Exim Bank Ltd.
ঢাকা, মঙ্গলবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

বিষাদের কবি সিলভিয়া প্লাথ

আনতারা রাইসাডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
বিষাদের কবি সিলভিয়া প্লাথ
ছবি: সংগৃহীত

‘জীবনের শারীরিক এবং মানসিক অনুভূতিকে, সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ আর বৈচিত্র্যকে যাপন করতে চাই। অথচ কি তীব্র সীমাবদ্ধতা!’-বাঁচার এরকম আকুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত ত্রিশ বছর বয়সেই আত্মহত্যা করেন সিলভিয়া প্লাথ। তিনি একজন প্রতিভাবান মার্কিন কবি, ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প রচয়িতা। যারা নারীবাদ নিয়ে আগ্রহী তাদের কাছে সিলভিয়া প্লাথ একটি অতি পরিচিত নাম। বিংশ শতাব্দীর একজন উল্লেখযোগ্য নারীবাদী সাহিত্যিক তিনি।

সিলভিয়ার জন্ম ১৯৩২ সালের ২৭ অক্টোবর। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে মেয়েটি আর ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারেননি। মূলত সেই থেকেই তার বিষণ্ণ জীবনের শুরু। জীবনের প্রথম নয় বছরকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে- "যেন ওই স্বচ্ছ কাঁচের বোতলে বন্দী জাহাজের মতো। সুন্দর, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, বস্তাপচা। নজরকাড়া, সাদা এক দুরন্ত পুরাণকথা।" প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় মাত্র আট বছর বয়সে ‘বোস্টন হেরল্ড' পত্রিকার শিশু শাখায়।

স্কুলের পাট চুকিয়ে স্মিথ কলেজ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে স্নাতক করেন এবং ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে কেমব্রিজের নিউনহ্যাম কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ততদিনে তিনি পুরোদুস্তর কবি। ১৯৫৬ সালে ভালবেসে বিয়ে করেন সেই সময়েরই বিখ্যাত কবি টেড হিউজেসকে। কিন্তু হতাশা কোনোদিন পিছু ছাড়েনি। ১৯৫৩ সালে ঘুমের ওষুধ খেয়ে প্রথম আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু মৃত্যু আসেনি। এই প্রসঙ্গে লিখেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলাম আমার চারপাশের এই অন্ধকারের ঘূর্ণির কাছে; যাকে ভেবেছিলাম এক চিরন্তন বিস্মৃতি মাত্র।

টেড হিউজেসের সঙ্গে বিয়ে ছিল এক অদ্ভুত ভালবাসার পরিণাম। পরবর্তীতে তার জীবনের বেশিরভাগ হতাশার কারণ এই সম্পর্কটাই। টেডের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘বার্থডে লেটারস’ এ এই জটিল সম্পর্কের আভাস পাওয়া যায়। যদিও বিয়ের পর এই দম্পত্তি যুক্তরাষ্ট্র চলে যায় কিন্তু ১৯৫৯ সালে তারা আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। সেখানে তারা ১৯৬১ সালে ওয়েভিল দম্পত্তির (আসিয়া ও ডেভিড) কাছ থেকে ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। কিন্তু সেই আসিয়ারই প্রেমে পড়ে যান টেড। ১৯৬২ সালের শুরুর দিকে সিলভিয়া ব্যাপারটি জানতে পারলে সেপ্টেম্বর থেকে আলাদা বাস করতে শুরু করেন। ততদিনে তাদের দুই সন্তান নিকলাস ও ফ্রেইডার জন্ম হয়েছে।

ছোটবেলায় যে বিষণ্ণতা ছিল সেটা আবার তার চারদিক অন্ধকার করে ফেলে। হতাশার সাগরে তিনি আবার ডুবে যেতে থাকেন। সেখানে একমাত্র খড়কুটো হয়ে তাকে আশ্রয় দেয় কবিতা। স্বামী তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে এই বেদনা থেকে যেন একমাত্র তাকে মুক্তি দিতে পারে শব্দের খেলা। মাকে লিখলেন, ‘সারা পৃথিবী আমার পায়ের নিচে। ফেটে চৌচির। যেন পাকা রসালো তরমুজের লালিমা।’

হতাশার চাদরে মোড়া দিনগুলো এভাবেই কাটতে থাকে। এরপর ছয়মাস কাটান মানসিক হাসপাতালে। এরপর আবার ফিরলেন লেখালেখির জগতে। লিখলেন আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘দ্য বেল জার’। এটি তার বিখ্যাত বইগুলোর একটি। কিন্তু এভাবে তো আর জীবন চলে না। ঘরে দুই বছর আর নয় মাস বয়সী দুইটি সন্তান। কিন্তু তাদের ঠিকমত খাওয়ানোর মত কিছু নেই। এছাড়াও অতীত নিয়ে আগে থেকেই হতাশায় জর্জরিত। এর মধ্যেই কয়েকবার অসফল ভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। কখনো গাড়ি এক্সিডেন্টে কিংবা কখনো নদীতে ঝাঁপ দিয়ে।

এর মধ্যেই তখন লন্ডনে অনেক শীত পড়ে। প্রতিদিন ডাক্তার এসে সিলভিয়াকে দেখে যান। কিন্তু এই হতাশা থেকে তো মুক্তি নেই। ১৯৬৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ভোর সাড়ে ৪টা, গৃহকর্ত্রী ও বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত নার্স এসে দেখলেন ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। পরে আরেকজন গৃহকর্মীর সাহায্যে দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল রান্নাঘরের বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত পড়ে আছেন। শিশুদের সিলভিয়া অন্য রুমে নিরাপদে রেখেছিলেন। মৃত্যু নিয়ে সিলভিয়া লিখেছিলেন, ‘Dying is an art, like everything else. I do it exceptionally well.’

সিলভিয়ার এই মৃত্যুতে টেডকে অনেক মুষড়ে পড়তে দেখা যায়। সন্তানদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তিনি লেখেন ‘আয়রন ম্যান’। তিনি আরো লেখেন, ‘আমার জীবনেরও সমাপ্তি ঘটেছে এখানে, বাকিটা মরণোত্তর প্রক্রিয়া’। কবিরা বোধ হয় এমন বেখেয়ালি হন। তবে মাত্র ৬ বছর পর একই প্রক্রিয়ায় গ্যাস চুল্লিতে মাথা ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেন আসিয়া। মৃত্যুর আগে ৪ বছরের কন্যা সারাকেও হত্যা করেন। সিলভিয়ার জীবনের বিষাদ মৃত্যুর পরও তাকে ছেড়ে যায়নি। নিকোলাস বিষাদময়তার কাছে পরাস্ত হয়ে ২০০৯ সালে আলাস্কায় আত্মহত্যা করে। কন্যা ফ্রেইডা ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসিত হন। বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর নামে নাম হওয়ার কারণেই বুঝি তিনিও আঁকার মধ্যেই আছেন।

সিলভিয়া প্লাথ স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার ঘরানাকে এগিয়ে নিতে অবদান রেখেছেন। এক্ষেত্রে তিনি কবি রবার্ট লাওয়েল, অ্যান স্যাক্সটন (প্লাথের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী) ও জন বেরিম্যানকে সহযাত্রী হিসেবে পেয়েছেন। ১৯৮২ সালে কবিতার জন্য তাকে মরণোত্তর পুলিত্জার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কোনো কবির সর্বপ্রথম মরণোত্তর এ পুরস্কার লাভ। প্লাথের লেখায় বারবার এসেছে নানা চিত্রকল্প। এসেছে চাঁদ, রক্ত, হাসপাতালের গন্ধ, ভ্রূণ, করোটি। প্লাথের কবিতায় ডিলান টমাস, ইয়েটস, আর মারিয়ান মুরের প্রত্যক্ষ প্রভাব। ১৯৬০-এর পর কবিতায় surrealistic নিসর্গচিত্র। সঙ্গে বন্দীদশার অব্যক্ত যন্ত্রণা আর মৃত্যুর নি:শব্দ পদসঞ্চার। প্লাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আলভারেজ লিখেন-

"প্লাথের জীবন আরো জটিল এই কারণে যে, প্লাথ যখন পরিণত মনস্কতায়ও লিখছেন, তখন তিনি সচেতনভাবে নিজের সৃষ্টির মধ্যে নিয়ে আসছেন রোজের জীবনযাপনে নিত্যব্যবহার্য যত খুঁটিনাটি। যেমন, হঠাৎ করে আসা অতিথি, আচমকা টেলিফোন, অপ্রত্যাশিত শারীরিক আঘাত, কাটাছেঁড়া, কালশিটে কিংবা হয়ত একটা রান্নাঘরের সানকি, মোমদানি। সব কিছুই কেমন অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে তার লেখায়, অর্থবহ হয়ে, রূপান্তরিত অস্তিত্ব নিয়ে। তার কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে এমন সব প্রসঙ্গ বা চিত্রকল্প, যা সেই মুহূর্তে হৃদয়ঙ্গম করা না গেলেও কোনো বুদ্ধিমান মানুষ যিনি সিলভিয়ার অস্থির জীবনযাপনের খোঁজ রেখেছেন, তিনি ঠিক কবিতার শেষে পাদটীকা হিসেবে এই কবিতার আশ্রিত বিষয়ের ওপর চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম।”

এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, 'ব্যক্তিকে তার অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ ও নিপুণভাবে পরিচালনা করতে জানতে হবে। এমনকি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, যেমন পাগলামি, অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করা এসবকেও। তাকে এসব অভিজ্ঞতাকে পরিচালনা করতে হবে একটি অবহিত ও বুদ্ধিদীপ্ত মননে’। এভাবেই তিনি তার প্রতিটা কবিতায় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন। তার মনের ভেতরের ঝড়কে তিনি অক্ষরে বেঁধেছেন। ‘দ্য বেল জার’ বইটিতে তিনি তার জীবনের বিভিন্ন গল্প, নানা স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প লিখেছেন। চল্লিশটির বেশি কবিতা নিয়ে যে ‘এরিয়ল’ গ্রন্থ, সমালোচকদের মতে তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি, সেখানে ‘ড্যাডি’ ও ‘লেডি ল্যাজারস’ কবিতা দুটির মধ্যে প্লাথের ক্রমশ ভঙ্গুর মানসিক অবস্থার অনুষঙ্গ ধরা যায়। ‘ড্যাডি’ কবিতায় প্রায় শুরুতেই, প্লাথ লিখছেন-‘বাবা, তোমাকে না মেরে উপায় ছিল না’।

এভাবেই এক বেদনা বিধুর জীবন কাটিয়েছেন সিলভিয়া প্লাথ।সেই জীবনেরই কথা প্রতি পরতে পরতে উঠে এসেছে তার সাহিত্যকর্মে। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই বিখ্যাত কবি। কেন এত বিতৃষ্ণা ছিল তার জীবনের প্রতি? সিলভিয়া প্লাথের কয়েকটি বিখ্যাত উক্তি-

* took a deep breath and listened to the old bray of my heart. I am. I am. I am.

* I have the choice of being constantly active and happy or introspectively passive and sad. Or I can go mad by ricocheting in between.”

* “The silence depressed me. It wasn't the silence of silence. It was my own silence.”

* “I desire the things that will destroy me in the end.”

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
ফাইভ জি চালু হতেই মরল কয়েকশ পাখি!
ফাইভ জি চালু হতেই মরল কয়েকশ পাখি!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই মারা গেছেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই মারা গেছেন
ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা
ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা
‘বিশ্ব সুন্দরী’র মুকুট পড়া হলো না ঐশীর
‘বিশ্ব সুন্দরী’র মুকুট পড়া হলো না ঐশীর
দেশের মাটিতে মাশরাফির শেষ ম্যাচ
দেশের মাটিতে মাশরাফির শেষ ম্যাচ
মৃত সাফায়েত উদ্ধার, বাবা আটক; সুরায়েত জীবিত
মৃত সাফায়েত উদ্ধার, বাবা আটক; সুরায়েত জীবিত
৭ দিনের নিচে কোন ইন্টারনেট প্যাকেজ নয়
৭ দিনের নিচে কোন ইন্টারনেট প্যাকেজ নয়
ভাইরাল জন-মিথিলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়!
ভাইরাল জন-মিথিলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়!
সিলেটি যুবককে বিয়ের জন্য ক্যাথলিক মেয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ
সিলেটি যুবককে বিয়ের জন্য ক্যাথলিক মেয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ
এমিরেটসের হীরায় মোড়ানো বিমান
এমিরেটসের হীরায় মোড়ানো বিমান
সোমবার রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ
সোমবার রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ
‘যৌন মিলন দেখিয়ে আনন্দ পাই’
‘যৌন মিলন দেখিয়ে আনন্দ পাই’
বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসেবে পরীই প্রথম
বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসেবে পরীই প্রথম
পাপ যেন পিছু ছাড়ছে না নিকের!
পাপ যেন পিছু ছাড়ছে না নিকের!
বিশ্বের আদর্শ ফিগারের নারী কেলি ব্রুক
বিশ্বের আদর্শ ফিগারের নারী কেলি ব্রুক
বিএনপির হয়ে লড়বেন পার্থ
বিএনপির হয়ে লড়বেন পার্থ
প্রভার নাচে জিতবে ঢাকা!
প্রভার নাচে জিতবে ঢাকা!
বাবার ইচ্ছাপূরণে হেলিকপ্টারে বউ তুলে আনল ছেলে
বাবার ইচ্ছাপূরণে হেলিকপ্টারে বউ তুলে আনল ছেলে
স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, আটক ৬
স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, আটক ৬
মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হতে পারে: ইসি সচিব
মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হতে পারে: ইসি সচিব
শিরোনাম :
কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ খুলে দেয়া হয়েছে বন্ধ করা ৫৮ ওয়েবসাইট খুলে দেয়া হয়েছে বন্ধ করা ৫৮ ওয়েবসাইট ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৪টি আসনে নির্বাচন করবে জামায়াতে ইসলামী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৪টি আসনে নির্বাচন করবে জামায়াতে ইসলামী ১২ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নামছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নামছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা