বড় বোনের আলিঙ্গনে অলৌকিকভাবে জীবন ফিরে পায় অপুষ্ট ছোট বোন!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০,   আশ্বিন ১৭ ১৪২৭,   ১৪ সফর ১৪৪২

বড় বোনের আলিঙ্গনে অলৌকিকভাবে জীবন ফিরে পায় অপুষ্ট ছোট বোন!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ৭ জুলাই ২০২০  

ছবি: জমজ দুই বোন

ছবি: জমজ দুই বোন

মায়ের পরই মর্যাদা দেয়া হয় বড় বোনকে। এখন পর্যন্ত অনেক নজির আছে বড় বোনদের ত্যাগ আর ভালোবাসার। তেমনই এক উদাহরণ জানলে আপনার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাবে। কারণ এমন অলৌকিক ঘটনা বিশ্বাস করতে হলে আপনাকে বেশ কিছুটা সময় নিতে হবে। আজকের লেখায় জেনে নিন সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি সম্পর্কে-

সময়টা ১৯৯৫ সাল। ম্যাসাচুসেটসের জ্যাকসন দম্পতি বিয়ের দীর্ঘদিন পরও বাবা-মা হতে পারছিলেন না। অবশেষে দীর্ঘ সাত বছর পর আসে তাদের জীবনে সেই সুখের মুহূর্ত। এই দম্পতি জানতে পারেন তাদের ঘর আলো করে আসছে সন্তান। তবে একটি নয় দুটি সন্তান। হেইডি এবং তার স্বামী পল জ্যাকসন খুশিতে আত্মহারা। সময় যেন কাটছেই না তাদের। ডাক্তাররা হেইডির প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ দেন ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে।  

তবে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় একদিন।  রেগুলার চেকাপে গিয়ে তারা জানতে পারেন গর্ভস্থ শিশু দুটির বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনক। সময়ের আগেই সিজার করতে হবে। না হলে শিশুদের বাঁচানো যাবে না। ভয় আর আতঙ্কে প্রায় মারা যাচ্ছিলেন হেইডি আর পল। ডাক্তারদের সিদ্ধান্তেই সময়ের ১২ সপ্তাহ আগেই সিজার করা হয় হেইডির। 

পৃথিবীর আলো দেখেছিল দুই অপুষ্ট কন্যা সন্তান কাইরি ও ব্রিয়েল। বড় বোন কাইরির চেয়ে মিনিট কয়েকের ছোট ব্রিয়েল। জন্মের পর তাদের রাখা হয়েছিল হাসপাতালের ‘নিওনাটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ইনকিউবেটারে। এই জমজ দুই বোনে ওজন ছিল বেশ কম। বড় বোন কাইরির ওজন ছিল ৯৯২ গ্রাম এবং ব্রিয়েলের ৯০৭ গ্রাম।

সেই মুহূর্তইনকিউবেটরে থাকাকালীন দ্রুত বাড়তে শুরু করে কাইরির ওজন। তবে অন্য ইনকিউবেটরে থাকা ব্রিয়েল ক্রমশ হারিয়ে ফেলছিল তার জীবনীশক্তি। শুরু হয়েছিল শ্বাসকষ্ট, হৃদপিন্ডের সমস্যা, নীল হয়ে আসছিল তার ছোট্ট শরীর। তার ওজন বৃদ্ধিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন দেয়া স্বত্বেও ব্রিয়েলের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছিল। ব্রিয়েলের বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। অন্যদিকে নিজের ইনকিউবেটরে হাত পা ছুঁড়ছিল সুস্থ সবল কাইরি।

ছোট্ট ব্রিয়েলের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ পর্যায়ে যায় নভেম্বরের ১২ তারিখে। তার হার্টবিট কমে গিয়েছিল, সে ক্রমাগত হেঁচকি তুলছিল। হাসপাতাল থেকে ফোন পেয়ে জ্যাকসন দম্পতি হাসপাতালে ছুটে এসে এই পরিস্থিতি দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। চোখের সামনে ছোট্ট মেয়েটিকে হারানোর দৃশ্য দেখতে পারছিলেন না তারা। 

অলৌকিক ঘটনার সূত্রপাত

অসুস্থ ব্রিয়েলের দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন হাসপাতালের অভিজ্ঞ এক নার্স গেইল কাসপারিয়ান। তিনি দিন-রাত এক করে ব্রিয়েলকে বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবুও ব্রিয়েল শ্বাস নিতে পারছিল না। তার হার্ট বিট কমে আসছিল। হঠাৎই নার্স গেইলের মনে পড়ে যায় এক পদ্ধতির কথা। ডাবল বেডিং নামক এক পদ্ধতির কথা তাকে শিখিয়েছিলেন এক বয়স্কা নার্স। অপুষ্ট যমজ শিশুদের একই ইনকিউবেটরে রাখার একটি পদ্ধতি হলো ‘ডাবল-বেডিং’। 

এই পদ্ধতি তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ছিল। তবে সংক্রমণের ভয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এই পদ্ধতির প্রচলন ঘটেনি তখনো। ব্রিয়েলকে বাঁচাতে নার্স গেইল ওই সময় শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে ওই পদ্ধতি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। নিজের চাকরি চলে যেতে পারে তবুও জ্যাকসন দম্পতির কাছে অনুমনি নিয়ে তাদের সামনেই নার্স এই কাজটি করেন। তিনি ছোট্ট ব্রিয়েলকে তুলে এনে বোন কাইরির ইনকিকউবেটরে শুইয়ে দেন।

বেড়ে উঠতে থাকে দুই বোন১৭ অক্টোবর জন্ম নেয়ার ২৭ দিন পর দুই বোন কাছাকাছি আসে তখন। আর ঠিক তখনই ঘটে অলৌকিক এক ঘটনা। অবাক চোখে সেই দৃশ্য দেখেন নার্স ও জ্যাকসন দম্পতি। ইনকিউবেটরের ঢাকনা বন্ধ করার আগেই ব্রিয়েল গড়িয়ে বড় বোনের গা ঘেঁষে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ে। বোনের গায়ে গা ঠেকিয়ে শোয়ামাত্রই ব্রিয়েলের খিঁচুনি বন্ধ হয়ে যায়। 

কয়েক মিনিটের মধ্যে বেড়ে গিয়েছিল ব্রিয়েলের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা। যা জন্মের পর থেকে ব্রিয়েলের শরীরে দেখা যায়নি। বড় বোন কাইরি তখন অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। বোন আসার পর হঠাৎ সে জেগে ওঠে। সবাইকে অবাক করে কাইরি তার ছোট্ট বাম হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল মৃতপ্রায় বোনকে। 

বড় বোনের আলিঙ্গনে যেন জীবন ফিরে পেয়েছিল ব্রিয়েলের। বাড়তে শুরু করেছিল শরীরের উষ্ণতা। জন্মের পর সেই প্রথম ঠিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে শুরু করেছিল ব্রিয়েল। তার ত্বকের রং স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সেই সময়ে হাসপাতালের সেই মুহূর্তের ছবি তুলেন এক চিত্র-সাংবাদিক। তার হাতেই ঐতিহাসিক এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী হয়।

বর্তমান ব্রিয়েল ও কাইরি

এরপর কেটে গিয়েছে ২৫ বছর। বর্তমানে তারা পুর্ণবয়স্ক নারী। তাদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা নার্স কাসপারিয়ানের সঙ্গে আজো তাদের যোগাযোগ রয়েছে। মাঝে মাঝে দেখা করেন তারা তিনজন। সেদিনকার অলৌকিক ঘটনার পর হাসপাতালের চিফ নার্স সুজান ফিটজ্যাক এক কনফারেন্সে যমজ অপুষ্ট শিশুদের ডাবল-বেডিং নিয়ে বক্তৃতা দেন। 

বর্তমানে তারা দুই বোনসেখানে তিনি বলেছিলেন, ডাবল-বেডিং পদ্ধতির প্রচলন হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি জানতেনও না তার হাসপাতালেই ডাবল-বেডিং মিরাকল ঘটিয়ে দিয়েছে। হাসপাতালে ফিরে খবরটি পেয়ে আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলেন সুজান। কনফারেন্সে যাওয়ার সময় নিশ্চিত ছিলেন, ফিরে এসে শুনবেন ব্রিয়েল নেই। দুঃসাহসী ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জড়িয়ে ধরেছিলেন নার্স কাসপারিয়ানকে।

এরপর দুই বোনকে একসঙ্গে রাখার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছিল ব্রিয়েল। দ্রুত বাড়ছিল ওজন, পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল ব্রিয়েলের দুষ্টুমি। সারাক্ষণ দুই বোন খুনশুটি করত ইনকিউবেটরে। দুজনের মুখেই ফুটে উঠত স্বর্গীয় হাসি। যার রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা হাসপাতালে। কয়েক মাস পরে, হাসপাতাল থেকে বাবা মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যায় ব্রিয়েল আর কাইরি। নার্স কাসপারিয়ানের নির্দেশে বাড়িতেও কাইরি আর ব্রিয়েলকে রাখা হয়েছিল এক বিছানায়।

চিত্র-সাংবাদিকের তোলা ‘দ্য রেসকিউ হাগ’ ছবিটি  ছাপা হয়েছিল বিশ্বের প্রায় সবকয়টি বড় সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে। অন্যদিকে বিপদের মুহুর্তে মরিয়া হয়ে ওঠা নার্স কাসপারিয়ানের সিদ্ধান্ত তৈরি করেছিল ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রে সেই প্রথম প্রথা ভেঙে একই ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছিল দুই সদ্যজাত যমজ শিশুকে। যা পরে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে মেনে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস