Alexa বীরাঙ্গনা উপাধি, স্বীকৃতি নয়!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

বীরাঙ্গনা উপাধি, স্বীকৃতি নয়!

 প্রকাশিত: ১৯:০১ ২২ মার্চ ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার এক সপ্তাহ পার হয়েছে। পটুয়াখালী পৌর শহরের পুরাতন আদালত প্রাঙ্গনে ১৮-২০ জন কিশোরী অর্ধাবস্ত্র অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে রয়েছে। যাদের সবার বয়স ১২-১৫ এর কোঠায়। কারো জ্ঞান আছে, কেউ জ্ঞানহীন, কেউ সামান্য নড়াচড়া করছে। মশা-মাছিরা পরিত্যক্ত ওই কিশোরীদের গায়ে ওঠবস করছে। তার পাশেই আরো এক কিশোরীর স্পর্শকাতর স্থানে শুকিয়ে যাওয়া রক্তাক্ত বসনের গন্ধ শুকছে কয়েকটি কুকুর। এমন দৃশ্য চোখ পড়ে সদ্য মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরা আনছারের। দুরু দুরু বুকে সন্ত্রস্ত আনছার পরিত্যক্ত ওই কিশোরীদের কাছে যায়। এক কিশোরীর সর্বাঙ্গে আঘাতের চিহ্নগুলো (ঘাঁ) প্রদাহে পরিণত।

পটুয়াখালীতে ১৮ জনের বীরাঙ্গনায় তালিকায় মধ্য পুরাতন আদালত পাড়ায় সভ্যতা বিবর্জিত সেই দৃশ্যের প্রত্যক্ষ নারী আনোয়ারা বেগম মুক্তিযোদ্ধা আনছার আলীর স্ত্রী। স্বামী হয়েছে, সংসার হয়েছে, কিন্তু মা হতে পারেননি।

যুদ্ধকালীন সময়ে অন্যদের সঙ্গে পালাতে গিয়ে পায়রা নদীতে আরো কয়েক কিশোরীসহ পাকিস্তানী সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। এরপর যা ঘটেছে, সেই স্মৃতি শুধু তাকে র্নিঘুম করে দেয়। স্বামীকে নিয়ে শহরের কলেজ রোড এলাকায় বসবাস করে আসছেন। আরো এক নারী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়ার  রিজিয়া বেগম। বয়স  ১২-১৩’র কোঠায়। বছর দুই এক আগে পায়ে আলতা আর লাল বেনারসি পরে স্বামীর ঘরে আসেন রিজিয়া।  স্বামী জয়নুদ্দিন প্যাদ্যা পায়রা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতেন। শরীর থেকে বিয়ের রঙ না মুছতেই শুরু হয় যুদ্ধ। ততদিনে রিজিয়া দেলোয়ার নামে এক সন্তানের মা। কিন্তু রিজিয়ার পরর্বতী মা হওয়ার স্বপ্ন লন্ডভণ্ড করে দেয় নির্মম নির্যাতন। 

মৃত আজিজ প্যাদার স্ত্রী ছয় সন্তানের জননী মনোয়ারা বেগম। ২০১৪ সালে স্বামী মারা গেছে। ছয় সন্তানের মধ্য সবাই যার যার পরিবার নিয়ে টানাপড়েনে রয়েছে। ছয় সন্তানের মধ্যে রুহুল আমীন বিয়ে না করায় তিনি মায়ের দেখাশুন করেন। মনোয়ারা বোন ফুল বরুর অসুস্থ স্বামী আজাহার মোল্লাকে দেখতে তার বাড়ীতে আসেন। ওই দিন-ই বাড়ীর পাশের কচাবুনিয়া বোর্ড স্কুলের সামনে পাকিস্তানী সেনাদের গানবোট নোঙ্গর করে। সেনারা ওই গ্রামে হানা দেয়। শুরু হয় গোলাগুলি। পালানোর সময় সেনাদের কাছে ধরা পরে মনোয়ারা ও ফুলবরু। এর পর দুই বোনকে টানা ১০ দিন আটকে নির্যাতন করা হয় সাকির্ট হাউজের কক্ষে। অসুস্থ দুই বোনকে কচাবুনিয়া নদীর তীরে ফেলে রেখে যায় তারা। মনোয়ারার বোন ফুলবরুর সংসার হয়েছে, কিন্তু মা হতে পারেননি আজও! 

আরো এক নারী মৃত মেনাচ তালুদারের স্ত্রী বৃদ্ধা জামিনা বেগম। যুদ্ধের সময় সাত মাসের গর্ববতী ছিল জামিনা। সেনাবাহিনী তাদের গ্রামে হানা দিয়েছে এমন খবরে প্রতিবেশি ইসমাইল ও স্বামীর হাত ধরে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হয় সেই চেষ্টা। তিন জন-ই পাক বাহিনীর গুলির মুখে পড়েন। পাকবাহিনী তার স্বামী ও ইসমাইলকে গুলি করে। কোনোভাবে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পায় তার স্বামী। গুলিতে নিহত হয় ইসমাইল। গর্ভবতী জামিনাকে ধরে নিয়ে যায় সার্কিট হাউজে। টানা পাঁচদিন নির্যাতন চলে জামিনা উপরে। স্বামী হারা এই জামিনা কোনোভাবে বেঁচে রয়েছে। জামিনার ছেলে সুজন পেশায় রিকশাচালক। বৃদ্ধা বীরাঙ্গনা মাকে নিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়ে আসছে।

এ তালিকায় রয়েছে বিধবা ৮৪ বছরের হাজেরা। যুদ্ধকালীন সময়ে হাজেরার ৫ বছরের একটি কন্যা ছিল। ওই সময়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। পাক বাহিনীর হাতে ধরা পরে যায় হাজেরা। হাজেরাকে তুলে নিতে  সেনারদল তার চুলের মুঠি ধরে টানা-হেঁচড়া করতে থাকে। এসময় সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে হাজেরার ওপর গুলি ছোঁড়ে। গুলিটি লক্ষভ্রষ্ট হয়ে হাজেরার হাত ভেদ বুকের পাজরে লুকানো নাছিমার মাথায় প্রবেশ করে। গুলির আঘাতে শিশু কন্যা নাছিমা মাটিয়ে লুটিয়ে পরেন। নাছিমার রক্তাক্ত দেহ দেখে হাজেরাও মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। কিন্তু রেহাই দেয়া হয়নি তাকে। গুলিবিদ্ধ নাছিমাসহ সেনারা তুলে নিয়ে যায় সার্কিট হাউজে। নিকস অন্ধকার কক্ষে গুলিবিদ্ধ নাছিমার রক্তাক্ত নিথর দেহের আর্ত্মচিৎকার। আর তার পাশেই চলে মায়ের উপর  সেনাদের পালাক্রমে পাষবিক নির্যাতন। চার দিনের মাথায় মারা যায় গুলিবিদ্ধ নাছিমা। চার দিন পরে পাক সেনারা স্বাদ মিটিয়ে ছেরে দেয় তাকে। বাড়ী গিয়ে দেখে মাথা গোজার ছাউনি টুকু আর দাড়িয়ে নেই। স্থানীয় রাজাকারের দল পুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভুলতে পারেনি ৭১ এর সেই ভয়াল রাতের কথা।

পাশের গ্রামে আব্দুর রশিদের স্ত্রী ছয়তুন নেছা। ঐ দিন গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। স্বামী, সন্তান জাকির হোসেন প্রতিবেশি মইয়ুর নেছা আর অবিবাহিত বোনকে নিয়ে পালানোর প্রস্তুতি নেন। কিছুদূর না যেতেই তাক করানো পাক সেনার গুলির মুখে পড়েন সবাই। স্বামীকে মারধোর করে তুলে নিয়ে যায় ছয়তুন, ময়ুরনেছা  আর তার বোনকে। তিন জনকেই সার্কিট হাউজে আটকে রেখে চলে দানব দলের যৌন ক্ষুধার  নিবারণ।

একইসঙ্গে তুলে নেয়া হয় মনোয়ারা বেগম, রিজিয়া বেগম জয়ফুল ও হাছন ভানুকে। এসময় তিন নারীরই এক- দেড় বছর বয়সের শিশু সন্তান ছিল।

বীরাঙ্গনার তালিকায় হাছন ভানুর নাম থাকলেও তিনি দীর্ঘ ১০ বছর আগে মারা গেছেন। তার একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। একই দিনে পাক সেনারা হাজেরা বেগম, ছকিনা খাতুন ও ময়ুর নেছা, জামিনাসহ ছয়তুন নেছা সহ ১৫ জন নারীকে ধরে নিয়ে যায়।

এ তালিকায় রয়েছে আরো অন্তত ১৮ জন নারী। যাদের মধ্য ১০ জন মারা গেছে। যারা বেঁচে আছেন তারাও সমাজের চলমান সভ্যতা থেকে মুখ লুকিয়ে থাকেন।

তারা বলেন, তৎকালীন জেলা প্রশাসক অমিতাভ সরকার প্রতিজনকে ৫ হাজার টাকা করে সাহায্য দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা গেজেট ভুক্ত হয়ে সব সুবিধা ভোগ করছে। আর আমরা এখন অবহেলিত। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছরে শুধু উপাধি দেয়া হয়েছে কিন্তু সরকার আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ/আরআর