ব্যথার সাথে শরীরের আঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ব্যথার সাথে শরীরের আঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই!

মেহেদী হাসান শান্ত  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:২১ ১২ জুন ২০১৯   আপডেট: ১১:২২ ১২ জুন ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে ১৯৯৫ সালে একজন রোগী সম্পর্কে একটি আশ্চর্য প্রতিবেদন প্রকাশ করল। রোগী ২৯ বছর বয়সী একজন রাজমিস্ত্রী। তিনি দুর্ঘটনাবশত একটি ১৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট পেরেকের সূচালো প্রান্তে লাফিয়ে পড়েন। পেরেকটি তার পায়ের বুট ছেদ করে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে যায়।  

রাজমিস্ত্রির ব্যথা এতই অবর্ণনীয় ছিল যে, সামান্য নড়াচরাতেই যেন তার জীবনটা যাওয়ার যোগাড়! কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তাররা যখন তার বুট খুলে নিলেন, তারা রীতিমত থ’ হয়ে গেলেন। পেরেকটি বুটের এমাথা থেকে ওমাথা বেরিয়ে গেলেও তা পায়ের পাতাকে এতটুকুও স্পর্শ করেনি! তাহলে সেই ব্যক্তি এতক্ষণ মরণ চিৎকার কেন দিচ্ছিলেন!
 
শত শত বছর যাবৎ বিজ্ঞানীরা ভেবে আসছিলেন, শারীরিক কোনো ক্ষত এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যথার উদ্ভব হয়। সেই যুক্তিতে চিন্তা করলে, ক্ষত এর পরিমাণ যত বেশি বা মারাত্মক হবে, ব্যথাও তত তীব্র হবে। কিন্তু ব্যথা নিয়ে আরো অনেক গবেষণা করার পর জানা গেছে, ব্যথার সাথে শরীরের কোনো টিস্যুর ক্ষত হবার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই! সত্যিকার অর্থে আহত না হয়েও আমরা মারাত্মক ব্যথা অনুভব করতে পারি। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল আগে বর্ণিত রাজমিস্ত্রীর ঘটনায়। অনেক সময়ই দেখা যায় গর্ভবতী মায়েরা যখন সন্তান প্রসব করেন, তাদের স্বামীরাও বেদনায় চিৎকার করতে থাকেন। ওই সময় কোনো আঘাত ছাড়াই তারাও অনেক ব্যথা অনুভব করে থাকেন। 

এখন প্রশ্ন হলো, এমনটা কেন হয়? শরীরে আঘাত না লাগলে কেন ব্যথা অনুভূত হবে? দুটি বিষয় এখানে কাজ করে। একটি হলো ব্যথার পূর্ব অভিজ্ঞতা, অন্যটি ননসিসেপশন নামক একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। নসিসেপশন হলো শরীরের জন্য ক্ষতিকর বা ক্ষতি করার ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো ক্রিয়ার ফলাফলস্বরূপ আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের এক ধরণের প্রতিরক্ষমূলক প্রতিক্রিয়া। আমাদের স্নায়ুকোষের শীর্ষভাগে আছে এমন কিছু সেন্সর, যা যেকোনো যান্ত্রিক, তাপীয় বা রাসায়নিক হুমকি চিহ্নিত করতে পারে। এই সেন্সরগুলো যথেষ্ট সংখ্যায় উদ্দীপ্ত হলে আক্রান্ত স্থান থেকে মেরুদণ্ড বেয়ে এক ধরণের বৈদ্যুতিক সংকেত আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্ক তখন যাচাই বাছাই করে দেখে, এই সংকেতের গুরুত্ব কতখানি। মস্তিষ্ক যদি মনে করে ওই মুহূর্তে শরীরের প্রতিরক্ষা প্রয়োজন, তবে এটি ব্যথার অনুভূতিকে সক্রিয় করে দেয়। 

সাধারণত আক্রান্ত স্থান যাতে আরো বেশি ক্ষতি বা আঘাতের সম্মুখীন না হয় সেজন্যই ব্যথার উদ্ভব। কিন্তু নসিসেপশনের পেছনে বেশ কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে, যেগুলো ব্যথার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে এবং মাঝে মাঝে ব্যথার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। প্রথমত, কিছু জৈবিক ফ্যাক্টর রয়েছে যা মস্তিষ্কে নসিসেপটিভ সিগনালের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। যদি এভাবে বারবার স্নায়ুতন্তুগুলো সক্রিয় হয়, হুমকি থেকে দেহকে রক্ষা করতে মস্তিষ্ক তখন আরো বেশি স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। স্নায়ুতন্তুতে তখন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি স্ট্রেস সেন্সর যুক্ত হয়। স্নায়ুতন্তু তখন এতটাই স্পর্শকাতর হয় যে, শুধুমাত্র আলোর স্পর্শ পেলেও শরীর প্রচুর পরিমাণে বৈদ্যুতিক সংকেত মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়। যার ফলে অকারণেই প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হতে পারে। 

ক্রনিক পেইনে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি বেশি ঘটে থাকে। সেসব ব্যথা টানা দীর্ঘ ৩ মাসেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে!

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস