বিসিএস ক্যাডার থেকে রন্ধনশিল্পী

ঢাকা, বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১১ ১৪২৭,   ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

বিসিএস ক্যাডার থেকে রন্ধনশিল্পী

স্বরলিপি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৩ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

ফাহা হোসাইন

ফাহা হোসাইন

ভোজন রসিক পরিবার। রান্নায়ও নাম-ডাক বেশ ভালো তাদের। আশেপাশের ৩/৪ গ্রামে তার দাদির হাতের রান্নার প্রচণ্ড সুখ্যাতি ছিল। পুরুষরাও পিছিয়ে নেই, ট্রেডিশানাল রেসিপির ব্যাপারে তাদের জ্ঞানের মাত্রা খুবই ভালো। সেই পরিবারে জন্ম নিয়ে রান্নার প্রতি প্রেম থাকবে না তা হয় নাকি! এতক্ষণ বলছিলাম ফাহা হোসাইনের কথা। যিনি বিসিএস ক্যাডার হয়েও পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন রন্ধনশিল্পকে!

রান্নার প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে বিসিএস ক্যাডার হয়েও রন্ধনশিল্পী হিসেবে কাজ করছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফাহা হোসাইনের এই ভালোবাসাটুকু ছোটবেলা থেকেই। তার কাছে প্রশ্ন ছিল, যেখানে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য দেশের লাখ লাখ প্রতিযোগী মুখিয়ে থাকেন, সেখানে আপনি কেন সরে আসলেন?

‘আমার দাদি খুবই ভালো রাঁধেন। মাও এ ব্যপারে বেশ যত্নবান। মায়ের রান্না অসাধারণ। ছোটবেলা থেকে আমি রান্নাঘরে ঘোরাঘুরি, মায়ের সঙ্গে কাটাকুটি করতাম। একটু বড় হয়ে কিছু রান্না শিখে যাই। শখের বসে রান্না করে অন্যদেরও খাওয়াতাম। বিশেষ করে উৎসবে রান্না করতে ভালো লাগত। রান্না ভালো হলে মুঠোফোনে ছবি তুলতে ভুলতাম না! এভাবে রান্নার প্রতি আমার আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু এই ভালোবাসার রঙ আরো গাঢ় হয় কয়েকবছর আগে।’ -বললেন ফাহা হোসাইন।

রান্নাকে পেশা হিসেবে নেয়ার চিন্তা মাথায় আসে ২০১৫ সালে। সে বছর কোনো কিছু চিন্তা না করেই ফাহা ফেসবুকে একটি ফেসবুক গ্রুপ চালু করেন। এতদিনের জমানো ছবিগুলো আপলোড করেনে পেইজে। প্রথমে তেমন কোনো সাড়া না পেলেও, আস্তে আস্তে নানা জনের মন্তব্য পেতে শুরু করেন তিনি। ফেসবুক বন্ধুদের বিভিন্ন মন্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো ভালোভাবে শুরু করেন এই মিশন। ‘কুকবুক’ ডাউনলোড করে সিদ্দীকা কবীরের রান্নার বই থেকে রান্নার মূল নিয়ম-কানুন শিখতে থাকেন তিনি। এভাবেই রান্নাকে পেশা হিসেবে নিতে নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করেন।

ফাহা হোসাইন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পাশ করেছি, আমার কাছে অর্থনীতি একটি জটিল বিষয় ছিল। শিক্ষকতা করতে হলে অর্থনীতি বিষয়েই করতে হত। এই জটিলতার সঙ্গে আবার জড়িয়ে যেতে চাইনি। এমন একটি বিষয় চেয়েছি যার সঙ্গে মানসিক প্রশান্তি জড়িত। তার খোঁজ আমি পেয়েছি ফুড ফটোগ্রাফি, আর নতুন নতুন রেসিপি তৈরি করার মধ্যে। ’

পেশাগ্রহণের ক্ষেত্রে সামাজিক ধ্যান-ধারণা নিয়ে ফাহা হোসাইন বলেন, ‘একজন মেয়ে কীভাবে হাঁটবে,কথা বলবে, কোথায় যাবে, কি করবে সেটা সমাজের লোকজন ঠিক করে দেয়- সেখানে স্বাধীন পেশা গ্রহণের স্বাধীনতা কঠিনই বলা চলে। এখানে আপনাকে সহায়তা করার বিষয়টি বাদ দিলে কীভাবে আপনার স্বপ্নগুলো মেরে ফেলা যায়, সেটা নিয়ে সবার ব্যস্ততা বেশি। হাস্যকর ব্যাপার, যার কোনো যোগ্যতা নেই সেও সমালোচনা করতে পারে। প্রচণ্ড সাহসী হতে হয় পছন্দের পেশা গ্রহণের জন্য’।

ফাহার পেশাগত সিদ্ধান্ত প্রথমে তার বাবাকে শঙ্কিত করে তুলেছিলো। ফাহার স্বামীও প্রথমে বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু ফাহার আত্মবিশ্বাস দেখে পরে তিনিই সহযোগী হয়ে উঠেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা ছিল তার মায়ের।

ফাহা হোসাইন মনে করেন, রেসিপি কন্ট্রিবিউশনের সঙ্গে ফুড ফটোগ্রাফিটা খুব জরুরি। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে নিজের রেসিপিগুলো পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন ফাহা। শুধু তাই নয়, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রতিষ্ঠা করতে চান ফাহা’স কিচেন। এছাড়া, টেলিভিশনে রন্ধনবিষয়ক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে চান তিনি।

ফাহা হোসাইন বাংলাদেশ এবং কলকাতায় বেশ কয়েকটি ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকায় রেসিপি বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন। একই সঙ্গে ফুড ফটোগ্রাফির কাজও করছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন নিজেই একটি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ‘ফাহা'স কিচেন’ নামে এটির যাত্রা শুরু হবে চলতি বছরের মার্চে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে একটি ব্যস্ত এলাকা বেছে নিয়েছেন রেস্টুরেন্টের জন্য।

কি ছেড়ে এসেছেন তা নিয়ে ভাবতে রাজী নন ফাহা হোসাইন। তার ভাবনাজুড়ে রন্ধনশিল্প। একজন কণ্ঠশিল্পী যেমন গায়কীতে নির্ভূল হতে চান, একজন চিত্রশিল্পী যেমন নিখুঁত আঁকতে চান; তেমনি ফাহা হোসাইন রন্ধনশিল্পে নিজের অবস্থান গড়তে চান। স্বপ্ন দেখেন রান্নার সুখ্যাতি আর নিজের নাম পৌঁছাবে বহু দূর।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে