ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোন দিকে?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৯ ১৪২৬,   ০৮ শা'বান ১৪৪১

Akash

ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোন দিকে?

 প্রকাশিত: ১৪:০৮ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:০৯ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

রাজধানী দিল্লিতে বছরের বেশ অনেকটা অংশ আমি কাটাই। বিশেষত টানা কিছু লেখার প্রয়োজন হলেই আমি দিল্লিবাসী হই। সেখানে সময়ের বেশ কিছুটা কাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে, কিছুটা সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে, কিছুটা আবার আমলা-নেতাদের সঙ্গে।

দিল্লি চিরকালই পরিশ্রমী, উদ্যমী, দরাজদিল মানুষের শহর। দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের বাস। মূল থেকে সরে যারা দিল্লিতে ঘাঁটি গেড়েছেন তাদের বিশ্বাস তাদের রাজ্যবাসীর মানসিকতার প্রতিফলন। তাদের মতামত প্রায় সমগ্র ভারতের মতামতের চিত্র তুলে ধরে। তাই দিল্লির সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটের ফলাফল ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অভিমুখ নির্দেশ করে।

দিল্লিতে ভারতীয় জনতা পার্টি হেরেছে। ৭০ সিটের বিধানসভায় মাত্র ৮ টি আসন পেয়েছে। অথচ মাসকয়েক আগে লোকসভা নির্বাচনে ৭ টি আসনের সবকটিতে তারা জয়ী হয়েছিল। তাহলে এই কয়েকদিনে জনসমর্থনে এই আমূল পরিবর্তন কেন? দিল্লিতে এর আগে বিজেপির পাঞ্জাবি নেতা মদনলাল খুরানা, জাঠ সাহিব সিং বর্মা বা বানিয়া বিজয় গোয়েল সমানে সমানে লড়ে যেত। তাহলে আজ? সত্যি হল এই যে অমিত শাহরা যেভাবে মেরুকরণের চেষ্টা এবার দিল্লির ভোটে করলেন তা তাদের আমজনতার কাছ থেকে বহু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। দিল্লিতে এলেই মানুষ লালকেল্লা আর হুমায়ুনের সমাধি দেখতে যায়। যে দিল্লিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মুসলিম সংস্কৃতি, সেখানে হিন্দু–‌মুসলিম বিভাজনের চেষ্টা করতে গেলেন কেন শাহ?‌ এর একটাই উত্তর, আত্মসন্তুষ্টি। মোদি–‌শাহ মনে করেন ভারতের সর্বত্র তাদের গুজরাট মডেল কাজ করবে।  মেরুকরণ করতে পারলেই কেল্লা ফতে!‌ বিজেপি প্রথম থেকেই বিদ্বেষ আর ভুয়ো খবর ছড়িয়ে গেছে। এদিকে কেজরিওয়ালরা শুধু নিজেদের ভাল কাজের প্রচার করেছেন। লড়াইটা তাই মেরুকরণ বনাম উন্নয়নের হয়ে দাঁড়াল। এদেশের মানসিকতা যতটা বুঝি, তাতে এখানে ভালভাবে বেঁচে থাকার থেকে জরুরি আর কিছুই নয়। যে পূর্বাঞ্চলীরা এখানে রুটি–‌রুজির টানে এসেছেন, তাদের কাছেও হিন্দুত্বের স্লোগান অর্থহীন। তারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চান, মাথা তুলে দাঁড়াতে চান।

মোদি বারবার ডাবল ইঞ্জিনের কথা বলেন। অর্থাৎ কেন্দ্র আর রাজ্যে একই দলের সরকার হলেই নাকি মানুষের লাভ। এই ন্যারেটিভও ইদানীং রাজ্যে রাজ্যে প্রত্যাখ্যাত। দিল্লির কাছে তো বটেই। দিল্লি পুরসভা বিজেপি‌র হাতে, কাজের নামে অষ্টরম্ভা। দিল্লির পুলিশ অমিত শাহের হাতে। মানুষ সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত নিরাপত্তার অভাব নিয়ে। মোদি-অমিত শাহের প্রচারে দিল্লির উন্নয়নের কথা নেই, তোপ দাগলেন শাহিনবাগে!‌ শাহ বললেন, এত জোরে বোতাম টিপতে হবে, যেন কারেন্ট লাগে শাহিনবাগে!‌ দুর্ভাগ্য, ওরা দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০০ সাংসদ, ৫ মুখ্যমন্ত্রীকে প্রচারে নামিয়েও এই হাল!‌ আর কংগ্রেস? তারা কোথায়? তারা কাগজেপত্রে ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে? নাহ, বলাই ভাল। দিল্লিতে কংগ্রেস লড়েইনি। ঠিক করেছে। বিজেপির সুবিধে হবে এমন কিছু কংগ্রেস করতে যাবে কেন?‌ মহারাষ্ট্রে উদ্ভব ঠাকরেকে যেমন গদি ছাড়া হয়েছে, দিল্লিতে কেজরিওয়ালকেও তেমনই ময়দান ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বস্তুত ভারতের মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে বিজেপি। হরিয়ানা, কর্ণাটক, গোয়া, মণিপুর— সবই পেছন দরজা দিয়ে জেতা। মহারাষ্ট্রেও সে চেষ্টা হয়েছিল, ব্যর্থ হওয়ার কারণ গয়ারামরাও এখন বিজেপি‌র ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন আশা দেখতে পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা জিএটি নিয়ে ক্ষুব্ধ, খেপে গেছেন দলিত–‌মুসলিমরা। অর্থনীতির হাল শোচনীয়।  বিজেপি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দিচ্ছে। ব্যাঙ্ক, বিমা, রেল বেসরকারিকরণের জন্য যা যা করতে হয় তা–‌ই করছে। এদিকে কেজরীওয়াল ‌‌‌‌বিজেপি‌র বিকল্প মডেল তুলে ধরছেন। তার হাতে ছিল সরকারি স্কুল, হাসপাতাল। এই দুটি ক্ষেত্রেই অভাবনীয় উন্নতি। সমৃদ্ধ মানুষও যাচ্ছেন মহল্লা ক্লিনিকে। সরকারি স্কুলে পড়ছে ১২ লক্ষ ছাত্র‌ছাত্রী। বাড়তি ক্লাস, পেরেন্ট–‌টিচার মিটিং, ঝকঝকে শৌচাগার, সুইমিং পুল। গরিব মানুষ ধন্য ধন্য করবেন বইকি।

এদিকে রবিবার (২৬ জানুয়ারি) প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন আইএএনএস-সিভোটার' তাদের সাম্প্রতিক সমীক্ষা 'রাষ্ট্রের অবস্থা'-র ফলাফল প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে এখনও উত্তরদাতাদের ৫৬.৪ শতাংশই বিজেপির প্রতি 'অত্যন্ত সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন আর প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রতি তো এখনো ৬২.৩ শতাংশ জনগণের সমর্থন রয়েছে। আর ৭০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, সরাসরি ভোট দিতে পারলে তারা নরেন্দ্র মোদীকে পুনর্নির্বাচিত করবেন।

এর মানে দাঁড়ায় এই যে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অবিরাম বিক্ষোভ সত্ত্বেও  ভারতীয় জনতা পার্টি-র নেতৃত্বাধীন সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তায় বিশেষ হেরফের হয়নি। অন্তত আইএএনএস-সিভোটার'এর সমীক্ষায় বেশিরভাগ উত্তরদাতাই বলেছেন তারা ক্ষমতাসীন দল এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রতি 'অত্যন্ত সন্তুষ্ট'।

আগামী ২০২১ এ পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যে বিজেপি ২০২১ এ বাংলায় ক্ষমতা আসতে পারবে না বলে ধারণা রাজনৈতিক মহলে। প্রথমে কংগ্রেস (১৯৪৭-৭৭), তারপর সিপিএমএ’র নেতৃত্বে বামফ্রন্ট (১৯৭৭-২০১১), এরপর ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সবাই বলিষ্ঠভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি করেছে, যার ফলে বিজেপি নেতাদের অনেকেই আজ মমতা ব্যানার্জীকে তির্যক ভাষায় ‘মমতাজ বেগম’ বলে থাকেন। আর তাঁর বিরুদ্ধে বারবার ওঠে মুসলিম তোষণের অভিযোগ।

পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে ন্যান্সি পাওয়েলরা খুশি হতে পারেন; কিন্তু রাজ্যের ১০ কোটি মানুষ যারপরনাই চিন্তিত, উদ্বিগ্ন—কোথায় নিয়ে এসেছে রাজ্যটাকে। এই পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে জ্যোতিবাবুর সেই উক্তি বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—মমতার পুলিশের গালে কালি মাখানো থেকে যাবতীয় অন্যায় ক্ষমা করে দিয়েছি; কিন্তু পশ্চিমাদের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক দেশে গেরুয়া বাহিনীকে ডেকে আনা যে কত বড় বিপদ হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলমান, তাই রাজ্য রাজনীতিতে মুসলমানদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের দলে ভেড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে টানাটানিও অব্যাহত। ভোটের রাজনীতির অঙ্ক সম্পর্কে যারা মোটামুটি ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে মুসলমানদের সমর্থন পেলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটযুদ্ধে জেতা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। বামফ্রন্টের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের একটা বড় অংশের সমর্থন তাদের দিকে ছিল। কিন্তু ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে সংখ্যালঘুরা বামফ্রন্টের দিক থেকে যেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তূণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়ল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পরপর জয় পেতে শুরু করলেন। এই অবস্থায় মুসলমানদের মন জয় করতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাদের নিয়ে দড়ি-টানাটানির প্রতিযোগিতায়।এবারে লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে বিধানসভাওয়ারি ফল ধরলে সেই বিজেপিই এগিয়ে ১২১টি আসনে। বিজেপির সমর্থনের হার এক লাফে বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ শতাংশ। একথা সত্যি যে গুজরাটে দেখেছি, উত্তর প্রদেশে দেখেছি, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে, এমন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আড়াই দশকের  সাংবাদিকতার জীবনে কখনো দেখিনি। সত্যিই তা–ই। নিজের চেনা জায়গা নিজেরই কেমন অচেনা লাগে। পরিচিত মানুষকেও মনে হয় অপরিচিত। এমন তো ১০ বছর আগেও ছিল না। ভোট আসবে-যাবে। কিন্তু যে দেয়াল তুলে দেয়া হচ্ছে, তাকে ভাঙবে কে! যত দিন বামপন্থীরা ছিল, তত দিন বিজেপি ছিল একেবারে প্রান্তিক শক্তি। মাথা তুলতে পারেনি উগ্র দক্ষিণপন্থীরা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী, বিধানসভায় ছিল না একজনও বিজেপির বিধায়ক। বামপন্থীদের সমর্থনের হার কমে এখন সাড়ে ৭ শতাংশ। বামপন্থীরা যত দুর্বল হয়েছে, তত মাথাচাড়া দিয়েছে উগ্র দক্ষিণপন্থীপন্থা। স্বাভাবিক। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের মতে, ‘এটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটা বড় বিপর্যয়”। উনি বললেন, ”পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দখলে যাওয়া মানে বাংলার ভাগ অবশেষে সবদিক থেকে পূর্ণ হওয়া।’

কে চেয়েছিল বাংলা ভাগ? কি ফল পেয়েছে বাংলা বিভক্ত হওয়ায়? নতুন প্রজন্ম তো বাংলার এই বিভক্তির ব্যাপারে সদা সোচ্চার। অর্থনৈতিক ভাবে ক্রমে প্রান্তিক রাজ্য হয়ে ওঠায় পশ্চিমবঙ্গ ক্রমে ঝুঁকে পড়ছে কেন্দ্রীয় শাসকের দিকে। কিন্তু তার মধ্যেও প্রবল বিদ্রোহে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। তাই ২০২১ ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ বিচারের সেমিফাইনাল। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যদি জয়ী হয় তাহলে যে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার গ্রহণ শুরু হয়ে যাবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর