Alexa ভারতীয় ফুটবল রূপকথার নায়ক: সুনীল ছেত্রী

ঢাকা, রোববার   ২৫ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ১০ ১৪২৬,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

ভারতীয় ফুটবল রূপকথার নায়ক: সুনীল ছেত্রী

 প্রকাশিত: ১৬:২৬ ৬ জুন ২০১৮   আপডেট: ১৬:৩৬ ৬ জুন ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ, ভারত এর এই উপমহাদেশে ফুটবলটা খুব একটা জনপ্রিয় না। ইউরোপিয়ান বা সাউথ আমেরিকান ফুটবলের ভক্ত দেখা গেলেও এই দেশগুলোয় নিজেদের ফুটবলের সফলতা যেমন নেই, তেমনি নিজেদের ফুটবল নিয়ে দর্শকদের উৎসাহও কম।

আর তাই ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের কাপ্তান সুনীল ছেত্রী বাধ্য হলেন হাত জোড় করতে। নিজের দেশের হয়ে ১০০তম ম্যাচ খেলতে নামার আগে দর্শকদের কাছে হাত জোড় করে মাঠে আসার অনুরোধ করলেন।

ম্যাচের আগেই ভিডিওটি বেশ ভাইরাল হয়েছিল। কে এই সুনীল? জানার জন্য যদি সামান্য খুঁজতে যান যা দেখতে পাবেন তা দেখে অবাক হবেন আগে দেখেননি কেন। বর্তমানের সক্রিয় আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসির পরই প্রথমবারের মতন একজন এশিয়ান ফুটবলারের নাম। তিনি আর কেউ নন সুনীল ছেত্রী।

মেসির চাইতে গোল সংখ্যার সাথে তার পার্থক্য মাত্র ৩ গোলের। ভারতের হয়ে খেলেছেন ১০০টি ম্যাচ এবং গোল করেছেন ৬১টি। যেখানে মেসি ৮১ ম্যাচ খেলে করেছেন ৬৪টি গোল। ভারতীয় ফুটবলের ব্যক্তিগত প্রায় সকল পুরস্কারই তার জেতা।



ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হয়তো তিনিই। এই ৪জুন তিনি ভারতের হয়ে নিজের ১০০ তম ম্যাচ খেলেছেন। ৩৩ বছর বয়সী সুনীল বর্তমানে আছেন ক্যারিয়ার সেরা ফর্মে। অনেকেই মনে করেন এই ফর্ম আরো ৩-৪ বছর আগে পেলে তিনি ডাক পেতে পারতেন ইউরোপিয়ান কোনো ক্লাবেই।

শুধু তিনি একার ক্যারিয়ারই নন, দলগত উন্নতিতেও ভূমিকা রেখে চলেছেন সমানে। সুনীল ছেত্রী ভারতের হয়ে ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১২ সালে নেহরু কাপ জেতেন। ২০১১ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। এর মাঝে ২০০৮ সালে ভারতের এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপ জেতার অন্যতম কারিগর ছিলেন সুনীল। যার কারণে ২৭ বছর পর ভারত এএফসি এশিয়া কাপে কোয়ালিফাই করে।

২০১৯ এএফসি এশিয়া কাপের বাছাইপর্বেও সুনীল গোল ও অ্যাসিস্টের মাধ্যমে ২০১৯ সালের এএফসি এশিয়া কাপে ভারতের জায়গা নিশ্চিত করেছেন।

২০১৫ সালে ভারত তাদের ইতিহাসের সর্বনিম্ন র‌্যাংকিং ১৬৬তে ছিল। এরপরই সুনীল ছেত্রীর দুর্দান্ত ফর্মে তারা তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ র‌্যাংকিং ৯৬তে উঠে আসে। এবং গত তিন বছরে এই র‌্যাংকিং বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের ভালো পারফর্ম্যান্সের পরও দর্শকদের মাঠমুখী হতে দেখা যায়নি। মুম্বাইয়ের মাঠে আগের সপ্তাহে চাইনিজ তাইপে কে ৫-০ তে হারানোর ম্যাচে মাঠের এক তৃতীয়াংশও পূর্ণ হয়নি। সাড়ে ১০ হাজার দর্শকের মাঠে সেদিন দর্শক হয়েছিল ২ হাজারের কিছু বেশি।

নিজের ১০০তম ম্যাচ এ মাঠের এই করুণ দশা দেখতে চান নি সুনীল। তাই নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। টুইটারে দিলেন একটি আবেগী ভিডিও, “যারা যারা খেলা দেখতে এসেছেন সবাইকে ধন্যবাদ। এটি আমাদের জন্য সবকিছু। কিন্তু আজকের ভিডিওটি তাদের জন্য যারা খেলা দেখতে আসেননি। যারা ফুটবল ফ্যান না প্রত্যেকে একবার আমাদের খেলাটি দেখতে আসুন। দুইটি কারণে। প্রথমত, এটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা। দ্বিতীয়ত, আমরা খেলছি আমাদের দেশের জন্য। আমরা নিশ্চিত করবো খেলা দেখে বাড়ি যাওয়ার সময় আপনাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন হবে”।

দর্শকদের ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো নিয়ে অসীম আগ্রহ থাকলেও জাতীয় খেলায় আগ্রহ না থাকায় হতাশ সুনীল। দর্শকেরা বলেন ইউরোপিয়ান খেলার মান অনেক উঁচু। সুনীল একথা স্বীকার করে বলেছেন, “আপনারা ইউরোপিয়ান বড় বড় ক্লাবের খেলা গুলো দেখেন এবং প্রচন্ড প্যাশনের সাথে তাদের সমর্থন দেন। এবং মাঝে মাঝে ভাবেন আমাদের খেলার মান তাদের মত নয়। তাহলে কেন আপনারা সময় নষ্ট করবেন। আমি মানি। খেলার মান হয়তো এক না । হয়তো কাছাকাছিও না। কিন্তু আমরা কথা দিচ্ছি আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন আপনাদের সময় নষ্ট না হয়”।

তিনি আরো বলেন, “আপনারা যারা হতাশ এবং ভারতীয় ফুটবল থেকে আর কোনো কিছুই আশা করেন না আমি অনুরোধ করছি একবার আমাদের খেলা দেখতে আসুন”।



উপমহদেশীয় দর্শকেরা খেলা মাঠে দেখতে যান বা না যান ঘরে বসে সোশ্যাল মিডিয়াতে সমালোচনা করতে পটু। আর দর্শকদের মাঠে দেখতে সুনীল দুয়ো শুনতেও রাজি এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন, “ঘরে বসে সমালোচনা করে বা দুয়ো দিয়ে মজা নেই। আপনারা মাঠে আসুন। আমাদের মুখের উপর সমালোচনা করুন। চিৎকার করুন, দুয়ো দিন। কে জানে হয়তো একদিন, একদিন এই খেলাই আপনাদের পরিবর্তন করে দিবে। হয়তো আমাদের পরিবর্তনের শুরু করবে”।

“আপনাদের কোনো ধারণাই নেই আপনারা এবং আপনাদের সমর্থন আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ”- এই কথা গুলো হাত জোড় করে বলেই তিনি বার বার অনুরোধ করেছেন দর্শক দের।

ভারতীয় ফুটবল অধিনায়কের ১০০তম ম্যাচে তাকে হতাশ করেননি মুম্বাইয়ের দর্শক। ৪ জুন কেনিয়ার বিপক্ষে ভারত মাঠে নামার সময় প্রায় ১০ হাজার ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। পুরোপুরি ১০৫০০ লোক ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়ামে অফিশিয়াল উপস্থিতি ছিল ৮৮৯০ জন। ম্যাচের পুরোটা সময় জুড়ে দর্শকদের সমর্থন ছিল অবিশ্বাস্য। আর দর্শকদের এই ভালবাসায় সুনীলও দেখালেন তার সেরা খেলা।



৬৮ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য থাকলেও মাঝে মাঝেই নিজের ঝলক দেখিয়েছেন সুনীল। ৬৮ মিনিটে চতুরতার সাথে একটি পেনাল্টি আদায় করে নেন তিনি এবং গোল করেন। ম্যাচের ৭১ মিনিটে জেজে লালপেখলুয়ার গোলে ২-০ এগিয়ে যায় স্বাগতিক দল।

ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে ৯১ মিনিটে আরেকটি দুর্দান্ত গোল করে নিজের ১০০তম ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখেন সুনীল। এর থেকে ভাল স্ক্রিপ্ট হয়তো তিনি নিজেও লিখতে পারতেন না তার শত তম ম্যাচে।

যদিও বৃষ্টির কারণে ম্যাচের প্রথমার্ধ খুবই নিস্তেজ ছিল। কিন্তু ম্যাচটি সুনীল শেষ করেছেন দুর্দান্ত ভাবে। আর তার কথায় সায় দেয়া দর্শকদের ধন্যবাদ দিতে ম্যাচশেষে সুনীল ছেত্রীসহ ভারত দল একটি ল্যাপ অফ অনার দেয়।



ম্যাচশেষে সুনীল দর্শকদের ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, “আমরা কথা দিচ্ছি যদি আপনারা এমনভাবে আমাদের সমর্থন দিয়ে যান, আমরা মাঠে আমাদের জীবন দিয়ে দিতে পারি। ভারত, এই রাতটি বিশেষ কিছু কারণ আমরা সকলে এখানে একসাথে। যারা মাঠে এসে সমর্থন দিয়েছেন এবং যারা বাসা থেকে আমাদের সমর্থন দিয়েছেন সকলকে ধন্যবাদ”।

ছোট একটি দলে থেকেও নিজের নাম লিখিয়েছেন রোনালদো, মেসির সাথে। হয়তো প্রতিযোগিতার দিক থেকে বা খেলার মানে তাদের সমান হয়ে যাননি। কিন্তু এমন কৃতিত্ব তো তা আগে কেউ করতে পারেননি। আবার দর্শকদের সমর্থনে সাড়াও দিয়েছেন দুর্দান্তভাবে। তিনি ভারতের তো বটেই এই উপমহাদেশের সকল ফুটবলার এর জন্যই আদর্শ হতে পারেন। আর আমরাও আমাদের দেশীয় ফুটবল এবং খেলোয়াড়দের সমর্থন দিলে আমাদের দেশেও একজন রোনালদো বা মেসি না পেলেও একজন সুনীল ছেত্রী পাওয়ার আশা করতেই পারি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics