ঢাকা, শুক্রবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৯ ১৪২৫,   ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০

ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাস

রাজ চৌধুরী

 প্রকাশিত: ১০:২৮ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১১:০১ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

১০৬৬ সাল। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের যাত্রা শুরু। হ্যাঁ, এর আগেও তারা বিভিন্ন দেশের (ছোট ছোট) রাজত্ব করেছে। শুরু করতে গেলে কোনো এক জায়গা থেকে আমাদের শুরু করতে হবে কিন্তু এর আগে অনেক বেশিই দূরবর্তী সময় হয়ে যায়৷ প্রথম উইলিয়াম যিনি উইলিয়াম দ্য কনকোয়েরার নামে পরিচিত, প্রথম রাজা হিসেবে নরম্যান অঞ্চল জয় করেন। তার সন্তান সংখ্যা অনেক থাকলেও তারা সকলেই সমান গুরুত্ব পেতো না। উইলিয়ামের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত তথা জনপ্রিয় ছিলেন তিন জন। তারা হচ্ছেন দ্বিতীয় উইলিয়াম, প্রথম হেনরী ও অ্যাডেলা।

প্রতিদ্বন্দিতা সিংহাসনের

উইলিয়ামের মৃত্যুর পর সিংহাসনে কে বসবে তা নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা চলতে থাকে। তখন সাধারণত রাজার বড় ছেলেকেই সিংহাসনে বসানো হতো। উইলিয়ামের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় উইলিয়াম সিংহাসনে বসেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্বিতীয় উইলিয়াম কখনো বিয়ে করেননি। তিনি একবার তারই ভাই হেনরীর সঙ্গে শিকারে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান।পরবর্তীতে হেনরী তার স্থানে স্থলাভিষিক্ত হন। হেনরীর সন্তান সংখ্যা ছিলো ২৬। তাদের মধ্যে সিংহাসনের দাবীদার ছিলেন দু’জন। তার ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেলে তিনি তার মেয়ে মাতিলদাকে পরবর্তী সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষণা করেন।

তবে হেনরীর মৃত্যুর সময় মাতিলদা ফ্রান্সে ছিলো। তাই তখন অনেকে ভেবে নেন তার কাজিন স্টিফেন নতুন রাজা হবেন। কারণ তার সামরিক ক্ষমতা ছিলো। তা-ই হয়। স্টিফেনের ছেলে মেয়ে সবাই মারা গিয়েছিলো।তাই  স্টিফেনের মৃত্যুর পর তার সিংসাহনে বসেন তার ভাতিজা দ্বিতীয় হেনরী। উনার ছিলো ৪ ছেলে- হেনরী দ্য ইয়ং, জোফরি, প্রথম রিচার্ড ও জন। এদের চারজনই পালাক্রমে রাজা হন। প্রশ্ন আসতেই পারে চারজনই কীভাবে? একজনের মৃত্যুর পর আরেকজন রাজা হয়েছেন। এদের সকলেই কম বয়সে মারা যান। এই ভাইদের সকলের শেষে রাজা হন জন।

জন মারা যাওয়ার পর রাজত্য গিয়েছিলো তৃতীয় হেনরীর দখলে। তারপর রাজা হন প্রথন, দ্বিতীয় ও তার ছেলে তৃতীয় এডওয়ার্ড।এরপর পরিবারের কলহের কারণে বিভিন্নভাবে রাজা পরিবর্তন হতে থাকে। এক পর্যায়ে রাজসিংহাসনে বসেন রাজা অষ্টম হেনরী।তার ছিলো তিন সন্তান- মেরি, এলিজাবেথ ও ৮ম হেনরীর পর সিংহাসনে বসেন ষষ্ঠ এডওয়ার্ড। তার মৃত্যুর পর লেডি জেন রাণী হন। তবে তাকে ৯ম দিনে শাস্তি দিয়ে মাথা কেটে নেন মেরি। এদিকে, মেরির কোনো সন্তান ছিলো না।তার মৃত্যুর পর এলিজাবেথ সম্রাজ্ঞী হন।

কুমারী রাণী এলিজাবেথ

রাণী প্রথম এলিজাবেথ ছিলেন রাজা হেনরীর মেয়ে। তার জন্মের সময়ে হেনরী একজন পুত্রসন্তান কামনা করেন। তবে তার স্ত্রী একজন কন্যা সন্তানের জন্ম দিলে হেনরী তার স্ত্রীর মাথা কেটে নেয়ার আদেশ দেন। এই এলিজাবেথই ছিলেন কুমারী রাণী। তিনি কোনোদিন বিয়ে করেননি। যে সাম্রাজ্য পুরুষরাও সামলাতে সমস্যায় পড়েছিলো, তিনি নারী হয়ে একাই সেই সাম্রাজ্যের দেখাশোনা করেন।তারও কোনো সন্তান না থাকায় আবার বিপাকে পড়তে হয়।

স্কটল্যান্ডের রাজপরিবার

এলিজাবেথের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় রাজ পরিবারকে। তখন স্কটল্যান্ডের রাজা জেমস পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের জেমস তথা চতুর্থ জেমস রাজপরিবারের মার্গারেট টিউডরকে বিয়ে করেন এবং রাজপরিবারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন।এরপর কয়েক প্রজন্ম পর ষষ্ঠ জেমস ক্ষমতায় বসেন। তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন তার ছেলে প্রথম চার্লস।এসবের পরে ক্রমওয়েল নামে একজন চার্লসকে হত্যা করে তার ক্ষমতা দখল করেন। যদিও ক্রমওয়েল রাজ পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না।

অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট

অনেক ঝামেলার পর ১৭০১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় সিংহাসনে যেনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের কারো পুনরুত্থান হয়।এই নিয়মে সকল ক্যাথলিক ও যারা ক্যাথলিকদের বিয়ে করেছেন তাদেরকে বাদ দেয়া হয়।পরবর্তীতে রাণী হন সোফিয়া।১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড এক হয়ে ব্রিটশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে৷

মহা রাণী ভিক্টোরিয়া

মাঝে কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে ক্ষমতায় আসেন রাণী ভিক্টোরিয়া। তিনি ১৮ শতকের মাঝের দিকে ক্ষমতায় আসেন। তার আমলে ব্রিটিশরা সারা বিশ্ব দখল করা শুরু করে। তার কারণেই ব্রিটিশরা বলতো “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না।”

ভালোবাসা বনাম সিংহাসন

ব্রিটিশ রাণী ভিক্টোরিয়ার পর ক্ষমতায় আসেন সপ্তম এডওয়ার্ড এবং তার পরে তার পুত্র পঞ্চম জর্জ। পঞ্চম জর্জের ছেলে ছিলেন অষ্টম এডওয়ার্ড। তিনি এক মার্কিন ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করেন। ওই নারী একবার না, দু’বার ডিভোর্সি ছিলেন। কিন্তু অষ্টম এডওয়ার্ড তাকে এতোটাই ভালোবাসতেন যে তার কাছে এসব কোনো সমস্যাই ছিলো না। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের ছেলে ও সম্ভাব্য রাজা ছিলেন তিনি। সেই সময় নিয়ম অনু্যায়ী ওই মহিলাকে বিয়ে করলে এডওয়ার্ড রাজা হতে পারতেন না। তবুও তিনি তার ভালোবাসার জন্য সাম্রাজ্যের মায়া ত্যাগ করেন।

অষ্টম এডওয়ার্ড ওয়ালিসকেই বিয়ে করেন এবং তার জায়গায় অন্য কাউকে রাজা বানানোর কথা চিন্তা করা হয়। এডওয়ার্ডের জায়গায় অভিষেক ঘটে তার ভাই ষষ্ঠ জর্জের।সেসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পাল্টে যায়।ষষ্ঠ জর্জের পর ক্ষমতায় আসেন তারই মেয়ে দ্বিতীয় এলিজাবেথ। যিনি ১৯৫২ সালে ২৫ বছর বয়সে রাণী হন। বর্তমানেও তিনি ব্রিটিশ রাণী। তিনিই বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী রাণী। তার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের  রাজা হবেন তার পুত্র চার্লস। যিনি সিংহাসনের জন্য সবচেয়ে বেশি বছর অপেক্ষা করেছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস