বয়ে যাওয়া রক্তের দিনগুলোর একদিন ৪ ডিসেম্বর

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৬,   ১৮ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

বয়ে যাওয়া রক্তের দিনগুলোর একদিন ৪ ডিসেম্বর

তানভীর রাসিব হাশেমী

 প্রকাশিত: ০০:৫৮ ৪ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ০৩:১৩ ৪ ডিসেম্বর ২০১৮

 

তানভীর রাসিব হাশেমী
১৯৯৩ সালের ২০ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার শাহজাহানপুরে জন্মগ্রহণ করেন তানভীর রাসিব হাশেমী। শহুরে আবহাওয়াতেই তার বেড়ে ওঠা। মিডিয়া স্ট্যাডিস এন্ড জার্নালিজমে অনার্স করা ছেলেটির বহু আগে থেকেই সাংবাদিকতায় ঝোঁক। ছাত্রজীবন থেকেই লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক ও অনলাইনগুলোতে। লিখেছেন ফিচার, প্রবন্ধ ও গল্প। দৈনিক মানবজমিন, আজকের কাগজ, ব্রেকিংনিউজডটকমডটবিডি ও বাংলানিউজ সহ বেশ কিছু গণমাধ্যমে কাজ করেছেন সহ-সম্পাদক ও কন্ট্রিবিউটর হিসেবে। বর্তমানে ডেইলি বাংলাদেশ’র সহ সম্পাদক ও শিফট ইনচার্জের (সকাল) দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি অব্যাহত রেখেছেন গণমাধ্যমে লেখালেখি।

শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মাস-ডিসেম্বর। বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাসও এটি।

যে কোন বিজয়ই আনন্দের। বিজয় মানে হাসি-খুশি উচ্ছলতা। আমাদের জীবনে বিজয়ের নানা দিক রয়েছে। কেউ খেলায় জিতে বিজয়ের আনন্দ লাভ করে। কেউ বা ব্যবসায় সাফল্য পেয়ে অর্থনৈতিক বিজয় অর্জন করে থাকে। শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করে বিজয়ের সীমাহীন লাভ করে এবং আনন্দ পায়। আবার কেউ কেউ যুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করে। এভাবে মানুষ অনেকভাবেই বিজয় পেয়ে খুশি হয়। তবে জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিজয় হলো স্বাধীনতা অর্জন। এ বিজয় আমাদের অহংকার আমাদের অনেক বড় গর্বের বিষয়। কারণ এক সাগর রক্ত ঢেলে আমরা মহান স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যে বিজয় অর্জিত হলো তার পেছনের ইতিহাসটা আমরা অনেকেই জানি না। আমরা অনেকেই জানি না এই স্বাধীনতার জন্য আমাদের কতটা কাল অপেক্ষা করতে হয়েছে। একাত্তরের এ স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন কিছু ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ এক ইতিহাস। এ ইতিহাস দেশের অগণিত মানুষের তাজা রক্ত ঝরার ইতিহাস। আমাদের এ ভূখন্ড একদিন স্বাধীন ছিল। এখানকার মানুষ পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করার এক ঐতিহ্যবাহী জাতি।

একাত্তরের আজকের দিনে অর্থাৎ ৪ ডিসেম্বর তিন নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা শমশেরনগর বিমানবন্দর এবং আখাউড়া রেলস্টেশন দখল করেন। ৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা দখল করেন মেহেরপুর। এছাড়া ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে কামালপুর নিজেদের আয়ত্তে আনেন।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রতিটি দিন আলাদা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হত। ১৯৭১ সালে ৪ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলেও বাংলাদেশকে নিয়ে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়; উত্তেজনা দেখা দেয় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জার নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি সংবলিত মার্কিন প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এমন উৎকণ্ঠায় তখন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এদিন লিখিত এক পত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান।

মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত হয়। যুদ্ধের পুরোটা সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনায় লক্ষ্মীপুর ছিল বিপর্যস্ত।

দখলদার সৈন্যদের যুদ্ধপরিশ্রান্ত ও হতোদ্যম করে তোলার পর মুক্তিবাহিনীর ৮ মাস দীর্ঘ সংগ্রামকে চূড়ান্ত রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ৪ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনীর সম্মুখ অভিযান শুরু হয় চারটি অঞ্চল থেকে। পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে তিন ডিভিশন সমন্বয়ে গঠিত চতুর্থ কোর সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-নোয়াখালী অভিমুখে, উত্তরাঞ্চল থেকে দুই ডিভিশন সমন্বয়ে ৩৩তম কোর রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া অভিমুখে, পশ্চিমাঞ্চল থেকে দুই ডিভিশন সমন্বয়ে গঠিত দ্বিতীয় কোর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অভিমুখে এবং মেঘালয় রাজ্যের তুরা থেকে ডিভিশন অপেক্ষা কম আরেকটি বাহিনী জামালপুর-ময়মনসিংহ অভিমুখে অভিযান শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতের বিমান ও নৌশক্তি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব যখন ভেস্তে যায়, তখন পাকিস্তানের পরাজয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গা থেকে পালানোর পথ খুঁজতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

এগুলোতো সামান্য একদিনের ঘটনা এমন ঘটনা একাত্তরের প্রতিটি দিন হয়েছিল। তিলে তিলে আমরা একটু একটু করে এই স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছি। এত কষ্ঠের পরেও রাজনৈতিক সংঘাত ও হানাহানি আজ এদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ নিরীহ ও শান্তিপ্রিয়। তারা কেউ সংঘাত চায় না। সবাই চায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা। সুজলা সুফলা বাংলার সোনালী স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে হলে আজ আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সবাই মিলে যদি এগিয়ে আসতে পারি তাহলে সত্যিকার অর্থে আমাদের বিজয় অর্থবহ হবে। আর দেশ হবে গৌরবান্বিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ/আরএ

Best Electronics