Alexa ভারতের ব্যর্থ যত চন্দ্রাভিযান

ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৩ ১৪২৬,   ১৮ মুহররম ১৪৪১

Akash

ভারতের ব্যর্থ যত চন্দ্রাভিযান

বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:০০ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চাঁদের অন্ধকার দিক কি আড়ালেই থেকে যাবে? সত্যিই কি হারিয়ে গেল ল্যান্ডার ‘বিক্রম’? এর আগেও চাঁদের মাটি ছুঁতে পারেনি চন্দ্রযান ১। চাঁদ নামক সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সেটি। তবে ‘মৃত্যু’র আগে চাঁদে পানির অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিল। 

প্রথম চন্দ্রাভিযানের সেই ব্যর্থতা ধুয়ে মুছে দিতে আবারো ভারত পরিচালনা করেছিলো তাদের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান। আরো উন্নত প্রযুক্তি এবং অনেক বেশি অর্থব্যয় তৈরি ‘চন্দ্রযান ২’ তার লক্ষ্য পূরণ করবেই, এমনই আশা রেখেছিলেন ইসরোর মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। এমনকি ইসরো থেকেও এও জানানো হয়েছিল পরিকল্পনামাফিক সব কিছুই সঠিক পথে চলছে। তাহলে কেন এমন হলো? চাঁদের মাটি থেকে ঠিক ২.১ কিলোমিটার দূরত্বে আচমকাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ এর সঙ্গে।

তবে আশা ছাড়েনি ইসরো। চন্দ্রযান ২ চাঁদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ৯৫ শতাংশ সফলতা এখানেই। ৫ শতাংশ এখনো গোলক ধাধার মতোই রয়ে গেছে। বিক্রম চাঁদের মাটি ছুঁলে সেটিও আর থাকতো না।

তবে আশার কথা এই যে ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ হারিয়ে গেলেও চাঁদের কক্ষপথে আগামী এক বছর থাকবে চন্দ্রযানটির আরেকটি অংশ অরবিটার। সেখান থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠের ছবি তুলে পাঠাবে সে। পাশাপাশি, খোঁজ করবে ল্যান্ডার বিক্রমেরও।

১৯৭৫ সালে ভারতের জন্য প্রথম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ‘আর্যভট্ট’ বানিয়েছিল ইসরো, যার উৎক্ষেপণ করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। মহাকাশে ভারতের অভিযান সূচীতে বেশ কয়েকবার ব্যর্থও হয়েছিল ইসরো। কখনো দেখা গিয়েছিল- শেষ মুহূর্তে থমকে গিয়েছে উৎক্ষেপণ, কখনো উপগ্রহের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণেই ছিল নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি, আবার কখনো উৎক্ষেপণ সফল হলেও নির্ধারিত কক্ষপথে সেটিকে স্থাপন করা যায়নি।

এক ঝলকে দেখে নেয়া যাক ভারতের ব্যর্থ মিশনগুলো-

রোহিনী টেকনোলজি পেলোড (RTP)

রোহিনী টেকনোলজি পেলোড ১৯৭৯ (RTP)
৩৫ কিলোগ্রাম ওজনের এই উপগ্রহটি শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৯ সালের ১০ আগস্ট। ভারতের মাটি থেকে মহাকাশে পাড়ি জমানো এটিই প্রথম উপগ্রহ। চারটি উপগ্রহ নিয়ে স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের (এসএলভি) পিঠে চেপে পরীক্ষামূলকভাবে ওই উপগ্রহের উৎক্ষেপণ হয়েছিল। কিন্তু সঠিক কক্ষপথে সেটিকে স্থাপন করা যায়নি। 
ইসরোর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, রোহিনীর বাহক রকেটের মধ্যেই ছিল গলদ। যদিও পরবর্তীকালে রোহিনী সিরিজের আরো তিনটি উপগ্রহ আরএস-১ (৩৫ কেজি), আরএস-ডি১ (৩৮ কেজি) এবং আরএস-ডি২ (৪১.৫ কেজি) মহাকাশে পাঠাতে সফল হয়েছিল ইসরো।

স্ট্রেচড রোহিনী স্যাটেলাইট সিরিজ (SROSS-1)

স্ট্রেচড রোহিনী স্যাটেলাইট সিরিজ ১৯৮৭ (SROSS-1)
এটাও ছিল ইসরোর পরীক্ষামূলক মিশন। এএসএলভি-ডি১ (ASLV-D1) রকেটে চাপিয়ে ১৫০ কিলোগ্রাম ওজনের এই উপগ্রহ ভারতের মাটি ছাড়ে ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কক্ষপথে পৌঁছতে পারেনি সেটি।

তিনটি পেলোড নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল এই উপগ্রহ। SCROSS A বয়ে নিয়ে গিয়েছিল গামা রে বার্স্ট (GRB) পেলোড। SCROSS B-এর ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল জার্মান পেলোড ও মোনো পেলোড অকুলার ইলেকট্রো-অপটিক স্টিরিও স্ক্যানার (MEOSS)। 

ইসরোর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, রকেটের ত্রুটির কারণেই কক্ষপথে প্রেরণ করা যায়নি SCROSS A ও SCROSS B কে। ১৯৯২ সালে SCROSS C এর মিশন সফল হলেও, নির্ধারিত কক্ষপথের বদলে অনেকটাই লো-অরবিটে স্থাপন করা হয়েছিল এটিকে।

স্ট্রেচড রোহিনী স্যাটেলাইট সিরিজ (SROSS-2)

স্ট্রেচড রোহিনী স্যাটেলাইট সিরিজ ১৯৮৮ (SROSS-2)
স্ট্রেচড রোহিনী সিরিজের SCROSS 1 এর মিশন ব্যর্থ হলে পরের বছরই ১৯৮৮ সালের ১৩ জুলাই সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে যাত্রা শুরু করেছিল SCROSS 2 । এএসএলভি-ডি২ (ASLV-D2) রকেটে চাপিয়ে ১৫০ কিলোগ্রাম ওজনের এই উপগ্রহটিরও উৎক্ষেপ সফল ছিল, তবে একইভাবে এটিও তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছতে পারেনি।

আইআরএস-১ই (IRS-1E)

আইআরএস-১ই ১৯৯৩ (IRS-1E)
কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নজরদারির জন্য রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট সিরিজের আইআরএস-১ই-র উৎক্ষেপণ হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। উন্নতমানের পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (pslv-D1)-এর পিঠে চাপিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল এই উপগ্রহকে। কিন্তু, সেবারও বাহক রকেটের মধ্যে থেকে গিয়েছিল ত্রুটি।

ইসরোর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, আইআরএস-১এ-র মতোই এই উপগ্রহে ছিল মোনোকুলার ইলেকট্রো-অপটিকাল স্টিরিও স্ক্যানার যা তৈরি হয়েছিল জার্মানিতে। যে কোনো সময়ের পরিষ্কার ছবি তোলার জন্য LISS-I ক্যামেরা। শুধুমাত্র লঞ্চ ভেহিকলের ত্রুটির কারণেই কক্ষপথে স্থাপন করা যায়নি আইআরএস-১ই-কে।

ইনস্যাট ৪সি (INSAT-4C)

ইনস্যাট ৪সি ২০০৬ (INSAT-4C)
কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট ইনস্যাটের উৎক্ষেপণের সময়েই প্রথমবার জিএসএলভি লঞ্চ প্যাড ব্যবহার করে ইসরো। সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে ২০০৬ সালের ১০ জুলাই মহাকাশে পাড়ি দেয় ইনস্যাট-৪সি।

৯৫০ কিলোগ্রামের এই উপগ্রহ সমেত গোটা মহাকাশয়ানের মিলিত ওজন ছিল ২,১৬৮ কিলোগ্রাম। ভারী উপগ্রহ নিয়ে উৎক্ষেপের ৫৫ মিনিটের মধ্যেই রকেটের চারটির মধ্যে একটি লিকুইড চেম্বার বুস্টার কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়। মাঝপথেই ভেঙে পড়ে রকেট।

ইনস্যাট ৪সি (INSAT-4C)

ইনস্যাট ৪সি ২০০৬ (INSAT-4C)
যাত্রা শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর উনিশতম উপগ্রহ জিস্যাট-৪। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল এই উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।

ইসরোর তৈরি শক্তিশালী এই উপগ্রহ গোটা দেশে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে মোবাইল ফোন পরিষেবা আরো জোরদার করতে পাঠানো হয়েছিল। জিএসএলভি-জিরোডি৩-এ চাপিয়ে সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণও করা হয়েছিল। তবে কক্ষপথে স্থাপণ করা যায়নি। মাঝপথেই এই উপগ্রহের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়।

জিস্যাট-৫পি (GSAT-5P)

জিস্যাট-৫পি ২০১০ (GSAT-5P)
টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে দ্রুততর করে তুলতে জিস্যাট সিরিজের এটি ছিল পঞ্চম উপগ্রহ। ২০১০ সালেরই ২৫ ডিসেম্বর উপগ্রহটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়েছিল জিএসএলভি-এফজিরো৬ লঞ্চ ভেহিকলের পিঠে চাপিয়ে।

মূলত দু’টি লক্ষ্যে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল উপগ্রহটিকে। এক, দেশের মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দ্রুততর করে তোলা আর দুই, দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো নিখুঁত ও দ্রুততর করা। ২ হাজার ৩১০ কিলোগ্রাম ওজনের উপগ্রহটিকে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্রের দ্বিতীয় উৎক্ষেপণ স্থল থেকে পাঠানো হয়েছিল, তবে সেটিকে কক্ষপথে স্থাপন করা যায়নি।

আইআরএনএসএস-১এইচ (IRNSS-1H)

আইআরএনএসএস-১এইচ ২০১৭ (IRNSS-1H)
বর্ম খুলে বেরোতে পারেনি বলেই সে দিন মহাকাশে পৌঁছতে পারেনি ভারতের প্রথম বেসরকারি উপগ্রহ আইআরএনএসএস -১ এইচ। ২০১৭ সালে পিএসএলভি-৩৯ লঞ্চ ভেহিকলের পিঠে চাপিয়ে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল সেটিকে।

ইসরো জানিয়েছিল, মাটি ছেড়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ‘সীমানা’ পেরনোর জন্য ‘আইআরএনএসএস-ওয়ান-এইচ’-এর যা ছিল রক্ষাকবচ, ইসরোর সেই ২৪ বছরের রকেট পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের (পিএসএলভি) সেই ‘হিট শিল্ড’ গত ৩১ অগস্ট উৎক্ষেপণের পর যে সময়ের মধ্যে খুলে যাওয়ার কথা কিন্তু খুলেনি। ইসরোর বানানো পিএসএলভি সি-৩৯ রকেট সে দিন ব্যর্থ হয়েছিল দেশের প্রথম বেসরকারি উপগ্রহটিকে মহাকাশে পাঠাতে।

ইসরো সূত্রের খবর, ওই হিট শিল্ড খুলে বের হতে না পারার জন্য সে দিন আরো এক টন ওজন বেড়ে গিয়েছিল আইআরএনএসএস-১ এইচের। আর অতটা ওজন নিয়ে এই উপগ্রহের পক্ষে নিরাপদে মহাকাশে পৌঁছনো সম্ভব ছিল না। কারণ, বাহন রকেট পিএসএলভি’কে পিছনে রেখে তাকে ছেড়ে মহাকাশে পাড়ি জমাতে হলে উপগ্রহটির পৌঁছনো উচিত ছিল প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে ৯ কিলোমিটার গতিবেগে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস