Alexa ‘বৈকালিক আলোয়’ দেখা জীবনের প্রতিচ্ছবি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৭ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ২ ১৪২৬,   ১৭ সফর ১৪৪১

Akash

উৎপলকুমার গুপ্ত’র কবিতা

‘বৈকালিক আলোয়’ দেখা জীবনের প্রতিচ্ছবি

বীরেন মুখার্জী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩১ ২২ জুন ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

কবিতার প্রাথমিক শর্ত কী- এমন একটি প্রশ্ন সামনে রেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়ে শুরু করি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- ‘আর্ট (শিল্প) হলো সত্যের ডাকে মানুষের সৃষ্টিমুখর অন্তরের সাড়া দেয়া।’ ঠাকুরের বাণীকে আত্মস্থ করে বলা যেতে পারে- স্পর্শকাতরতা, অনুভূতি ও অভিঘাত প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান, তবে এর ভেতর থেকে যারা অনুভূতিকে সঠিক ভাষাদানে পারঙ্গম তারাই মহৎ শিল্পী। যেকোন উন্নত-শিল্পে অনুভূতি প্রকাশে স্বতঃস্ফূর্ততার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন বাঁক ও ব্যঞ্জনা থাকা জরুরি।

সত্য ও সুন্দরের নিবিড় সমাবেশের গভীরে যে নিরন্তর মনোময় বেদনা ও আশ্বাসের স্বর স্পন্দন তোলে; কবি ও শিল্পীরা সেই পরিশ্রুত স্পন্দন, সংরাগ, রঙ, শব্দ ও ব্যঞ্জনার খোঁজেই আজীবন ছুটে চলেন। শিল্পের এসব প্রপঞ্চ বিবেচনায় নিয়ে ষাটের দশকের কবি উৎপলকুমার গুপ্ত’র কবিতা কতটুকু কবিতা এবং কবি হিসেবে তার মনীষার সুলুকসন্ধান করা যেতে পারে।  

প্রণিধানযোগ্য যে, জীবনসত্যের উপলব্ধিকে প্রকাশ করার প্রক্রিয়া-ই ‘শিল্পসাধনা’। আর মানুষের অন্তরের চিন্তাচেতনা যখন ভাবানুভূতির বর্ণবৈচিত্র্যে, যথোপযুক্ত শব্দবিন্যাসে, সুবিন্যস্ত চিত্রে ও ছন্দিত বিন্যাসে উপস্থাপিত হয় তখনই তা হয়ে ওঠে কবিতা। যে কারণে কবিতার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয় ছন্দ ও অলঙ্কার। তবে অনেক কবিতাবোদ্ধা মনে করেন, কবিতায় এগুলো সবসময় অপরিহার্য না-ও হতে পারে। একটি ভালো কবিতা প্রচল এসব শর্তকে আড়াল করতে পারে; না-পারলে সেই কবিতা ভালো নয়- এমনটিও মনে করা যেতে পারে। অনেক কবিতা আছে যেগুলো পাঠের সময় এবং পরে ছন্দ আর উপমা জেগে থাকে, ফলে কবিতাটির আসল বা আপাত অভিপ্রায়টি বোঝা মুশকিল বা সেদিকে পাঠকের মনোযোগ থাকে না। পাঠক নিজের অজান্তেই তখন কবিতা থেকে দূরে সরে যায়। এমন কবিতা এবং সৃষ্টাকে ব্যর্থই বলব। ধারণা করি, কবিতার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা; সমকালোত্তর হয়ে ওঠা তার অভিপ্রায়; নানা তত্ত্ব, সংজ্ঞা ও বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতির ছক বা দাসত্ব থেকে মুক্তি চায় সে। উৎপলকুমার গুপ্ত যখন বলেন-

‘মন্দ জলে ডুবে আছে শরীর, সামনে পেছনে
কেউ নেই
পাতা ঝরে ঝরে বিষনীল হয়ে আছে জল
দূর থেকে বোঝে না কেউ
এমন কি বোঝার যোগ্যতাও নেই
মন্দ জলে থেকে থেকে
কাজ আর ভাষা ভুলে গেছে’ 
[মন্দ জলে ডুবে আছি/এখন এই সময়, এখন ও তুমি]

তখন, কবির চোখে যে দৃশ্য এবং বোধে যে মর্মজ্বালা ধ্বনিত হতে থাকে তা সংশয়হীনভাবে সমকালীনতাকে স্পর্শ করে বৈকি। আবার কবিতাটির মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখি জীবনের হাহাকার, বিপন্নতা ও বিস্ময়বোধের আধুনিক উচ্চারণ; যা মহার্ঘ জীবনের ইঙ্গিতবাহী বলেও মনে করা যায়। অত্যন্ত স্বাভাবিক কথামালায় তিনি জীবনের হতাশাকেই যেন গ্রন্থন করেন। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন প্রতীক ও উপমা জুড়ে দেন কবিতার শরীরে। আবার একই কবিতাগ্রন্থের ‘বসন্ত : ২০০০’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন- 

‘সারাদেশে আজ বন্দুকের কারখানা, আগুনের মহোৎসব
বসন্ত-মুকুল চুপচাপ দেখে যায় অপলক
কোকিলের গান থামে, ইষ্টকুটুমেরা পাখা মেলে
দূরে উড়ে যায়
বারুদের গন্ধে ফুলের সুঘ্রাণ মাথা নিচু করে
তখনও আততায়ী নতুন শিকার খোঁজে
সুন্দর ভোরে
বিখ্যাত চিত্রকর তবু ধীরস্থির
জ্বলে যায় ক্যানভাস ব্যাকুল বাতাসে’

বলাই বাহুল্য, একজন সাধারণ মানুষ যা দেখেন, একজন প্রকৃত কবি দেখেন তারচেয়েও অধিক কিছু। কবির দৃষ্টিসীমার সামনে কোনোকিছুই বাঁধা হতে পারে না। কেননা, কবি দেখেন মানসচক্ষু দিয়ে, আর বিচার করেন বোধের অতলান্তে প্রবেশ করে। এজন্য বোধ করি কবিকে বলা হয়ে থাকে ‘স্রষ্টা এবং দ্রষ্টা’। কবি উৎপলকুমার গুপ্ত-ও দেখেছেন পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি। যেখানে পুষ্পের সৌরভের বিপরীতে বারুদের গন্ধ ভাসে। প্রকৃতি কীভাবে বদলে যাচ্ছে, সে দৃশ্য দেখার পাশাপাশি একজন শিল্পী এরূপ বৈকল্যময় পরিস্থিতিতে কতটা অসহায় হয়ে পড়েন- সে বাস্তবতাও শব্দে-শব্দে তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছেন কবি শ্রীগুপ্ত। 

শিল্প সামর্থ্য এবং নিবিড় বীক্ষণের বিশুদ্ধ ভাষাগুণে একজন কবি হয়ে উঠতে পারেন মহৎ। বিপ্লব, মানবতা ও আত্মবিশ্বাসের বাণী ফুটিয়ে হতে পারেন অমর। বিশ্বসাহিত্যে এমন নজিরও আছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, কবিতা কি সামাজিক-মানসিক কিংবা রাষ্ট্রীয় সমস্যা সমাধানের নিমিত্তে রচিত? প্রশ্নটির উত্তর বহুভাবেই দেয়া যেতে পারে। তবে আপাতসত্য এটা হতে পারে যে, কবিতা যদি শিল্পের সবচেয়ে সূ²মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে তাহলে, শিল্পের প্রধানতম কাজ হচ্ছে পাঠকের মননে টংকার তোলা। টিএস এলিয়ট যেমন মনে করেন- কবিতা সেটাই, যা পাঠ মাত্র সঞ্চারিত হয়। তবে এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, শব্দচয়ন ও ভাষাভঙ্গির নৈপূণ্য একজন কবিকে তার সময়ের অন্য কবি থেকে পৃথক করে। আবার নিজস্ব চিন্তার সঙ্গে বৈশ্বিক চিন্তার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একজন কবি নতুন আঙ্গিকে তা পরিবেশনও করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে উৎপলকুমার গুপ্ত-কে ব্যতিক্রম হিসেবে শনাক্ত করার যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি মেলে না। এরপরও তার কবিতার মর্মে গুঞ্জরিত নৈরাজ্য, হতাশা, রোমাণ্টিকতা, পরিমিতিবোধ, আন্তর্জাতিকতা; সর্বোপরি সমাজকে পর্যবেক্ষণের যে অভীপ্সা- তা সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। 

‘সময় নেই, আপনি তাড়াতাড়ি করুন
তারারা খসে যাচ্ছে
পাতারা ঝরে যাচ্ছে
এমন কি নদী ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে করাল গ্রাসে
সময় নেই, আপনি তাড়াতাড়ি করুন’

[বৈকালিক আলোয়/এখন এই সময়, এখন ও তুমি]

কবি শ্রীগুপ্ত, সময়ের এক একটি বিন্দুতে দাঁড়িয়ে এভাবেই পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিতে সচেষ্ট যে, ‘সময় নেই’। সত্যি কথা বলতে, বিচ্ছিন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে প্রতিটি মানুষই যন্ত্রণাদগ্ধ-ক্ষতবিক্ষত, কী নৈর্ব্যক্তিকতায়, কী সমাজে, কী রাষ্ট্রে। মানুষ ‘আধুনিকতা’র টানে ক্রমেই নিজেকে সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করছে, নতুনত্ব ও অভিনবত্বে। নির্দিষ্ট দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব বাদ দিয়েও বলা যায়, মানুষের হাতে সময় খুব কম। এটি এক ধরনের অস্থিরতা, মনোবৈকল্য। যে অস্থিরতা ক্রমেই গ্রাস করছে আমাদের মেধা ও মনন, পরিপার্শ্বকে। ‘আধুনিকতা’ শব্দটি সময়-নির্ভরতার বিচারে আপেক্ষিক হলেও কবি শ্রীগুপ্ত ‘সময় নেই’ বলে সেই আধুনিকতার ঘেরাটোপে পরিবর্তনের যে দৃশ্যাবলি পাঠকের সামনে হাজির করেন তা প্রকৃতপ্রস্তাবে জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবেই প্রতিভাত হয়। 

২.
‘কবিতার ভুবনে সবচেয়ে বড় অঘটন বিষয় ও প্রকরণের প্রাধান্য নিয়ে দ্বন্দ্ব, যা কাল থেকে কালান্তরের সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে’- সমালোচক আহমদ রফিকের এমন চিন্তাকে আত্মস্থ করে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে স্বীকার করছি, যে ধরনের কবিতা আমাকে সর্বাধিক টানে, শ্রীগুপ্তের কবিতা তেমনটি নয়। কবিতার ফরমেশন বা নির্মাণকৌশল, বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শব্দপ্রয়োগের মুন্সিয়ানা এবং নতুন অর্থবোধক শব্দের পরিশীলিত ব্যবহার সমৃদ্ধ কবিতা আমাকে বেশি টানে। এটিই আমার রুচি। এ কথা উল্লেখ করার অর্থ এই যে, পাঠকভেদে রুচির পার্থক্য থাকাটা অমূলক নয়। আর রুচিভেদে কবিতার সঙ্গে পাঠকের এই আন্তঃসংঘাতের বিষয়টি বোধ করি নতুন নয়, কবিতার জন্মলগ্ন থেকেই প্রবহমান। কবিতার শিল্পসর্বস্বতা নিয়ে, শব্দের একাধিপত্য নিয়ে, সুদূর ফরাসি দেশ থেকে বঙ্গদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিতর্ক। ফলে কোনটি কবিতা আর কোনটি কবিতা নয়, এ মিমাংসা সহজসাধ্য নয়।

পরিশেষে শ্রীগুপ্তের কবিতার সার্বিক পাঠে এ কথা বলা অত্যুক্তি হয় না যে, শ্রীগুপ্ত’র কবিতাও তার সময়পর্বের অন্য কবিদের মতোই ব্যক্তিবৃত্তে আবদ্ধ। তবে বিচ্ছিন্ন কাব্যব্যক্তিত্বের প্রকাশে সংশয়বাদী হওয়ায় তার কবিতা গভীর অভিনিবেশের দাবি রাখে। তার কবিতা যেমন বিশেষ কোনো তত্ত্বের অভিঘাতে জর্জরিত নয়, তেমনই কোনো বিশেষ উদ্দেশেও রচিত হয়নি। তার কবিতায় ব্যঞ্জিত হয়েছে ব্যক্তিক উপলক্ষ এবং তা থেকে সৃষ্ট উপলব্ধি, যা তার কবিতাকে অনন্য করে তুলেছে। তার কবিতা ‘জলের মতো নিঃশব্দে ঢুকে’ পড়ে পাঠকের মননভ‚মে। শ্রীগুপ্ত মখমলের মতো সময়ে দাঁড়িয়ে যে তীব্র উচ্ছ্বাস ও চুম্বন বাড়িয়ে দিয়েছেন পাঠকের উদ্দেশে; পাঠক তার সৃজিত রসে দীর্ঘদিন স্নাত হবেন এমন আশাবাদ আমার।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর