Alexa ভাতের অভাবে বাসি তরকারি মিশিয়ে মুড়ি খেয়েছি অনেকবার

ঢাকা, বুধবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ৬ ১৪২৬,   ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

ভাতের অভাবে বাসি তরকারি মিশিয়ে মুড়ি খেয়েছি অনেকবার

ওয়ায়েছ আরিফ, ঢাবি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৪ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

পড়ালেখা ও বাঁচার তাগিতে স্কুলে থাকাবস্থায় কাঁধে তুল নেন পরিবারের ভরণপোষণের ভার। জীবিকার তাগিদে কখনো ব্যবসা, পার্ট টাইম জব ও ক্ষেতের কাজে নামতে হয়েছে তাকে। নিজ ক্যাম্পাসে খুলেছেন ‘ক্যাম্পাস ফেরিওয়ালা’ নামক ছোট্ট কাপড়ের দোকান। 

সেই ছোটোবেলা থেকেই শত প্রতিকূলতা মাঝে বেড়ে উঠা তার। এরপরও থেমে থাকেননি। জীবন যুদ্ধে হার না মানা এই ছেলের নাম সাদ্দাম হোসেন। তিনি এবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও বৈকল্য বিভাগে অনার্স শেষ করেন। 

ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে কথা হয়েছিল অদম্য সৈনিক সাদ্দাম হোসেনের। 

চরম দারিদ্রতা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সাদ্দাম বলেন, জন্মের পর থেকে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করে মানিয়ে নিয়েছি। ইচ্ছাশক্তি থাকলেই সব কিছু করা সম্ভব। 

সাদ্দাম হোসেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার আড়ম্বরপুর গ্রামের বাসিন্দা। বাবা গাড়িতে কাজ করতেন, একটা কিডনি অচল হয়ে যাওয়ার পর এখন তাও করতে পারেন না। মা অন্যের ঘরে কাজ করে সংসার চালান। তারা দুই ভাইবোন। ভাইবোনের মধ্যে সাদ্দাম বড়। আদরের ছোট বোনটা নবম শ্রেণিতে পড়ে৷

এসএসসি পাসের পর ভর্তি হলেন গ্রামের একটি কলেজে। এরপর ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও বৈকল্য বিভাগে। ভর্তির খরচটাও অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্যে পাওয়া৷ 

একবেলা দুইবেলা না খেয়েও পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন। জীবনের বাঁকে বাঁকে এমন অনেক সময় এসেছে যে সাদ্দাম অকালেই ঝরে যেতে হতো ব্যর্থতার ভারে৷ কিন্তু না, যারা ইতিহাস গড়তে আসে তারা শত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে জীবনের উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

কষ্ট কি জিনিস আমি ভালো করেই জানি। কষ্ট, পরিশ্রমের সাথে লড়াই করে আজ এতদূর এসেছি। 

আম্মুর কাছ থেকে শুনেছি, ছোট বেলায় ভাতের অভাবে আমি ও আম্মু বাসি তরকারির সঙ্গে মুড়ি দিয়ে খেয়েছি অনেকবার। আম্মু সেই কষ্টের কথাগুলো কোনদিন বুঝতেও দেননি৷ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি৷ 

সেই দিনগুলোর কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাদ্দাম বলেন, আব্বু গাড়িতে কাজ করত, অনেক দিন পর বাড়ি আসত। কিছু টাকা পয়সা দিয়ে যেত,তারপর আবার চলে যেত। একটু বড় হলে, আব্বু ব্যবসা করা শুরু করে। কয়েক বছর পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায় লোকসান গুণতে হয় আব্বুকে। 

আব্বুর সামর্থ্য না থাকার কারণে, মাধ্যমিক পরীক্ষার টাকাও এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় দিয়েছিল।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় অনেক অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ৩.৮৩ নিয়ে পাশ করি। মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় যথাক্রমে ৪.১৯ ও ৩.৮৩ নিয়ে, ঢাবিতে পড়ার তীব্র মনোবাসনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই।

আব্বুর অসুস্থতার জন্য, পরিবারের পুরো বোঝা দ্বিতীয় বর্ষের শেষের দিক থেকে নেওয়া শুরু করেছি। প্রথমে এক বছর জিয়া হলের সামনে ব্যবসা করার পর, জিয়া হলের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণে (হল প্রাধ্যক্ষের ভাষ্যমতে), আমি এখন সূর্যসেন হলের সামনে শীতের পোশাক বিক্রি করি।

শীতের কষ্ট কি জিনিস আমি জানি, অনেকবার অন্যের শীতের পোশাক নিয়েছি। আমি জানি অনেক ছাত্রের শীতের পোশাক ক্রয় করার সামর্থ্য নেই। কেউ শীত লাগছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেও তাঁরা  বলে, না, আমার শীত লাগছে না। 

তাদের জন্য আমি একটা সুযোগ দিতে চাই- সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শীতের পোশাক নিতে পারবেন, শুধুমাত্র শীতের পোশাক ক্রয়মূল্য দিতে পারবেন, যদি মনে করেন কেন বিনামূল্যে নিতে যাব, তাহলে, টাকা চাকরি পাওয়ার পর দিতে পারবেন।

নিজে আমাকে সরাসরি বলতে পারেন অথবা বন্ধুর মাধ্যমে জানাতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের সামনে ‘ক্যাম্পাস ফেরিওয়ালা’র দোকানে সরাসরি চলে আসুন।

সাদ্দাম হোসেন জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়ে যাওয়া এক সংগ্রামী। যে স্বপ্ন দেখে নিজেকে প্রমাণ করার, স্বপ্ন দেখে সমাজকে পরিবর্তনের। সে মানুষের করুণা নয় সম্মান চায়। সাহায্য নয় সুযোগ চায় তাকে প্রমাণ করতে দেয়ার। সমাজের একজন আদর্শ ব্যক্তি হয়ে স্বপ্নপূরণের সংগ্রামে তিনি অন্যদের মতোই অদম্য বা তারচেয়েও বেশি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে সাদ্দাম বলেন, স্বপ্ন সরকারি একটা জব নিব। এর পাশাপাশি ‘অস্তিত্ব’ নামে আমার নিজস্ব কাপড়ের ব্রান্ড থাকবে। আমি কারো করুণা চাইনা। নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে পরিবার ও দেশের জন্য উৎসর্গ করতে চাই৷ 

আমি দেখিয়ে দিতে চাই যে, একটু সাহায্য ও সহযোগিতার হাত পেলেই আমরাও একদিন নিজেদের বড় কোন জায়গায় নিতে পারি। দেখিয়ে দিতে চাই প্রবল ইচ্ছাশক্তির সামনে চরম দারিদ্রতাও বাধা হয়ে দাড়াতে পারে না৷

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম