Alexa ভারতে বর্ণহিন্দুবাদের একমাত্র দাওয়াই সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ২ ১৪২৬,   ১৭ মুহররম ১৪৪১

Akash

ভারতে বর্ণহিন্দুবাদের একমাত্র দাওয়াই সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ

 প্রকাশিত: ১৪:৪০ ১৯ আগস্ট ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

একদিন দিল্লি সংলগ্ন উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে আমার কন্যার ফ্ল্যাটের ঘণ্টি বাজল। দরজা খুলতেই উল্টো ঘরের প্রৌঢ় মানুষটি বেশ ঝাঁঝিয়ে হিন্দিতে বললেন– আপনাদের কাজের মেয়েটি আমার কুকুরের ধর্মভ্রষ্ট করেছে।

পেল্লাই একটি কুকুরের মালিক ভদ্রলোকের কথা শুনে চমকে গেলাম। সে কী! কিভাবে ? তিনি বললেন– আপনারা মাছ-মাংস খান। আমরা শুদ্ধ শাকাহারী। আমার কুকুরও তাই। কাল আপনার বাঈ এঁটো ফেলতে যাচ্ছিল। সেখান থেকে একটি মাংসের হাড় নিচে পড়ে যায়। আমার কুকুর বেড়াতে বেরনোর সময় সেটা মুখে তুলে নেয়। এখন আমি এই কুত্তা লেকে কি করি! উস কা তো ধরম ভ্রষ্ট হুয়া।  আমার মুখে কেউ দড়াম করে একটি ঘুষি মারলেও এতটা চমকে যেতাম না। একটু সামলে বললাম– আপনি পাশের মন্দিরের পূজারী-পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করুন। উনি নিশ্চয়ই কোনো শান্তি-স্বস্ত্যয়ন বাতলে দেবেন। এর পরের ঘটনা নিয়মমাফিক। পূজারী এসে বেশ জল ছিটিয়ে যজ্ঞ করে তার ফ্ল্যাট ও কুকুরকে শুদ্ধ করলেন।

ভারতে সম্প্রতি মুসলমানদের প্রতি বৈরি মনোভাব দেখানোর জন্যে প্রচুর কালি-কাগজ–ফুটেজ খরচ হচ্ছে। এই বৈরিতার ঘটনা গত পাঁচ বছরে কত? লিপিবদ্ধ অভিযোগ এক হাজারও ছাড়াবে না। কিন্তু দলিত ও জনজাতির ওপরে বর্ণহিন্দুদের অত্যাচার প্রতি বছরে চল্লিশ হাজারের বেশি। অবাক লাগছে? কিন্তু এটাই সত্যি। মুসলমানরা আলাদা ধর্মের ঢালে প্রায় পুরোটাই সুরক্ষিত। কিন্তু দলিত বা জনজাতি? স্বধর্মের বৃহত্তর গোষ্ঠীর কাছে লাঞ্ছিত।  বর্ণহিন্দুদের ছোটবেলা থেকে একটা কথা শুনে বড় হতে হয় তা হলো– আর যাই করো, নমশূদ্র আর মুসলমানকে বিয়ে কর না। দু’এক জন করে ফেলেন যদিও, কিন্তু তাদের হিসাব শতাংশের হিসাবে উপেক্ষণীয়। অথচ প্রগতিবাদী সাজতে বর্ণহিন্দুদের বৈঠকখানা এখন কিন্তু সবার জন্যে খোলা। কিন্তু শোবার ঘর বা ঠাকুর ঘরে অন্য বর্ণ বা ধর্মের প্রবেশ নিষেধ। বর্ণহিন্দুদের ছেলেমেদের সংরক্ষিত আসনের ছাত্রছাত্রীদের শ্লেষবর্ষণ করতে নিয়মিত দেখা যায় । কথায় কথায় বলে ফেলে– সোনার চামচ, সোনার টুপি। তীব্র শ্লেষ সুযোগ পেলেই উগড়ে দেওয়া হয় দলিত ও জনজাতির ছাত্রছাত্রীদের প্রতি। অথচ ভারতে মোট চাকরির মাত্র ২/৩ শতাংশ সরকারি। বাকিটা বেসরকারি। সেখানে এদের জায়গা নেই। বেসরকারি চাকরিতে এদের যোগ্যতা থাকলেও এলে বলা হয় – আপনি সরকারি চাকরির আবেদন করছেন না কেন? ওখানে আপনাদের কত্তো সুযোগ। আমি আমার ব্যক্তিজীবনে প্রচুর চাকরিপ্রার্থী নির্বাচন করেছি। দেখেছি দলিত শ্রেণির বা জনজাতির প্রার্থীকে নির্বাচন করলেই বাধা আসে।  মানবসম্পদ উন্নয়ণ বিভাগ থেকে। কেন নিচ্ছেন? দু’দিন পরে সরকারি চাকরিতে চলে যাবে। কোম্পানির ক্ষতি। অথচ যখন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান ‘মেধা’তালিকায় কম নম্বর পেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট কোটায় ভর্তি হয়ে পাস করে আসে, তখন তাদের নিম্নমেধা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না। কেউ খোঁজও নেয় না যে অর্থের ভেলকিতে পাস করা এই ছেলেরা কতটা সংস্থার কাজে লাগবে। 

বৈষম্য ও সহিংসতার কারণে পিছিয়ে পড়া এই সমাজের লোকেরা যে কিভাবে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয় তার সাম্প্রতিক প্রমাণ ডক্টর পায়েল তদভির আত্মহত্যা মামলার বিবরণ। জনজাতি বা আদিবাসী বলে চিহ্নিত মহারাষ্ট্রের ভিল (তদভি) সম্প্রদায়ের পায়েল ডাক্তারি পাশ করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে প্রবেশ করেছিলেন। তারপরের এক বছরব্যাপী মানসিক অত্যাচার, জাতিভিত্তিক বিদ্বেষ, অপমান। সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন মাকে, স্বামীকে, প্রিয় বন্ধু স্নেহল, সহকর্মী ও উচ্চতর আধিকারিকদের। গর্ভবতী ও প্রসূতিদের চিকিৎসার যোগ্যতা থাকতেও তাকে দিয়ে করণিকের কাজ করানো হত। ‘উচ্চ’ অর্থাৎ সুবিধাভোগী বর্ণের তিন সহকর্মী তাকে নিরন্তর অপদস্থ করে চলেছেন বলে অভিযোগ জানানো হয় বিভাগীয় প্রধানের কাছে। লাভ? তাতে অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। সুবিধাভোগী বর্ণের তিন সহকর্মী খাটে শুতেন, ডাক্তার পায়েল মাটিতে পাতা বিছানায়। বাথরুম ব্যবহার করে বেরিয়ে এই তিন সহকর্মী তার বিছানায় পা মুছতেন। আর পারেন নি পায়েল। আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন। আপনি বলতেই পারেন এসব হয় অন্যান্য রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে নয়।

লোধা সম্প্রদায় থেকে ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট চুনি কোটালের কথা অনেকেই শোনেন নি। চুনি আত্মহত্যা করেছিল ১৯৯২ সালের ১০ অগস্ট। সে তার সুইসাইড নোটে লিখেছিল, ‘বেশ কিছুদিন ধরে মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলাম। কোন দিকে যাব ঠিক করতে পারছিলাম না’। চুনি কোটালকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় অন্ধকার আর উচ্চবর্ণীয় অত্যাচারের সাঁড়াশি-চাপ সহ্য করতে না-পেরে! বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী চুনি কোটালের স্বামী মন্মথ শবর স্ত্রী’র আত্মহননের পর পুলিশকে বলেছিলেন (১৭ অগস্ট, ১৯৯২), কী প্রবল উচ্চবর্ণীয় ঘৃণায় এক অধ্যাপক চুনিকে প্রতি মুহূর্তে মনে করাতেন যে, স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়াশোনার অধিকার কোনো লোধা মেয়ের থাকতে পারে না।  

অথচ ১৯৮৫ সালে জানুয়ারি মাসে কলকাতার খবরের কাগজে হেডিং ছিল— ‘চুনি কোটালের স্বপ্ন সত্যি হল’। ভারতের প্রথম মহিলা লোধা গ্র্যাজুয়েট! যে লোধাদের ব্রিটিশ আমলের সরকারি নথিতে পর্যন্ত ‘অপরাধপ্রবণ জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। সেই জাতের এক মুটিয়া শম্ভুনাথের ঘরে, চূড়ান্ত দারিদ্রের মধ্যে আধপেটা খেয়ে মেয়েটার উচ্চশিক্ষার চৌকাঠে পা দেয়া ছিল এক ইতিহাস। গ্রামের উচ্চবর্ণের শিক্ষকের বেত চুনির পিঠে কেটে কেটে বসে যেত তার ছোটবেলায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এক দ্রোণাচার্য চুনি কোটালের উপর এমন নির্যাতন শুরু করলেন যে, চুনি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে বাধ্য হলো। উপাচার্য তিন সদস্যের কমিশন বসালেন। সেই কমিশনের ১৩ পাতার রিপোর্ট ১৫ মাস পরে যখন বার হল, চুনি কোটাল তখন আর বেঁচেই নেই। কমিশনের সামনে কথা বলতে গিয়ে চুনি হতাশায় কেঁদে ফেলেছিল। ছেঁড়া খাতার পাতায় লিখেছিল, ‘পড়িয়া আছিস তুই সবার নীচেতে / এগিয়ে গেছে সবে ফেলিয়া যে তোকে’।

চুনির মৃত্যুর পর ২৯ অগস্ট প্রতিবাদে কলকাতার রাজপথে নেমে এসেছিল লোধা, ওরাঁও, সাঁওতাল তরুণেরা। ব্রাহ্মণ্যবাদী ট্র্যাডিশন মেনে সেদিনও অবশ্য গৌরকিশোর ঘোষ ও মহাশ্বেতা দেবী ছাড়া বেশিরভাগ বিশিষ্টজনেরা অদৃশ্যই ছিলেন। হ্যাঁ, আমি ছিলাম। আমি নৃতত্ত্বের ছাত্র। চিনতাম সেই অধ্যাপককে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় তার বর্ণবাদী আচরণের জন্যে বারকয়েক তর্কাতর্কি হয়েছিল আমাদের সঙ্গে। চুনি কোটালের মৃত্যুর পরে সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল উচ্চপদে নির্বাচনের জন্যে শুধু কিছু নম্বর সম্বলিত শিক্ষাগত কাগজ দিয়ে একজন প্রার্থীকে মাপা অবৈজ্ঞানিক। তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক অর্থাৎ প্রেক্ষাপট বিচার অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

আরো অনেক অনেক উদাহরণ আছে। হায়দরাবাদের গবেষক ভেমুলা রোহিতের আত্মহত্যা, শিরদি শহরের ২৪ বছরের ছাত্র সাগর সেজওয়ালের হত্যা, পুনে শহরের ২৫ বছর বয়সী মানিক ওদাগেকে স্টিলের একটি রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা, ৩৮ বছরের শিক্ষক সঞ্জয় দানানের আত্মহত্যা, ৪৮ বছর বয়সী মাধুকর ঘাদজেকে হত্যা, ১৯ বছরের রোহান কাকাদের পোড়া মৃতদেহ উদ্ধার। সব কিছুর পিছনে উচ্চবর্ণের প্রকট হাত লক্ষিত হয়েছে। আমাদের সমাজে দলিত ও জনজাতীয়দের ওপর ধর্ষণ, অত্যাচার ও হত্যা করে বদনাম দিয়ে, আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে আসার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এই পদ্ধতি হয়ে উঠেছে অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও নান্দনিক। সংবিধানের কারণে প্রবেশাধিকার প্রাপ্ত মানুষজনদের পিষে ফেল সামাজিক রোষের জাঁতাকলে।

নৃতত্ত্বে একটা চ্যাপ্টার আছে – Cooperation, conflict & tension. মানবসমাজে এই সমস্যা চিরন্তন। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন আমরা দেখেছি যার ফল ছিল দেশবিভাগ। তাতে লাভ হয়নি। ঝঞ্ঝাট বেড়েছে বই কমেনি। কিন্তু বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজন কিন্তু আরো মারাত্মক। আরো অনেকে অনেক উদাহরণ দেবেন। অনেকেই সমালোচনা করবেন সনাতন ধর্মের। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা শ্লেষ ছুঁড়বেন। কিন্তু দায়ী আমরা প্রত্যেকেই। এ প্রসঙ্গে একটা কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। দেশভাগের সময় মুসলিম লীগ পাশে পেয়েছিল এই দলিত বা নমশূদ্র শ্রেণিকে। কেন পেয়েছিল? তার কারণ তারা এই নমশূদ্র শ্রেণিকে বুঝিয়েছিল যে আমাদের সংগ্রাম হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে যার ভুক্তভোগী তোমরাও। কিন্তু তাদের এই রাজনৈতিক চালের পেছনে যে মানসিকতা কাজ করেছিল তা হল মুসলমানরা এই ছোট কাজগুলি করে না। ধাঙর, নাপিত, ধোপা ও মুচি’র কাজ এই নমশূদ্ররাই চিরকাল করে এসেছে। অতএব এদের বাস্তুচ্যুত করা চলবে না। এদের দেশভাগের পরে সত্যিই কিছু করা হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় পাক হানাদাররা এই শ্রেণিকে হিন্দু বলে নিকেশ করে দিয়েছিল। তাই স্বাধীনতার পরে মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ এদের শূন্যস্থান পূরণ করেছিল। তর্কের খাতিরে অনেকেই রেফারেন্স চাইবেন এই বক্তব্যের। তাদের অনুরোধ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পড়লেই দেখবেন যে এ প্রসঙ্গ বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।

ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কম নয়। একইভাবে সমালোচকের সংখ্যাও বিশাল। কিন্তু এই সরকার শুধুমাত্র বর্ণবাদীদের ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়। মুসলমান ও অন্ত্যজ হিন্দুরা এদের ঢেলে ভোট দিয়েছে। সংবিধানের রায়ে বেশ কিছু আসন দলিতদের জন্যে নির্দিষ্ট হলেও সনাতন ধর্মে বর্ণান্ধতা আজও প্রকট। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরে মুসলিম সমাজ যে গেল-গেল রব তুলেছিল সেই আশঙ্কাকে অমূলক এখন অবধি প্রমাণ করেছে ভারত সরকার। কিন্তু সে জায়গাটা এখনও আড়ালে অন্ধকারে আছে তা হল দলিতদের প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ। এই ব্যাপারটা ভাবতে হবে তাদের। কাজেই সময় এসেছে যে কোন প্রার্থীর সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা প্রেক্ষাপট বিচার করে যে কোন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের ছাড়পত্র দেয়া যা বিদেশে হয়। অবিলম্বে আইন করা উচিত দলিত ও জনজাতির ওপরে যে কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে অভিযুক্তদের অভিযোগকারীর ত্রিসীমানা থেকে বিযুক্ত করা। সংঘবদ্ধ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধই একমাত্র দাওয়াই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর