যার অভিঘাত ছিল চারু মজুমদারের আন্দোলনের থেকে বহু গুণ বেশি। যে আন্দোলনের ধাক্কায় ইন্দিরাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা-সঞ্জয়কে পরাজিতও হতে হয়েছিল নির্বাচনে। তৃতীয় নজির আন্না হাজারের অনশন। সেই আন্দোলনের পাশেও অনেকটা এইভাবে পড়ুয়াদের দেখা গিয়েছিল। নাহ, আর কোন আন্দোলন সেভাবে দানা বাধে নি। ভারতে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ, রামমন্দির নির্মাণ ও এনআরসি নিয়ে যে বিক্ষোভ ছিল তা ছিল শুধু রাজনৈতিক দলের বা তাদের ছাত্র সংগঠনের। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হলেও আন্দোলনে নামেনি। কিন্তু আসামে এনআরসির হাত ধরে নিজভূমে পরবাসী হতে চলেছিলেন প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ যার ১৪ লক্ষ হিন্দু। তাদের বিধিবদ্ধতার আওতায় আনতে আনা হল নাগরিক সংশোধনী আইন। সেখানে অ-হিন্দুদের কথা না ভেবে স্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি করা হলো– মুসলমান ও অমুসলমান। সংবিধান অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে যা জনমানসে সৃষ্টি করল চূড়ান্ত অসন্তোষ। এর মধ্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সঙ্গে এক বন্ধনীতে রাখা হল ভারতের স্বাভাবিক মিত্র বাংলাদেশের নাম। এই আইনের প্রতিবাদে গোটা দেশে পথে নেমেছে ছাত্রসমাজ। শাসক তার মতাদর্শকে সামনে রেখে যেমন আইন প্রণয়ন করতে পারে, সেরকমই তার বিরুদ্ধে যুক্তিগ্রাহ্য, সচেতন প্রতিবাদ জানানোর অধিকারও দেশবাসীর আছে। তাঁদের আছে সেই আইনের পাশে দাঁড়ানোর স্বাধীনতাও। এই প্রতিবাদ, আন্দোলন, পথে নামার অধিকার দেশের সংবিধানই আমাদের দিয়েছে। সেই বলে বলীয়ান ছাত্রসমাজও। সেই অধিকার দিতেই হবে। চিঠি লিখে কেন্দ্রীয় সরকারকে এই কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিল আইআইটি-বেঙ্গালুরুর ছাত্র-শিক্ষকরা।

তার আগেই অবশ্য সিএএ-র বিরুদ্ধে দেশের দিকে দিকে, এমনকি মুম্বই বেঙ্গালুরুর মতো শহরেও ছাত্রবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভয়ঙ্কর পুলিশি তাণ্ডবের ঘটনার অভিযোগ ওঠে। তবু থামেনি প্রতিবাদ। কিন্তু তখনো বুঝতে পারা যায়নি যে, রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসের নিশ্চিত আশ্রয়ে, হস্টেলের নিশ্চিন্ততার মধ্যেও দুষ্কৃতদের হাতে রক্তাক্ত হতে হবে ছাত্র-অধ্যাপকদের যা হল গত ৫ জানুয়ারি দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। শতাধিক মুখোশধারী হিন্দুত্ববাদী ছাত্র ও দুষ্কৃতদের তাণ্ডবে রক্তাক্ত হয়েছে ছাত্র থেকে শিক্ষকরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে ভারতজুড়ে ধিক্কার জানানো হয়েছে। এমনকি বিজেপি নেতারাও ঘটনার নিন্দা করতে বাধ্য হয়েছেন। জেএনইউ’র ছাত্রছাত্রীরা বর্ধিত হোস্টেল ফি’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও পরীক্ষার জন্য নাম নথিভুক্তিকরণ বয়কট করছিলেন। এর পরে নয়া নাগরিকত্ব আইন এবং এনআরসি’র বিরুদ্ধেও দিল্লিতে যাবতীয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পুরোভাগে ছিল জেএনইউ। তার জেরেই এই পরিকল্পিত হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ।

দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলির পড়ুয়ারা পথে নেমে প্রতিবাদ করছে। অক্সফোর্ড সহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। সরকার ৩০৩ আসনের অহঙ্কারে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতেই পারে তারুণ্যের এই দাবি। যদি তারা সফলও হয় এই কাজে, দেশে যদি নির্বাচন ব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে একদিন না একদিন নতুন কোনো সরকার এসে এই আইন বাতিল করবেই। দেশজুড়ে পতাকাবিহীন তারুণ্যের এই জনজোয়ার প্রমাণ করে, জন্ম নিচ্ছে এক নতুন ভারত। দৈনন্দিন রাজনীতি নিয়ে হয়তো এই তরুণসমাজ মাথা ঘামায় না, কিন্তু দেশ সংকটে পড়লে যে তারা পথে নেমে প্রাচীর গড়তে পারে তা আবার প্রমাণ হল। শুধু একটাই আক্ষেপ, ভারতে যদি এখন একজন শেখ মুজিব থাকতেন...।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর